SomoyNews.TV

Somoynews.TV icon মুক্তকথা

আপডেট- ১৫-১১-২০১৯ ১১:৪৬:১২

ইউরোপের রাজনীতিতে মুসলিমবিদ্বেষ কেন?

mashud

উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা ও স্থাপত্য শিল্পের জন্য বিখ্যাত ইতালির সিনেয়া। প্রদেশটিতে অন্যান্য ধর্মীয় উপাসানালয়ের পাশাপাশি রয়েছে ৪-৫টি মসজিদ। ওই এলাকা থেকেই গেল মঙ্গলবার ১২ জন উগ্রপন্থীকে গ্রেফতার করা হয়। সংবাদমাধ্যমের বদৌলতে এখন পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে সেই তথ্যানুযায়ী তারা প্রত্যেকেই ছিলেন মুসলিমবিদ্বেষী এবং তাদের উদ্দেশ্য ছিল সেখানকার মুসলিম ও মসজিদে হামলা চালানো।

এ পরিকল্পনায় যারা অংশ নেন তারা দেশটির উগ্রপন্থী সংগঠন ‘ফার রাইট খ্রিস্টানের’ সদস্য। ওইদিনের হামলার পরিকল্পনার জন্য এ সদস্যরা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, বোমা ও ডেটোনেটর মজুদ করেছিলেন; যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে। দেশটির পুলিশ বলছে, গ্রেফতাররা যদি তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারত তবে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতেন সেখানে অবস্থানরত মুসলিমরা। তবে কেন তারা এমন পরিকল্পনা করেছিলেন? কেন মুসলমানদের ওপর তাদের এমন বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব কিংবা কী ফায়দা হাসিলের জন্য তাদের এমন পরিকল্পনা? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে হলে প্রথমেই ইউরোপের অর্থনীতির বিষয়টি পর্যালোচনা করতে হবে।

গেল এক দশক ধরেই অস্থিতিশীল ইউরোপের অর্থনীতি। আর এই অস্থিতিশীলতার কারণ হিসেবে সেখানকার বাসিন্দারা দুষছেন অভিবাসনকে। তাই তাদের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে অভিবাসনবিরোধী মানসিকতা। যা হিটলারের নার্সিজম ও মুসোলিনির ফ্যার্সিজমের সঙ্গে মিলে যায়। পার্থক্য কেবল উপাদান। তখন লক্ষ্য ছিল ইহুদি, এখন লক্ষ্য মুসলিম অভিবাসন।

গেল দুই-তিন বছরের ইউরোপীয় রাজনীতির দিকে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। যেমন ইউরোপের দেশগুলোতে অভিবাসনকে ভালো চোখে দেখছেন না সেখানকার বাসিন্দারা।

গত বছর সেপ্টেম্বরে সুইডেনের অভিবাসনবিরোধী দল খ্রিস্টান ডেমোক্রেস ১৮ শতাংশ ভোট পেয়ে দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম দলে পরিণত হয়। এ ঘটনা অবাক করে সমগ্র ইউরোপবাসীকে। চেক রিপাবলিকে গত বছর পুনরায় জয় পান অভিবাসনবিরোধী প্রেসিডেন্ট মিলোস জামান। অস্ট্রিয়ার অভিবাসনবিরোধী দল ফ্রিডম পার্টি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়েছে, যা প্রথমবারের মতো ঘটল।

মুসলিম অভিবাসনবিরোধী নীতির জন্য হাঙ্গেরির ভিক্টর ওরভান তৃতীয়বার জয়ী হয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। পোল্যান্ডের ল অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি, ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফ্রন্ট, ইতালির লেইগা নর্দের মতো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান প্রচার ও কর্মসূচির মুখ্য বিষয় অভিবাসনবিরোধী ও মুসলিমবিরোধী প্রচারণা। তাদের অনেকেই এখন ক্ষমতায়, আবার কেউ কেউ ক্ষমতার অংশীদার।

সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, জার্মানির ১২ দশমিক ৫ শতাংশ, স্পেনের ১৫, হল্যান্ডের ১৩, ডেনমার্কের ২১  ও বেলজিয়ামের ২০ শতাংশ মানুষ মুসলিম অভিবাসনবিরোধী। এছাড়া ব্রেক্সিটের পক্ষের অধিকাংশ ভোটই এসেছে অভিবাসনবিরোধী প্রচারণায়।

ইউরোপজুড়ে বর্তমানে মুসলিম অভিবাসনের এমন অবস্থা হলেও কয়েক বছর আগেও অবস্থা ছিল ভিন্ন। তাহলে বর্তমানে এই অবস্থার দায়ী কে? কেন অভিবাসনবিরোধী ও মুসলিমবিরোধীরা দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছেন?

এ বিষয়ে ইউরোপীয় ধর্ম বিষয়ে গবেষণা কেন্দ্র আইইআরএস বলছে, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার দোহাই দিয়ে ধর্ম ও বর্ণবাদকে পুঁজি করে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করা অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা মাঝে মাঝেই প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে মুসলিম অভিবাসীদের আক্রমণ করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিয়ে আলোচনায় থাকতে চান।

তবে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে অনেকের। কারণ কোনো রাজনৈতিক নেতা কিংবা দল কোনো রকম সন্ত্রাসী সংগঠনকে সরাসরি সমর্থন দিতে পারে না। তবে নেতাদের আচরণ ও দলের কর্মসূচি সাধারণ কর্মী ও জনগণকে বিপদগ্রস্ত করতে উৎসাহী করে। যেমনটি করছে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড। এটা মোটেই কাম্য নয়।

এসব ঘটনা মুসলমানদের জন্য আতঙ্কিত ও উদ্বেগজনক হওয়ার মতো। তবে সাম্প্রতিক ঘটনার জন্য ইতালির পুলিশ প্রশাসনকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। কারণ পরিকল্পনার সময়ই তারা হোতাদের গ্রেফতারে সক্ষম হয়েছে। উগ্রবাদীরা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে সেটা হতো ইতালির মতো পর্যটন শিল্পের দেশের জন্য আত্মঘাতী একটা ব্যাপার। তাই এই ঘটনায় জড়িত সব সন্ত্রাসীকে গ্রেফতারের জন্য অভিযানে নেমেছে দেশটির গোয়েন্দা পুলিশ। ইতালির মুসলিম অভিবাসীরা তাদের সফলতা কামনা করছে।

লেখক : মাকসুদ রহমান, প্রবাসী সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। সময় সংবাদের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতে পারে। লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় সময় সংবাদ নেবে না।