SomoyNews.TV

Somoynews.TV icon তথ্য প্রযুক্তির সময়

আপডেট- ২৫-১২-২০১৯ ১৯:৩৬:০৪

সালতামামি ২০১৯: প্রযুক্তিতে হতাশা

tecnology

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্জিত হয় সমৃদ্ধি। বিকাশ হয় মেধা, মননের। উৎকর্ষতা আসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে। নির্দিষ্ট সময়ের পর কোনো বিষয়ে কতটা পরিবর্তন আসলো তা মানুষ আবার পরিমাপ করে দেখতেও চায়। এমনই একটি পরিমাপক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ট্রেন্ড হয়েছিল চলতি বছরের জানুয়ারিতে। টেন ইয়ার্স চ্যালেঞ্জ নামের ওই ইস্যুটি ছিল ২০১৯ সালে কেউ দেখতে কেমন এবং এর ১০ বছর আগে অর্থাৎ ২০০৯ সালে ওই ব্যক্তি দেখতে কেমন ছিলেন তার স্থিরচিত্র পর্যালোচনা। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে ট্রেন্ডিং ইস্যুতে পরিণত হয়।

তবে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ ছড়াতেও সময় খুব একটা লাগেনি। সপ্তাহান্তেই প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিষয়টি নিয়ে। তারা বলেন, এই ছবি পোস্টের সঙ্গে অন্যের অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে। বছরের শুরুতেই যখন প্রযুক্তি বিশ্বে এমন উদ্বেগ সেটা যেন এই ক্ষেত্রে বছর খারাপ যাওয়ারই কিছুটা আভাস দিচ্ছিল। কারণ বছরজুড়ে একের পর এক খারাপ সংবাদই এসেছে এই বিভাগ থেকে। দেশীয় কিংবা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রযুক্তি নিয়ে যারা সংবাদ পরিবেশন করেন তাদের যেন ভরিয়ে দিয়েছে ২০১৯।

খারাপ সংবাদ সাংবাদিক কিংবা সংবাদপত্রের জন্য অনেকটা লোভনীয় হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা সাধারণের জন্য উদ্বেগ কিংবা অশান্তির। যেমন, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যে বছরের মাঝামাঝি সময়ে চীনা প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর নতুন আঘাত আসে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এই প্রতিষ্ঠানটির উপর। গুগল জানিয়ে দেয়, তারা আর হুয়াওয়ের সঙ্গে ব্যবসা করবে না। হুয়াওয়ের পরবর্তী ফোনে গুগল প্লে স্টোরও সমর্থন করবে না। এমন ঘোষণা সংবাদমাধ্যমের জন্য ব্রেকিং হলেও কোটি কোটি হুয়াওয়ে ব্যবহারকারীর মনে কেমন আঘাত দিয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়। এই নিষেধাজ্ঞা বেশিদিন স্থায়ী না হলেও হুয়াওয়ে বেশ বড় রকমের ধাক্কাই খেয়েছিল। তবে এই নিষেধাজ্ঞা থেকে বিশ্ব যে একেবারেই কিছু পায়নি সেটা বলা যাবে না। কারণ এমন ঘটনার পরই হুয়াওয়ে ঘোষণা দেয়, তারা নিয়ে আসছে নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম হারমনি। আগামী বছরই এই অপারেটিং সিস্টেমযুক্ত হ্যান্ডসেট বাজারে আনছে তারা। নেতিবাচকতার ভিড়ে এমন সুসংবাদ যেন প্রতিষ্ঠানটির হ্যান্ডসেট ব্যবহারকারীদের মনে প্রশান্তির বাতাস বইয়ে দিচ্ছিল।

এমন প্রশান্তির নিঃশ্বাস ছেড়েছিলেন দেশের প্রত্যেক অভিভাবকও। কারণ বছরের শুরুতেই গঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় মোস্তাফা জব্বার ও জুনাইদ আহমদ পলক তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই ঘোষণা আসে পর্নোগ্রাফি, অশ্লীল ওয়েবসাইট ও অ্যাপস বন্ধের। ঘোষণা মোতাবেক ফেব্রুয়ারিতেই ১৫ হাজার ৬৩৬টি পর্নো ও ২ হাজার ২৩৫টি জুয়ার সাইট বন্ধ করা হয়েছে বলে ঘোষণা দেন মোস্তাফা জব্বার। একই সঙ্গে জানান, বন্ধ করা হয়েছে অশ্লীলতায় অভিযুক্ত টিকটক ও বিগো লাইভ।

এরপর যেন দেশে বিভিন্ন ওয়েবসাইট, অ্যাপস ও গেমস বন্ধের হিড়িক পড়ে। একে একে বন্ধ করা হয় বেশিরভাগ পর্ন ও জুয়ার ওয়েবসাইট। এমনকি অক্টোবরে বন্ধ করে দেয়া হয় বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় অনলাইন গেমস ‘প্লেয়ার আননোনস ব্যাটলগ্রাউন্ডস’ বা পাবজি। তবে সেটি বন্ধের পরপরই খুলেও দেয়া হয়।

বন্ধ করতে করতে সমালোচনার মুখেও পড়ে কর্তৃপক্ষ। মে মাসে তারা আউটসোর্সিংয়ের ওয়েবসাইট আপওয়ার্কই দেশে বন্ধ করে দেয় বলে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। আপওয়ার্ক সূত্র ওই সময় জানায়, আরকে ডটকম নামে একটি অ্যাডাল্ট সাইট বন্ধ করতে গিয়ে যেসব ওয়েব সাইটের শেষে আরকে রয়েছে তেমন সব সাইট বাংলাদেশের নেটওয়ার্কে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আপওয়ার্কের ওয়েবসাইটের বানানে আরকে থাকায় সেটিও ব্লক করে দেয়া হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ টেলিকম অধিদপ্তর দাবি করেছিল তারা এমন কাণ্ড ঘটায়নি। অবশ্য ঘণ্টা পনের পর গ্রাহকদের থেকেও আর অভিযোগ আর আসেনি।

ঘটা করে জুয়ার ওয়েবসাইট বন্ধের পরও নীরবে-নীভৃতে অনলাইন ক্যাসিনো যে বাংলাদেশিদের মধ্যে এতটাই ছড়িয়েছিল তা হয়তো অক্টোবরে এর মূলহোতা সেলিম প্রধানকে গ্রেফতার না করলেই বোঝা যেত না। এর মাধ্যমে আয় হওয়া কোটি কোটি টাকা নাকি তিনি বিদেশে পাচারও করতেন। ভিপিএন ব্যবহার করেই জুয়াড়িরা অনলাইন ক্যাসিনোতে মেতে উঠতেন বলে তথ্য আসলেও ওই সময়েই জানা যায়, অনলাইন ক্যাসিনো রিপোর্টস ডট নেট ডট বিডি নামক এক ওয়েবসাইটের অনুমোদন দিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। বিষয়টি নিয়ে সময়ে সংবাদ প্রকাশের পর মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তৎক্ষণা ক্যাসিনো প্রশিক্ষণের ওই ওয়েবসাইটটি বন্ধও করা হয়।

সেলিম প্রধানকে যেদিন বিমান থেকে আটক করা হয় তখন থাই এয়ারওয়েজের ওই বিমানটি ছাড়তে দেরি হয় দেড় ঘণ্টা। বিমানে পর্যন্ত দেরি হওয়ার উদাহরণ থাকলেও রাজধানীর যেসব বাসিন্দা তাদের গন্তব্যস্থানে যেতে দেরি করতে চান না তাদের মধ্যে স্বল্প সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় পাঠাও। দেশের যেই রাইড শেয়ারিং অ্যাপটি মানুষকে উঠাও অর্থাৎ হেলিকপ্টারে রাইড শেয়ারিংয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছিল জুনে এসে তারাই যেন হতাশ করল সবাইকে। ওই মাসেই ব্যয় কমানোর অজুহাত দেখিয়ে তিন শতাধিক কর্মীকে ছাঁটাই করে বসল তারা। এরপর যেন অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি।

এই সুযোগে দেশে নিজেদের অবস্থান বেশ পাঁকাপোক্তই করে মার্কিন রাইড শেয়ারিং সার্ভিস উবার। তবে এ দেশে কোনো কিছু যেন ঠিকভাবে চলতে নেই। এবার প্রতিষ্ঠান ঠিকভাবে চলছে তো অপরপক্ষ ঝামেলা না বাঁধালে যেন কেমন নিরামিষ, নিরামিষ লাগছে। তাইতো অক্টোবরে বিশ্বে নজিরবিহীন এক ঘটনা ঘটালেন দেশের উবার চালকরা। ৯ দফা দাবিতে ২৪ ঘণ্টা ধর্মঘট ডাকেন তারা। এ ঘটনায় দুঃখও প্রকাশ করে উবার।

দেশ-বিদেশে যখন এতসব নেতিবাচক সংবাদ তখন পৃথিবী থেকে একটু দূরে যাওয়া যাক। হ্যাঁ চাঁদে! অন্বেষণের নেশায় বহুদিন ধরেই চাঁদে অভিযান চালাচ্ছে বিভিন্ন দেশ। একই উদ্দেশ্যে সেপ্টেম্বরে ভারত পাঠিয়েছিল চন্দ্রযান-২। তবে এই মিশনও ব্যর্থ।

এত ব্যর্থতা! চাঁদেও সফলতা নেই! তাহলে সবকিছু থেকে অবসর! হ্যাঁ অবসর না হোক অবসরের বয়সে অর্থাৎ কেউ বৃদ্ধ হলে দেখতে কেমন হবেন সেই ফিলিংসই দিচ্ছিল ‘ফেসঅ্যাপ’। জুলাইয়ে বিশ্বব্যাপী ভাইরাল হয়েছিল ওই অ্যাপ। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা যখন নিজেদের বৃদ্ধ বয়সের ছবি দেখতে উন্মুখ তখন বাগড়া বসিয়ে বসলেন এক মার্কিন সিনেটর। চিরায়ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হোক কিংবা ভিন্ন কারণ; ওই অ্যাপের মাধ্যমে রাশিয়া ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে এমন অভিযোগের মাধ্যমে যেন তার রেশ টেনে ধরে যুক্তরাষ্ট্র। শুধু এতেই মুক্তি মেলেনি, তদন্তের মুখেও পড়তে হয় ফেসঅ্যাপকে।

অঘটন ঘটন পটিয়সীর বছর ২০১৯ সালেই টেলিকম অপারেটর গ্রামীণফোনের মাদার কোম্পানি টেলিনর যা করেছে তা নিয়ে অনেকটাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন বাংলাদেশিরা। কারণ রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদকে এ মাসেই উকিল নোটিশ পাঠিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

গ্রামীণফোন থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা পাওনা আদায় করতে গিয়ে সরকারকে এমন ‘বিব্রতকর’ পরিস্থিতিতে পড়তে হলেও দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ফেসবুক ও ইউটিউবকে জার্মান ও মার্কিন মূলকে বড়  অংকের জরিমানা গুণতে হয়েছে এবছরই। দুই দেশে প্রতিষ্ঠান দুটির জরিমানা হয়েছে যথাক্রমে ২৩ লাখ ও ১৭ কোটি মার্কিন ডলার।

সংবাদটি মূলত তাদের জন্যই লেখা যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের দারুণ অভিজ্ঞতা দিতে গেল মাসেই ফাইভ-জি চালু করেছে চীন। বিশ্বজুড়ে বছরব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেও ছিল এই ফাইভজি।

এরইমধ্যে ফাইভ-জি মোডেম তৈরির ঘোষণা আসলেও ধরেই নেয়া হয় এখন বেশিরভাগ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মোবাইলেই তাদের কাজ সারেন। কারণ বিভিন্ন জরিপ বলছে, বিশ্বের প্রতি তিনজনের একজন ব্যবহার করেন স্মার্টফোন। হ্যান্ডসেট বিক্রি যে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে অ্যাপলের হ্যান্ডসেট নিয়ে সবসময়ই সাধারণের মধ্যে একটা বাড়তি উন্মাদনা থাকে। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। সেপ্টেম্বরে উন্মোচিত আইফোন এলেভেন, এলেভেন প্রো ও এলেভেন প্রো ম্যাক্স নিয়ে তেমনটাই উন্মাদনা থাকলেও এই তিনটি হ্যান্ডসেটে নাকি তেমন ব্যতিক্রম কিছু দেখাতে পারেনি অ্যাপল। তাই শোনা গিয়েছিল হতাশার বানীও।

তবে এরপরও প্রযুক্তি বিষয়ক মার্কিন ওয়েবসাইট সিএনইটি’র সম্পাদক মার্কিন প্রতিষ্ঠানটির হ্যান্ডসেটকেই বছরের সেরা বলে আখ্যায়িত করলেন। অ্যাপলের আইফোন এলেভেনের পর স্থান দিয়েছেন স্যামসাংয়ের গ্যালাক্সি নোট টেন প্লাস ও হুয়াওয়ের পি থার্টি প্রো’কে।

কে এক নম্বর হবে সেই প্রতিযোগিতা যখন কিছু হ্যান্ডসেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তখন কিছু প্রতিষ্ঠানের হ্যান্ডসেট বিস্ফোরণে সাধারণের প্রাণ হারানোর সংবাদও শিরোনাম হয়েছে কয়েকবার।

এত হতাশা আর মৃত্যুর সংবাদের মধ্যে কিছু সময়ের জন্য মানুষের বিনোদনের খোরাক হয়েছে ই-কমার্স ওয়েবসাইটগুলো। এ বছরই অনলাইনে মোবাইল অর্ডার দিয়ে কেউ পেয়েছেন কাপড় কাচার সাবান, কেউবা পাথর। বিদেশের সংসদ সদস্যরাও যখন ই-কমার্স সাইটের এমন কাণ্ড থেকে রেহাই পাচ্ছেন না তখন দেশের সাইটগুলো বসে থাকে কীভাবে? তাই হয়তো চট্টগ্রাম সিরাজুল ইসলাম দারাজ থেকে যখন ঘড়ি অর্ডার করেন তখন তাকে দেয়া হয় ঘড়ির কাঁটা!

চীনা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে যখন একের পর এক অভিযোগ তখন কিছুটা চুপসে যাচ্ছিল পিকাবো। নভেম্বরে খবর আসে, বিনিয়োগ না পেলে ডিসেম্বরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে মাস পেরুতেই খবর আসে নতুন বিনিয়োগের। কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা এগিয়ে যেতে চান নতুন উদ্যোমে।

বিশ্বব্যাপী এত হতাশার মাঝেও দেশের মানুষের মাঝে অনেকটাই আনন্দ বয়ে যায় যখন অক্টোবরে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেশের সব টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচার শুরু করে। এছাড়া আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, ব্লক চেইন ও মেশিন লার্নিংয়ের মতো প্রযুক্তিগুলোর উৎকর্ষতা যেন এসব হতাশাকে অনেকটাই হ্রাস করেছে।