SomoyNews.TV

Somoynews.TV icon খেলার সময়

আপডেট- ১০-১২-২০১৯ ১৭:১০:৩২

কেন ব্যর্থ গ্যালাটিকোস নীতি?

real-madrid

ডেভিড বেকহ্যাম, রোনালদো, জিনেদিন জিদান, লুইস ফিগো- এমন সব খেলোয়াড় নিয়েই ২০০০/২০০১ মৌসুমে টিম গড়েছিলেন রিয়াল মাদ্রিদ প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ। দামী আর তারকা ফুটবলারে ঠাসা রিয়ালের সেই দলটি ফুটবল জগতে ‘গ্যালাকটিকোস’ বলে পরিচিতি লাভ করেছিলো। যে তকমা আজো জড়িয়ে আছে রিয়ালের সাদা জার্সিতে। আবার কাড়িকাড়ি অর্থ ঢেলে দুনিয়ার কোনা কোনা থেকে সেরা ফুটবলার এনে গড়া দলটির সফলতা নিয়েও বিতর্ক থামেনি আজও।

বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ ফল না থাকায় এর সফলতা কিংবা ব্যর্থতার বিচার সঠিকভাবে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তবে যখনই গ্যালাকটিকোস শব্দটি সামনে এসেছে সঙ্গে সঙ্গে ব্যর্থতার বিষয়টিও চলে এসেছে। অনেকে তো বলেই বসেন, ব্যর্থতার আরেক নাম গ্যালাকটিকোস।

ওই যুগে রিয়ালের কিছু সফলতা থাকলেও এত যোগ্য ও দামী ফুটবলার নিয়ে যতটা ভক্তরা আশা করেছিলেন তার ছিটেফোঁটাও দিতে পারেনি ক্লাবটি। ওই সময়ের আগে ক্লাবটি সবসময় তরুণ ফুটবলারদের নিয়ে টিম গঠন করলেও গ্যালাটিকোস যুগের শুরুতে তাদের টিমে ছিল সময়ের সেরা প্লেমেকার জিদান, তারকা ফরোয়ার্ড এবং ফ্রিকিক স্পেশালিস্ট ডেভিড বেকহ্যাম, ওভার ল্যাপিং ফুলব্যাকে রবার্তো কার্লোস এবং ফিনিশিংয়ে রোনালদো। দলের বাকি লিস্টের খেলোয়াড়রাও সবাই বড় তারকা। ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে এমন দক্ষ খেলোয়াড় থাকা সত্ত্বেও টিম হয়ে খেলার মাঠে তারা তেমন চমক দেখাতে পারেননি।

কেন তারা পারেননি সেই বিষয়ে আলোচনার আগে এমন খেলোয়াড়দের নিয়ে টিম গঠনের চিন্তা কোথা থেকে আসলো সেই বিষয়টি একটু খতিয়ে দেখা দরকার। রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর লুইস ফিগোকে কিনতে রেকর্ড ৩৭ মিলিয়ন ইউরো দর হাঁকানো শুরু করেন পেরেজ। আজকের ফুটবল বিশ্বে এই অংক খুব কম শোনালেও তখন এটিই ছিল বিশ্ব রেকর্ড। আর একেই ফুটবলে গ্যালাকটিকোসের শুরু বলে ধরে নেয়া হয়। অবশ্য তাকে দলে নেয়ার পর লা লিগা শিরোপাও জেতে রিয়াল। ক্লাবের সকল ঋণ চুকাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ পেরেজ প্রতি গ্রীষ্মে কমপক্ষে এমন একজন তারকাকে (গ্যালাটিকোস) দলে ভেড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। ২০০১ সালে ৪৬ মিলিয়নে দলে নেন জিনেদিন জিদানকে। তার গোলে ভর করেই সেবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা ঘরে তোলে রিয়াল। বাণিজ্যিকভাবেও সফলতা পেতে থাকেন পেরেজ। কারণ জিদান থাকাকালীন রিয়ালের জার্সি বিক্রিতে সকল রেকর্ড ভেঙে যায়।

এরপর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে দলে ভেড়ানো হয় ডেভিড বেকহ্যামকে। তাকে নেয়া হয় ২৫ মিলিয়ন ইউরোতে, অল্টার স্যামুয়েলকে নেয়া হয় ১৭ মিলিয়নে। এরপর একে একে ক্লাবে নেয়া হয় রোনালদো, রবিনহো, রুড ভ্যান নিস্টেলরয় এবং মাইকেল ওয়েনকে। ২০০৩ সালে তারকাবহুল এই দলটি লা লিগা শিরোপা জিতলেও পরের তিন বছর সুবিধা করতে পারেনি।

এই সময়টাকেই রিয়ালের সবচেয়ে ব্যর্থ বলে ধরে নেয়া হয়। তবে এই ব্যর্থতাকে বিভিন্ন বিশ্লেষক বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। অনেক আলোচনার মধ্যে এটিও আছে যে সব দামী ও তারকা খেলোয়াড় নেয়ায় টিমের কেউই আসলে দলের জন্য খেলছিলেন না। প্রত্যেকেই চেষ্টা করছিলেন নিজেকে উপস্থাপনের জন্য। নিজেদের মধ্যে একটা নীরব প্রতিযোগিতা চলছিল। প্রত্যেকেই নিজেকে প্রমাণের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। যে কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল টিম ওয়ার্ক। তাই টিমের প্রত্যেকেই শক্তিশালী হওয়ার পরও নিজেদের মধ্যে বোঝাপাড়ার ঘাটতির কারণে ‘দুর্বলদের’ বিপক্ষেও সুবিধা করতে পারেননি। ওই সময়টাকে রিয়ালের এতটাই খারাপ সময় বলে বিবেচনা করা হয়েছিল যে বলা হয়েছিল ১৯৫৩ সালের পর রিয়ালের সবচেয়ে খারাপ সময় ছিল সেটি। কারণ ১৯৫৩ সালের পর কখনোই লা লিগায় রিয়ালকে পরপর তিনবার শিরোপা বঞ্চিত হতে হয়নি।

এছাড়া দল থেকে ক্লাউডি মাকেলিলির চলে যাওয়া, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, কোচ ভিসেন্তে ডেল বকসকে ছাঁটাই, এক সিদ্ধান্তে বেশিদিন স্থায়ী না হওয়া, ফুটবলার কেনার ক্ষেত্রে খেলোয়াড়ের চাইতে মার্কেটিংয়ের বিবেচনাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া যেমন একই ক্ষেত্রে পারদর্শী একাধিক ফুটবলারকে কেনার মতো সিদ্ধান্তকে দায়ী করা হয় ওই ব্যর্থতার জন্য।

ব্যর্থতার এসব কারণের ভিন্ন ভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে একেক পক্ষ। যেমন, ফুটবলারদের ব্যাখ্যা এক, ফুটবল কোচের আরেক, ম্যানেজারের এক তো ফুটবল বিশ্লেষকের আরেক, আবার ওই সময়ের টিম মেম্বারদের বিশ্লেষণ একেবারেই ভিন্ন। তবে টিম ওয়ার্কে বিশ্বাসীরা সবসময়ই অন্যসব কারণ বাদ দিয়ে দুষেছেন শুধুমাত্র খেলোয়াড়দেরই। তাদের দাবি, তারকারা নিজেদের প্রমাণে এতটাই ব্যতিব্যস্ত ছিলেন যে, দল যে একের পর এক শিরোপা বঞ্চিত হচ্ছে সেদিকে তাদের কোনো খেয়ালই ছিল না। দলের লক্ষ্য পূরণে নজর না দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থে মনোযোগী ছিলেন তারা। দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং সেরা হওয়ার পরও তারা টিম হিসেবে ছিলেন না। তাই দল গঠনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সেরার দিকে নজর না দিয়ে রিয়ালের উচিত ছিল নামের নয় বরং কাজের টিম গঠন করা। তবেই তারা হয়ে উঠতেন অপ্রতিরোধ্য।

ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে ফ্লোরেন্তিনোর বিদায়ের পর ২০০৬ সালে ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আসেন র‌্যামন ক্যালডেরন। তিনি এসে ক্লাবের গ্যালাটিকোস নীতি থেকে সরে যান। এরপর আরও বেশকিছু পদক্ষেপ নেন। এর ফলশ্রুতিতে ২০০৭ সালে আবারও লা লিগার শিরোপা ঘরে তোলে রিয়াল মাদ্রিদ। তবে রিয়ালের পেরেজের শাসন সেখানেই শেষ ছিলো না। ২০০৯ সালে স্পেনের এ ধনী আবারো ফিরে আসেন রিয়ালের মসনদে।