SomoyNews.TV

Somoynews.TV icon বাংলার সময়

আপডেট- ১৫-০১-২০২১ ১৭:৪৩:১৫

শুকাচ্ছে ‘টাকার গাছ’, কোমর ভাঙছে কৃষকের!

akh

রংপুর চিনিকলে আখমাড়াই বন্ধ করার পর মিলজোনে উৎপাদিত আখ পার্শ্ববর্তী জয়পুরহাট চিনিকলে পাঠানোর ব্যবস্থা নিলেও পরিবহন সঙ্কটসহ নানা জটিলতায় আখ পাঠাতে পারছে না মিল কর্তৃপক্ষ।

ফলে আখ কাটার নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ায় এখন কৃষকরা না পারছে জমির আখ অন্যত্র বিক্রি করতে, আবার না পারছে জমিতে রাখতে। এ কারণে প্রতিদিনই বিপুল পরিমাণ আখ জমিতেই শুকিয়ে যাচ্ছে। জমি খালি (আখ কেটে জমি মুক্ত) করতে না পেরে ধান বা অন্য কোনো ফসল আবাদের প্রস্তুতিও নিতে পারছেন না তারা।
 
অন্যদিকে চিনিকল কর্তৃপক্ষ তাদের দেওয়া ঋণের টাকা আদায় করে নেওয়ার জন্য সীমিত সংখ্যক পুঁজি (চিনিকলে আখ সরবরাহের অনুমতিপত্র) দিলেও সে আখও কর্তৃপক্ষ সঠিকভাবে নিতে পারছে না বলে অভিযোগ চাষিদের। এর ফলে চাষিদের অনেকেই বাধ্য হয়ে অবৈধ মাড়াইকলে গুড় তৈরি শুরু করলেও আখের অর্ধেক দামও ঘরে তুলতে পারছে না। 

তবে আখচাষি ও স্থানীয়দের অভিযোগ, এভাবে চললে আগামী তিন মাসেও শতভাগ আখ সংগ্রহ করতে পারবে না চিনিকল কর্তৃপক্ষ। চাষিরা আখের জমিতে অন্য ফসলও আবাদ করতে পারবেন না। জমির আখ জমিতেই শুকিয়ে যাবে।

ক্ষুব্ধ ‍ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, এ অঞ্চলের হাজার আখচাষি আখের ওপর করেই জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। এভাবে উত্তরাঞ্চলের কৃষকের কোমর ভেঙে দিয়ে ‘টাকারগাছ’ আখের গল্প কি তবে এখানেই সমাপ্ত হয়ে যাবে।
 
আখচাষিরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলানোর পর এক সাথে মোটা অংকের টাকা পাওয়া যায় বলে আখকে টাকারগাছ এর সাথে তুলনা করেন তারা। উত্তরাঞ্চলের জনপ্রিয় ফসল সেই আখ এবার কৃষকের মরণ ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছর জুড়ে আবাদ করার পর একসাথে বিশাল অংকের টাকার যোগান দেয়া ফসল আখ এবার কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনায় জমিতেই শুকিয়ে যাচ্ছে। 

তাদের অভিযোগ, পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই গাইবান্ধার একমাত্র কৃষিভিত্তিক ভারী শিল্প কারখানা মহিমাগঞ্জের রংপুর চিনিকলে আখ মাড়াই বন্ধ করার সিদ্ধান্তে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। রংপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনায় মিলজোনে উৎপাদিত পাঁচ হাজার দুইশ একর জমিতে আখ দন্ডায়মান রেখে হঠাৎ করে সরকারি নির্দেশনায় চলতি বছরে এ চিনিকলে আখ মাড়াই বন্ধ হওয়ায় চাষিদের এই পরিণতি।
 
দেশের চিনির বাজারকে বেসরকারি রিফাইনারি মিল সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়ার এটি গভীর একটি ষড়যন্ত্র বলে মনে করছেন আখচাষি ও মিলের শ্রমিক-কর্মচারিরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর রংপুর চিনিকলের অওতাধীন আটটি সাব-জোন এলাকার ৪০টি ক্রয় কেন্দ্রের আওতায় পাঁচ হাজার দুইশ একর জমিতে উৎপাদিত ৫২ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নেয়া হয়। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর মাড়াই শুরুর সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয় চিনিকল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ২ ডিসেম্বর হঠাৎ করেই রংপুর চিনিকল সহ ৬টি চিনিকলে আখ মাড়াই স্থগিতের চিঠি আসে বিএসএফআইসি’র (বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প সংস্থা) সদর দপ্তর থেকে। চিনিকলের লোকসানের বোঝা কমানোর জন্য এ পদক্ষেপ নিলেও চিনিকল থেকে দেয়া ঋণের টাকায় উৎপাদিত আখ সময়মত ও সঠিকভাবে সংগ্রহের বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে আখচাষি ও শ্রমিকরা অভিযোগ করে আসছেন।

এ সিদ্ধান্ত বাতিল বা পুনর্বিবেচনার জন্য তারা বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচিও পালন করেন। এরপরেও কেবল মাত্র পরিবহন খাতেই কয়েক গুণ টাকা বেশি ব্যয় করে জয়পুরহাট চিনিকলে আখ প্রেরণের সিদ্ধান্তে অটল থাকে কর্তৃপক্ষ। নির্দিষ্ট সময়ের ১৫ দিন পরে আখ সংগ্রহ শুরু করে বর্তমানে প্রতিদিন সাতশ’ মেট্রিক টন আখ প্রেরণের কথা থাকলেও মাত্র দুই থেকে তিনশ’ মেট্রিক টন আখ প্রেরণ করা হচ্ছে জয়পুরহাট চিনিকলে। 

এ ভাবে চললে চাষিদের জমির সিংহভাগ আখই জমিতেই শুকিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আখচাষি নেতা আব্দুর রশিদ ধলু অভিযোগ করে বলেন, শ্যামপুর ও জয়পুরহাট চিনিকলের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত, সর্বাধিক মাড়াই ক্ষমতা সম্পন্ন কারখানা ও সর্বাধিক পরিমাণ আখ মজুত থাকার পরও রংপুর চিনিকলে রহস্যজনক কারণে বিএসএফআইসি মাড়াই বন্ধ করে। এতে শ্যামপুর থেকে প্রায় দুইশ’ কিলোমিটার এবং রংপুর চিনিকল থেকে ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আখ পৌঁছাতে হবে জয়পুরহাট চিনিকলে। তিনি আরো বলেন, জয়পুরহাট চিনিকলে মাড়াই শুরুর এক মাস না পেরুতেই সেখানকার আখ প্রায় শেষ। চাষিদের ক্ষতির পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ের বিশাল অংকের এত বড় ক্ষতির দায়িত্ব কে নেবে? তিনি সঠিক তদন্ত করে মাথাভারি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বিচার দাবি করেন। 

মিলস গেট সাব-জোনের চাষি সোনা মিয়া অভিযোগ করেন, চিনিকলে আখ দিয়ে প্রতি মণের মূল্য পাওয়া যায় ১৪০ টাকা। সেখানে গুড় তৈরির জন্য বেপারিরা প্রতিমণ আখের মূল্য দিচ্ছে মাত্র ৭০ থেকে ৮০ টাকা। 

গত এক সপ্তাহ থেকে জয়পুরহাট চিনিকলে সরবরাহের জন্য আখ সংগ্রহ শুরু করেছে রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু জয়পুরহাট চিনিকলের মাড়াই সক্ষমতার অভাবে সঠিক ভাবে তা পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না বলে জানা গেছে। গত বৃহস্পতিবার (১৪ জানুয়ারি) সকালে রংপুর চিনিকলের কারখানা ভবনের সামনে সংগৃহীত আখের বিশাল স্তুপের কাছে গিয়ে দেখা গেছে মাত্র চারটি ট্রাকে আখ বোঝাই করছে শ্রমিকরা। 

পরিবহন ঠিকাদার রনজু মিয়া জানালেন, তিন দিন ধরে জয়পুরহাট চিনিকলে ১৫টি ট্রাক ভর্তি নিয়ে বসে থাকার পর আজ সেখান থেকে মাত্র ৩টি ট্রাক আখ আনলোড করে ফিরতে পেরেছে। এ ভাবে আখ পরিবহন করা সম্ভব হবে না। 

রংপুর চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান দুলাল বলেন, আগে ট্রাক চালকরা দিনে দুই থেকে তিন ট্রিপ আখ মিলে পরিবহন করতেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দিনেও এক ট্রিপ আখ পরিবহন করতে পারছেন না তারা। ইয়ার্ডে আখের পাহাড় জমে যাচ্ছে। বাস্তবতা না মেনে সরকারকে ভুল বুঝিয়ে আখমাড়াই বন্ধের এ হঠকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষকে বিপদগ্রস্ত করে সংক্ষুব্ধ করা হচ্ছে।

এদিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি নিষেধাজ্ঞার কড়াকড়ি না থাকায় রংপুর চিনিকল জোন এলাকায় এবার ১২০টি অবৈধ আখ মাড়াইকল কম দামে আখ কিনে গুড় মাড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে মহিমাগঞ্জের রংপুর চিনিকল মিলস গেট এলাকাতেই ১০ থেকে ১৫টি মাড়াইকল গুড় মাড়াই করছে। 

রংপুর চিনিকলের মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) মো. আমিনুল ইসলাম জানান, শ্রমিক ও পরিবহন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার অবসান হয়ে গেছে। একটি জমির আখও পড়ে থাকবে না।  বর্তমানে পরিবহনে নিয়োজিত গাড়ির সাথে জয়পুরহাট চিনিকলের ১০টি গাড়ি এনে এখন থেকে প্রতিদিন সাতশ’ মেট্রিক টন আখ জয়পুরহাট চিনিকলে পাঠানো হবে। এতে দ্রুতই আখ সংগ্রহ ও পরিবহন শেষ হয়ে যাবে।