SomoyNews.TV

ভ্রমণ

আপডেট- ১৫-১১-২০১৯ ১৯:৩২:৫০

এক টুকরো স্বর্গরাজ্য

প-খ-র-

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নেপাল। মন্দিরের শহর কাঠমান্ডু আর অন্নপূর্ণার কোল ঘেঁষা দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় শহর পোখারা যেন এক টুকরো স্বর্গরাজ্য। 

অন্যদিকে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে সাত হাজার ফুট ওপরে অবস্থিত নাগরকোট যেন স্বর্গেরই আরেক নাম। যেখানে, হিমালয়ের বুক চিড়ে বের হওয়া রক্তিম সূর্যের সোনালী আভা, মেঘের আড়ালে উঁকি দেয় ক্ষণে ক্ষণে। 

নেপালে আমার প্রধান গন্তব্য পোখারা আর নাগরকোট হলেও, কাঠমাণ্ডু নেমেই গগনচুম্বি পাহাড় আর সবুজে ঘেরা চারপাশ দেখে মনে পড়ে গেল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের 'হিমালয়' কবিতার দুটি লাইন-

"তোমার বিশাল ক্রোড়ে লভিতে বিশ্রাম-সুখ,
ক্ষুদ্র নর আমি এই আসিয়াছি ছুটিয়া."

নেপালকে বলা হয়ে থাকে মন্দিরের দেশ। পড়ন্ত বিকেলে কাঠমাণ্ডু শহর ঘুরতে ঘুরতে প্রমাণও মিললো তার। উঁচুনিচু পথ আর পাহাড়ের কোল ঘেষা আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে যেতে যেতেই দেখা মিললো কাঠমাণ্ডুর অন্যতম প্রতীক সম্ভুনাথ মন্দির।

রাতের কাঠমাণ্ডু যেন আরও প্রাণচ্ছল। সন্ধ্যা নামতেই শহরের প্রাণকেন্দ্র থামেল পরিণত হয় দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মিলনমেলায়।

রাত শেষে সকালের কাঠমাণ্ডু দেখতে না পারার অতৃপ্তি নিয়েই নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর পোখারার পথে যাত্রা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ হাজার ফুট ওপরে সুউচ্চ পাহাড়ের কোল ঘেষা মাইলের পর মাইল আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে যখন পোখারায় যাচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল স্বর্গে পৌঁছাবার রাস্তা বুঝি এমনই হয়।

পোখারা পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। দেখা মিললো সাজানো গোছানো পাহাড়ে ঘেরা ছোট্ট এক শহরের। আর দূর পাহাড়ের পেছেনেই আপন রূপে মহিয়ান সুবিশাল হিমালয়।

সূর্য যখন স্তিমিত ঠিক তখন হিমালয়ের অন্নপূর্ণা শৃঙ্গের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা ফেওয়া লেকের বুকে নৌকাভ্রমণ মনে জাগালো এক স্বর্গীয় অনুভূতি। লেকের বুকে সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য যেন নিজের অজান্তেই মন ভুলিয়ে দেবে যে কাউকে।

নৌকা নিয়ে আরেকটু এগোলেই লেকের ঠিক মাঝখানে এক টুকরো দ্বীপের মতো অবস্থান বরাহি মন্দিরের।

পর্যটকরা বলছে, লেকের ঠিক মাঝখানে এই মন্দিরটি সত্যিই খুব সুন্দর। আকাশটা আজ একটু মেঘলা। তাই হিমালয় পুরোপুরি দেখা না গেলেও, পাহাড়ে ঘেরা এই লেকটিতে এসে সত্যি খুব ভাল লাগছে।

অপর পর্যটক বলেন, পোখারার যে বিষয়টি সবচেয়ে ইতিবাচক তা হলো, এখানে কোন বায়ুদূষণ নেই। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর পুরোপুরি শান্ত একটি শহর। এখানকার মানুষজনও বেশ আন্তরিক।

পর্যটকের ভাষায়, আমি নেপালি হলেও, পোখারায় এটাই আমার প্রথম ভ্রমণ। শুধু এই লেক না, লেকের আশপাশটাও খুব সুন্দর।

পোখারায় ঘুরতে আসা পর্যটকদের আরেক আকর্ষণের আরেক নাম প্যারাগ্লাইডিং। নগরীর সারাংকোটে সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় গেলে দেখা মিলবে পাখির মতো আকাশে উড়ে বেড়ানো শত শত প্যারাগ্লাইডারকে।

হিমালয়ের অন্নপূর্ণা রেঞ্জ আর ফিশটেইল শৃঙ্গসহ পুরো পোখারাই যেন স্পষ্ট এই সারাংকোট থেকে। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলেও, নিজ দেশের অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন নিয়ে আক্ষেপও হচ্ছিল বেশ।

পর্যটকরা বলছেন, পোখারায় সুবলং বা জাফলং এর মত সুউচ্চ ঝর্ণার দেখা না মিললেও, খুঁজে পেলাম ১০০ ফুট গভীর আর প্রায় ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্যের ঐতিহাসিক জলপ্রপাত ডেভিস ফল। ১৯৬১ সালে ডেভিস নামে এক সুইস পর্যটক জলপ্রপাতটিতে পড়ে গেলে, বেশ কয়েকদিন পর উদ্ধার হয় তার লাশ। সুইস নারী ডেভিস এই জলপ্রপাতটিতে পতিত হওয়ার পরই এর নাম হয় ডেভিস ফল।

পোখারার সুখস্মৃতি নিয়েও রওনা হলাম হিমালয়ের দেশে আমার শেষ গন্তব্য সুউচ্চ পাহাড়ে ঘেরা নেপালের মধ্যাঞ্চলীয় আরেক স্থান/এলাকা 'নাগরকোট' এর উদ্দেশ্যে।

সুউচ্চ পাহাড়ের বুকে মেঘের আড়ালে কিছুক্ষণ পরপরই উঁকি দেয় পুরো হিমালয়সহ এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট। হিমালয়ের রূপ যেন আরও জাগ্রত এই নাগরকোট থেকে।

মেঘকে স্পর্শ করতে করতে হঠাৎ অনুভব করলাম, মেঘেরও গন্ধ আছে, আছে মাতাল করা এক অদ্ভূত শক্তি।

ঘুরতে যাওয়া মানুষেরা জানান, নাগরকোট সত্যই খুব সুন্দর। হিমলায়কে দেখার জন্য এর চেয়ে সুন্দর কোন জায়গা আর আছে বলে মনে হয়না। এলাকাটি এতই ছোট যে, আপনি চাইলে পায়ে হেটেই পুরো নাগরকোট ঘুরে দেখতে পারবেন।

পর্যটকদের মতে, এটা সত্যি অসাধারণ একটি জায়গা। এখান থেকে হিমলায় দূরের পাহাড়গুলো দেখার অনুভূতি আসলে ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়।

তবে, নেপাল ভ্রমণের প্রায় পুরোটা সময়ই কমবেশি হিমালয়ের দেখা মিললেও, দেশে ফেরার পথে প্রায় ৩২ হাজার ফুট ওপর দিয়ে বিমানের জানালা দিয়ে দেখতে পাওয়া হিমালয় যেন হার মানায় সবকিছু।