SomoyNews.TV

Somoynews.TV icon বাণিজ্য সময়

আপডেট- ২৮-০১-২০২১ ০৯:৫৯:৪০

চাপ ছাড়াই পোশাক খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রকৌশলীরা

rmg-web

চার দশকের বেশি অভিজ্ঞ বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রকৌশল বিভাগ। এতে উৎপাদন ব্যয় কমায় কারখানাগুলো দেখছে লাভের মুখ। আবার পদ্ধতি সহজ হওয়ায় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ছোট ছোট কৌশল বেশ আগ্রহ নিয়ে শিখেন শ্রমিকরা।

রাজধানীর মিরপুরে একটি তৈরি পোশাক কারখানার ভেতরে দেখা গেল করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি মেনে উৎপাদন কাজে ব্যস্ত শ্রমিকরা। রফতানিমুখী ওই কারখানাটিতে তখন ওয়েস্ট ইলাস্টিক শর্টপ্যান্ট ও লেডিস টপস তৈরির কাজ চলছে। হঠাৎ চোখে পড়ল শ্রমিকের পাশে খাতা-কলম হাতে দাঁড়িয়ে আছেন একজন কর্মকর্তা। তিনি গভীর মনোযোগসহ শ্রমিকের কাজ পর্যবেক্ষণ করছেন আর মাঝে মাঝে কি যেন লিখছেন। জানা গেল, তার নাম মো. তারিকুল ইসলাম। উচ্চশিক্ষা শেষ করেছেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং অর্থাৎ শিল্প প্রকৌশল নিয়ে। তার কাজ শ্রমিকের কাজ সহজ করে দেওয়া। ব্যাখ্যাও দিলেন তিনি। 

কোনো রফতানি আদেশ পাওয়ার পর পণ্য পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত সময় ও শ্রমিক সংখ্যা হিসাব করে তারা একটি উৎপাদন কৌশল ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। এরপর কাজ শুরু হলে প্রতিদিন ঘণ্টায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হচ্ছে কি না সেই হিসাব রাখা হয়। হঠাৎ যদি দেখা যায় ঘণ্টাভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হচ্ছে না। তাহলে তারা উৎপাদন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত না করে সমস্যা চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। এ জন্য তারা ওয়ান আওয়ার স্টাডি নামে এক ঘণ্টা ওই কাজ পর্যবেক্ষণ করেন। এতেই তারা বুঝতে পারেন সমস্যা কোথায় হচ্ছে আর কেনইবা লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে না। 

তবে, এসব সমস্যা খুব বড় ধরনের হয় না। চলমান প্রক্রিয়াকে অল্প একটু এদিক-সেদিক করলেই সমাধান হয়ে যায়। সমাধানেরও ব্যাখ্যা দিলেন। হয়তো ঘণ্টাব্যাপী পর্যবেক্ষণ শেষে পাওয়া গেল শ্রমিকের কাজের উপযুক্ত উচ্চতার চেয়ে মেশিনের উচ্চতা বেশি। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকের বসার চেয়ার বা টুলের উচ্চতা সামান্য বাড়িয়ে দিলেই সমাধান হয়ে যাচ্ছে। আবার দেখা গেল হয়তো কোথাও দুই মেশিন দরকার কিন্তু সেখানে একজন শ্রমিকের কাজ সেই কাজ আশা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আরেক মেশিন অবশ্যই যুক্ত করে দিতে হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কাপড় ধরা ও রাখার কৌশলের কারণেও উৎপাদন পিছিয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে তাকে ভিডিওসহ সেই কৌশল শেখানো হয়। এভাবে তারা শ্রমিকের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কারখানার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে ভূমিকরা রাখছেন। তারা সমস্যা শনাক্ত করেন এবং তেমন কোনো বিনিয়োগ বা অর্থ ব্যয় ছাড়াই বিদ্যমান সুবিধা দিয়ে কৌশল পরিবর্তনের মাধ্যমে কারখানাকে লাভজনক অবস্থানে পৌঁছে দিতে ভূমিকা রাখেন। 

শহিদুল ইসলাম মিশন নামে আরেকজন শিল্প প্রকৌশলী জানান, গত কয়েক বছরে যেসব কারখানা বন্ধ হয়েছে বা লোকসানের মুখে পড়েছে সেসব কারখানার বেশির ভাগই তাদের অপচয় বন্ধ ও শ্রমিকের কর্মদক্ষতা বাড়াতে পারেনি। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের কাজ হলো ব্যয় না বাড়িয়ে ছোট ছোট কৌশল পরিবর্তন করে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা। তারা খেয়াল রাখেন এটা করতে গিয়ে যেন শ্রমিকরা বিরক্ত না হয়। কারণ, শ্রমিক বিরক্ত বা শ্রমিকের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়লেও উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণ হবে না। 

কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা হল এমন ছোট ছোট কৌশল নিয়ে। তারাও খুশি। কারণ, এতে তাদেরই কাজে গতি বাড়ছে। প্রতিযোগিতার বাজারে তা আসলে খুবই দরকার। আবার কাজ ভালো পারলে তাদের বেতন কাঠামো পরিবর্তনেরও সুযোগ তৈরি হয়। তারাও আশ্বাস্ত করলেন যে কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো রকম চাপ দেয় না, কলা-কৌশল শেখায়। 

ওই কারখানা মানবসম্পদ ও কমপ্ল্যায়ান্স ব্যবস্থাপক মো. সাহেব আলী জানান তাদের কারখানায় এই শিল্প প্রকৌশল বিভাগ খুলে প্রকৌশলী নিয়োগ দিয়ে উৎপাদনে বেশ সুফল পাচ্ছেন তারা। ছোট ছোট কৌশল শেখানোর কারণে আগের চেয়ে তাদের কারখানায় উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। আবার একই সঙ্গে হেলপারের সংখ্যা কমায় ব্যয়ও কমেছে। এখন অপারেটররাই তাদের কাজ সহজে করতে পারেন। একজন অপারেটর ও একজন হেলপারের বেতনের পার্থক্য মাত্র কয়েকশ’ টাকা (৪শ’ টাকা)। কিন্তু একজন হেলপার সরাসরি মেশিন চালিয়ে উৎপাদন কাজে যুক্ত থাকে না। সে অপারেটরকে সহযোগিতা করে। এর মানে হল একই কাজ করতে দ্বিগুণ ব্যয় হয়। এর চেয়ে অপারেটরকে কৌশল শেখালে আর হেলপারের তেমন দরকার পড়ে না। 

এ প্রসঙ্গে কথা হয় নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের সঙ্গে। তিনি জানান, তৈরি পোশাকের বিশ্ববাজারে দাপট দেখালেও শ্রমিকদের কর্মদক্ষতায় এখনও বেশ পেছনে বাংলাদেশ। বাজারে টিকে থাকতে তাই উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই তাদের সামনে। এমনকি অদক্ষ শ্রমিকের কারণেই বাংলাদেশ এখনও উচ্চমূল্যের পোশাকের বাজারে যেতে পারছে না। এ ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট বা শিল্প প্রকৌশল বিভাগ বেশ ভালো ভূমিকা রাখছে। এতে করে শ্রমিকের কর্মদক্ষতা যেমন বাড়ে তেমনি বাড়ে কারখানার উৎপাদনশীলতা। আর এতে ভুগতে থাকা কারখানাগুলো যেমন সুযোগ পায় ঘুরে দাঁড়ানোর, তেমনি লাভজনক অবস্থানে থাকা কারখানাগুলোর বাড়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা।