SomoyNews.TV

Somoynews.TV icon মহানগর সময়

আপডেট- ১৬-০২-২০২০ ২২:১৬:৫৩

আরেফ হত্যার ৫ আসামিকে খুঁজে ফাঁসি কার্যকরের দাবি পরিবারের

download

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের প্রতিষ্ঠাতা নেতা কাজী আরেফ আহমেদ হত্যায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৯ আসামির মধ্যে এখনো পলাতক ৫ আসামিকে খুজেঁ বের করে রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন পরিবারের সদস্য ও বিশিষ্টজনরা। একই সঙ্গে কাজী আরেফ হত্যার ঘটনায় নেপথ্য পরিকল্পনাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি ওঠে। কাজী আরেফ আহমেদের ২১তম হত্যা দিবসে রাজধানীতে এক আলোচনায় এসব দাবি ওঠে আসে। 

কাজী আরেফ স্মরণে রোববার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘যুদ্ধাপরাধী বিচারে কাজী আরেফ আহমেদের ভূমিকা’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করে কাজী আরেফ পরিষদ। স্মারক বক্তব্যে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি থেকে শুরু করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে নব্বইয়ের দশকে গণআদালত গঠনসহ বাংলাদেশের প্রগতিশীল সব আন্দোলনে নেপথ্য থেকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন কাজী আরেফ আহমেদ। 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পেছনে কাজী আরেফদের গোপন সংগঠন 'নিউক্লিয়াস' এর ভূমিকার কথা তুলে ধরে শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় ৬১ থেকে একাত্তর, যার অন্যতম নায়ক হচ্ছেন কাজী আরেফ আহমেদ। সে সময় বঙ্গবন্ধুর প্রধান সেনাপতি ছিলেন কাজী আরেফ। ইতিহাসকে আমাদের এভাবেই দেখতে হবে।’ 
 
কাজী আরেফের অকাল প্রয়াণের শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয় উল্লেখ করে শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘কাজী আরেফের মতো নেতা আমরা আর পাবো না।’

কাজী আরেফ হত্যার নেপথ্য পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি বলেন, 'কাজী আরেফ হত্যার বিচার হয়েছে। কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ডও হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যা থেকে শুরু করে এ ধরনের রাজনৈতিক হত্যার বিচারের ক্ষেত্রে আমরা বারবার বলে আসছি, নেপথ্যে নায়ক কারা? কেনো খুন করা হলো, তা খুঁজে বের করতে হবে।  চার্জশিটে তো কেবল আত্মস্বীকৃত খুনীদের অভিযুক্ত করা হচ্ছে।' কাজী আরেফ হত্যায় ‘ষড়যন্ত্রের নায়কদের সামনে’ নিয়ে আসা ‘সরকারের দায়িত্ব’ বলেও মন্তব্য করেন শাহরিয়ার কবির। 

তিনি বলেন, ‘কাজী আরেফ আহমেদকে হত্যা করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আন্দোলনকে বন্ধ করার জন্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নাম নিশানা বন্ধ করে দেয়ার জন্য।’ 

শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘কাজী আরেফকে শুধু হত্যা দিবসে স্মরণ করা নয়, নতুন প্রজন্মের কাছে তার আদর্শের কথা তুলে ধরা খুবই জরুরি।’ 

কাজী আরেফ হত্যায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের খুঁজে বের করার দাবি জানান তাঁর কন্যা কাজী আফরীন জাহান জুলি। তিনি বলেন, ‘এ হত্যার বিচারের রায়ে ৩ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। কিন্তু ৫ জন আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন। তারা দেশে নেই, মাঝেমাঝে দেশে আসেন। আইনশৃংখলাবাহিনীর কাছে আবেদন থাকবে, তাদের গ্রেফতার করে বিচার নিশ্চিত করা।’ 

পাশাপাশি নেপথ্য পরিকল্পনাকারীদের বিচার দাবি করে কাজী আরেফ কন্যা বলেন, ‘আমাদের আবেদন থাকবে, একজন দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদের হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের মানুষদের কথাও যেন জাতি জানতে পারে। আর সেটি তুলে ধরার দায়িত্বও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর।’

অনুষ্ঠানে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সদস্য সচিব হারুন হাবিব বলেন, ‘আমাদের জাতির দুর্ভাগ্য যে, কাজী আরেফের মতো একজন নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় প্রকাশ্য জনসভায়।’

স্বাধীনতার পরিকল্পনায় ‘নিউক্লিয়াস’ গঠন, মুক্তিযুদ্ধে ‘মুজিব বাহিনী’র সংগঠক ও নব্বইয়ের দশকে গণআদালতের উদ্যোক্তা হিসেবে কাজী আরেফের অগ্রণী ভূমিকার কথা তুলে ধরে হারুন হাবিব বলেন, ‘কাজী আরেফ ছিলেন মানবিক মনের অধিকারী ত্যাগী একজন রাজনীতিবিদ। শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থার স্বপ্নে বিভোর আত্মমর্যাদাশীল একজন মানুষ। জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম এক শ্রদ্ধেয় নাম।’

জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে আন্দোলন ও গণআদালতের বিচারে কাজী আরেফ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে ‘ঐক্যের প্রতীক’ ছিলেন বলে ওঠে আসে আলোচকদের বক্তৃতায়। 

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক সভাপতি অধ্যক্ষ আবদুল আহাদ চৌধুরী বলেন, ‘জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনে নেতৃবৃন্দের মধ্যে নানা সময় মতবিরোধ হয়েছে, ঝগড়া হয়েছে, বিবাদ হয়েছে, সেখানে কাজী আরেফ মিলিয়ে দিতেন। কোনোভাবে ভাঙনের আঁচ সৃষ্টি হতে দেননি।’ 

আব্দুল আহাদ চৌধুরী বলেন, ‘সে আন্দোলনে আব্দুর রাজ্জাক আর কাজী আরেক আহমেদদের মতো নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে সঠিক নির্দেশনা পাওয়ার কারণেই আমরা এতোদূর যেতে পেরেছি। না হলে কুশপত্তিকা দাহ আর কয়েকটা মিছিল করেই হয়তো থেমে যেতাম। আন্দোলনকে অতোটা বেগবান করতে পারতাম না। কিন্তু তাদের নেতৃত্ব ছিলো বলেই প্রতি সপ্তাহে আমরা দুটা তিনটা মিছিল আমরা করতে পেরেছি। সব জায়গায় সভা করে সারাদেশেই ঘুরে বেড়িয়েছি। এখানে কাজী আরেফ ভাই লেগে ছিলেন। দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা করতেন।’ 

‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও ফাঁসি যা কিছুই হচ্ছে, তা ওই আন্দোলনেররই ধারাবাহিকতায়’ যোগ করেন অধ্যক্ষ আহাদ চৌধুরী। 

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন ত্বরান্বিত করতে এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় এগিয়ে নেয়ার জন্য কাজী আরেফ যে ভূমিকা রেখেছেন, তা নতুন প্রজন্ম মনে রাখবে বলেও বিশ্বাস আলোচকদের।