SomoyNews.TV

Somoynews.TV icon আন্তর্জাতিক সময়

আপডেট- ২৪-১১-২০২০ ২০:৪৮:৩৪

ভারতের রাজনীতিতে শক্ত ভিত গড়ছে ইত্তিহাদুল মুসলিমিন

33

ঐতিহ্যগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোকে ভোট দিয়ে আসছেন মুদাচ্ছির নাজারের পরিবার। সম্প্রতি ভারতের বিহার রাজ্যে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে সেই ঐতিহ্য থেকে সরে এসেছে তারা। ভোট দিয়েছে অল ইন্ডিয়া মজলিসে ইত্তিহাদুল মুসলিমিন (এআইএমআইএম) বা মিম পার্টিকে। দলটি মুসলমান এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারের বিষয়ে যথেষ্ট সরব ভূমিকা পালন করায় নতুন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।

বিহারের সিমাঞ্চল জেলার কিশানগঞ্জের বোহিতার বাসিন্দা নাজার জানান, আমাদের গ্রামের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধভাবে এআইএমআইএম’কে ভোট দিয়েছে।

সম্প্রতি বিহারে অনুষ্ঠিত বিধানসভার নির্বাচনে ৫টি আসনে জয় পেয়েছে এআইএমআইএম। যেগুলো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশ এবং নেপালের সীমান্তবর্তী ভারতের বিহার রাজ্যের বাসিন্দারা জানান, ভারতের বিরোধীদলগুলো ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে আসলেও দীর্ঘদিন ধরে এলাকার দরিদ্রতার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু উপেক্ষা করেছে তারা।

নাজার আল জাজিরাকে জানান, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের মতো ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো মুসলমানদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

তিনি বলেন, তথাকথিত ধর্ম নিরপেক্ষদলগুলো বর্তমান সরকারের সংখ্যালঘুবিরোধী সিদ্ধান্তের বিষয়ে বরাবরই নীরব ভূমিকা পালন করছে। তারা নূন্যতম বিরোধিতা পর্যন্ত করেনি। ব্যতিক্রম এআইএমআইএম। তারা সংখ্যালঘুদের পক্ষে কথা বলছে। মুসলিমসহ সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় এআইএমআইএম’র অব্যাহত অবস্থান সাধারণ মানুষের আস্থা এবং বিশ্বাস অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

১শ’ ৩০ কোটি জনসংখ্যার ভারতে মুসলমানদের উপস্থিতি ১৪ শতাংশ। মুসলমানদের মুলধারার রাজনীতি থেকে অব্যাহতভাবে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে মুসলমানরা ক্রমান্বয়ে আরো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হচ্ছে। বিহারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এবার কোনো মুসলমানকে মন্ত্রিপরিষদে জায়গা দেয়া হয়নি।

ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে ৫৪৩টি আসন রয়েছে। বর্তমানে মুসলমানদের উপস্থিতি মাত্র ২৭টি আসনে; যা চার শতাংশেরও কম। এটিও ভারতের ইতিহাসের ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

হিন্দু জাতীয়বাদী এজেন্ডা

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার হিন্দু জাতীয়তাবাদী এজেন্ডার অংশ হিসেবে অনেকগুলো আইন পাস করেছে। যে আইনগুলোকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞররা।

গেলো বছর বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাস করে মোদি সরকার। অ্যাকটিভিস্টরা এ আইনকে দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আখ্যা দিয়েছেন। প্রস্তাব করা হয় সিটিজেনশিপ রেজিস্টারের। এসবের প্রতিবাদে মুসলমানদের নেতৃত্বে ভারতজুড়ে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

গেলো বছরের আগস্টে কাশ্মীরের রাজ্য মর্যাদা এবং কাশ্মীরীদের দেয়া সাংবিধানিক বিশেষ সুবিধা বাতিল করে মোদি সরকার। মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলটিতে বন্ধ করে দেয়া হয় সবধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা। যা বহাল থাকে ৬ মাসেরও বেশি। পাশাপাশি জম্মু এবং কাশ্মীরকে কেন্দ্র শাসিত আলাদা অঞ্চলে পরিণত করে ক্ষমতাসীন বিজেপি।

ন্যাশনাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেসের মতো বিরোধী দলগুলোকে ঐতিহ্যগতভাবে মুসলমানরা ভোট দিয়ে আসছে। ওই দলগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ- মুসলমানদের অস্তিত্বে হুমকি সৃষ্টি করার মতো মোদি সরকারের সিদ্ধান্তে চুপ থেকেছে তারা। দেশটির সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘুগোষ্ঠী মুসলমানরা।

তেলেঙ্গানা রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলীয় হারদ্রাবাদ শহরে কয়েক দশক নিজেদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছিল এআইএমআইএম। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে নিজেদের কার্যক্রম জোরদার করে দলটি। রাজনীতি থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করার মতো বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিচ্ছে এআইএমআইএম।

দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন আসাদুদ্দিন ওয়াইসি। চারবারের এ সাংসদ পার্লামেন্ট এবং টিভিতে তুখোড়, চৌকষ এবং যুক্তিযুক্ত বক্তব্যের জন্য বিখ্যাত। ভারতে মুসলমানসহ সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন ইস্যুতে জোরদার ভূমিকা রেখে তাদের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছেন তিনি।

মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী এজেন্ডার বিরুদ্ধে ভারতের বিরোধীদলগুলো প্রতিবাদ জানাতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ এআইএমআইএম’র।

নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরুর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অভিনাশ কুমার আল জাজিরাকে বলেন, বিজেপি সরকারের নেয়া ভারতীয় সংবিধানের মূলনীতিবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রকাশ্যে কোনো প্রতিবাদ করেনি ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধীদলগুলো। এ কারণে মুসলমানরা এআইএমআইএম’র দিকে ঝুঁকছে। বিজেপিকে মোকাবিলার জন্য এআইএমআইএম’কে সঠিক দল হিসেবে দেখছে তারা।

তিনি বলেন, তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ প্রত্যেকটি দল যখন নিজেদেরকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে প্রমাণে ব্যস্ত, একইসঙ্গে প্রান্তিক বা সংখ্যালঘুদের অবস্থানকে উপেক্ষা করছে তখন খুব স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সুনির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর অধিকারের বিষয়ে যারাই গুরুত্ব দেবে তারা মূল্যায়ন পাবে।’

দেশব্যাপী আবেদন

বিহারের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারণার সময় কংগ্রেস পার্টি এবং তাদের আঞ্চলিক জোট রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরএসডি) মুসলমানদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছে।

বিহারের সাংবাদিক মাজিদ আলম আল জাজিরাকে বলেন, ওই দলগুলো তাদের প্রচারণায় কর্মসংস্থান এবং উন্নয়নের উপর জোর দিয়েছে শুধু। কারণ তারা সংখ্যালঘুদের অধিকারের বিষয়ে সোচ্চার হয়ে সংখ্যাগুরুদের ভোট হারাতে চায়নি। এ কারণে মুসলমানদের একাংশ এআইএমআইএম’র মতো একটি দলকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যারা তাদের হয়ে আওয়াজ তুলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাসে এআইএমআইএম-ই একমাত্র মুসলমানদের রাজনৈতিক দল যা দেশজুড়ে একটা আবেদন তৈরি করেছে। যদিও এখনো অধিকাংশ মুসলমান বিজেপি বিরোধীদেরই ভোট দেন।

আল জাজিরাকে এআইএমআইএম’র জাতীয় মুখপাত্র ওয়ারিস পাঠান বলেন, মুসলমানসহ সব সংখ্যালঘুদের বঞ্চনা এবং তাদের অধিকারের বিষয় আমরা তুলে ধরছি। সাধারণ মানুষ সাড়া দিচ্ছে। যা আমাদের ভোটের ফলে প্রভাব ফেলছে।

আসাদ উদ্দিন ওয়াইসি

পাঠান বলেন, বিহারে আগের বারের চেয়ে আমাদের ভোট বেড়েছে। আমরা প্রত্যেকটি প্রতিযোগিতায় নিজেদের ভোট বাড়াচ্ছি। গেলো বছর মহারাষ্ট্রের নির্বাচনেও আমাদের ভোটের সংখ্যা বেড়েছে। আমরা কয়েকটি আসনেও জয়ী হয়েছিলাম।

এআইএমআইএম’র জ্যেষ্ঠ নেতা সৈয়দ আসিম ওয়াকার বলেন, শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্য নয়, পুরো দেশের জন্য তাদের দল একটি টেকসই বিকল্প।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, আমরা নিজেদের মুসলমানদের দল বলে পরিচয় দেই না। যেখানে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ, মুসলমানরা সংখ্যায় কম সেখানেও আমরা জয়ী হয়েছি। এটা সম্ভব হয়েছে দলিত শ্রেণির হিন্দু জনগোষ্ঠীও আমাদের ভোট দেয়ায়।

বিহারের নির্বাচনে এআইএমআইএম বহুজন সমাজ পার্টি (বিএসপি) এবং রাষ্ট্রীয় লোক সমতা পার্টির সঙ্গে জোট গড়ে নির্বাচন করে। যারা বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে।

মুসলিম-দলিত জোট

২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে মহারাষ্ট্রে দলিত পার্টির সঙ্গে জোট গড়ে এআইএমআইএম। হায়দ্রাবাদের বাইরে প্রথমবারের মতো পার্লামেন্ট আসনে জয় পায় দলটি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দলের প্রধান ওয়াইসির কারিশমায় এআইএমআই’র অবস্থান দিন দিন শক্ত হচ্ছে। কারণ তিনি তরুণ মুসলিম ভোটারদের স্বপ্নকে বুঝতে পেরেছেন। তাদের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন তিনি।

কলকাতার আলিয়া ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ রিয়াজ বলেন, ওয়াইসির উপস্থিতি এবং তার বাচনভঙ্গি তার সমসাময়িক রাজনীতিবিদদের থেকে আকর্ষণীয় এবং সম্পূর্ণ আলাদা। এআইএমআইএম’র উত্থানের এটাও একটা কারণ।

মুসলমানদের ঐতিহ্যবাহী টুপি এবং পাঞ্জাবি পরে ৫১ বছর বয়সী এআইএমআইএম নেতা ওয়াইসিকে টিভির প্রাইম টাইম নিউজে প্রায়ই বিরোধীদলীয় নেতাদের সঙ্গে প্রচণ্ড বাকযুদ্ধে লিপ্ত হতে দেখা যায়।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কুমারের মতে, পার্লামেন্টেও তিনি যুক্তিতর্ক এবং গবেষণামূলক ভাষণ দিয়ে থাকেন। যা মুসলমান ভোটারদের নিশ্চিতভাবে আকৃষ্ট করে। এ বিষয়গুলো এখন নির্বাচনে ভোটের লড়াইয়েও প্রতিফলিত হচ্ছে।

তবে বিরোধী দলীয় কিছু নেতার অভিযোগ, এআইএমআইএম মুসলমানদের ভোটে বিভাজন তৈরি করে বিজেপিকে সহায়তা করছে।

ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র মিম আফজাল বলেন, বিজেপি যেমন সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন করছে, একই কাজ করছে এআইএমআইএমও। এআইএমআই নির্বাচনী লড়াইয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো সফলতা কখনোই পাবে না। শুধুমাত্র মুসলমান ভোটারদের ভোট ভাগাভাগির মাধ্যমে বিজেপি এবং তাদের সহযোগীদের ক্ষমতায় থাকতে সহায়তা করতে পারে।

সমালোচনা পাশ কাটিয়ে এআইএমআইএম’র লক্ষ্য এখন পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচন। পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ মুসলমান।

এআইএমআইএম’র বিহার যুব শাখার প্রেসিডেন্ট আদিল হাসান আজাদ বলেন, পুরো ভারতে এআইএমআইএম’র উপস্থিতি নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।