SomoyNews.TV

Somoynews.TV icon মহানগর সময়

আপডেট- ১৪-১১-২০১৯ ১৮:১২:২১

চট্টগ্রামে মহামারী হয়ে উঠেছে গরুর ‘লাম্পি স্কিন’ রোগ

cow

চট্টগ্রামে গরুর ‘লাম্পি স্কিন’ রোগ মহামারীর আকার ধারণ করেছে। চট্টগ্রামের প্রায় প্রতিটি খামারে এই রোগের কারণে গরুর দুধের উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। মারাও গেছে অনেক গরু।

বৃহস্পতিবার (১৪ নভেম্বর) চট্টগ্রামের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে এসব তথ্য জানা গেছে। এসব খবরে আরো বলা হয়েছে, প্রানিসম্পদ অধিদপ্তর এখনো এই রোগ নিয়ন্ত্রণে খামারিদের যথাযথ পরামর্শ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ রোগের কোনো ভ্যাকসিনও দেশে নেই।

জানা গেছে, গত এপ্রিল মাসে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহার একটি খামারে এ রোগ প্রথম সনাক্ত হয়। পরে ধীরে ধীরে এ রোগ বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ে। লাম্পি স্কিন আক্রান্ত গবাদি পশু নিয়ে গরু পালনকারীরা এখন দিশেহারা।  

বিভিন্ন খামারির সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রথমে গরুর চামড়ার উপরিভাগে টিউমারের মতো উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। পরে তা পক্সের মতো গুটি গুটি হয়ে গরুর শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ছে। দু একদিনের মধ্যে প্রাণীর সারা শরীরে তা বড় বড় হয়ে ফেটে গিয়ে ঘা-এর সৃষ্টি করছে। রোগাক্রান্ত গরু কিছু খাচ্ছে না। ক্রমে শরীরে ক্ষত ছড়িয়ে পড়ে ধীরে ধীরে গরুটি মারা যাচ্ছে।

গত ২২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিভাসু) লাম্পি স্কিন নিয়ে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশেষজ্ঞরা জানান, লাম্পি স্কিন রোগটি চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও নেত্রকোনা, ঝিনাইদহ, রাজশাহী, বরিশালসহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও রোগটিতে মৃত্যুর হার কম, তবে লাইভস্টক শিল্পের অর্থনীতিতে এটি ব্যাপক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। রোগটি ১৯২৯ সালে প্রথম জাম্বিয়াতে দেখা যায়। পরে তা আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৩ সালে মধ্যপ্রাচ্যে এবং ২০১৪-২০১৫ সালের দিকে আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, কাজাখস্থানসহ আশেপাশের দেশে দেখা যায়। ২০১৬ সালে লাম্পি ডিজিজ গ্রিস, সাইপ্রাস, বুলগেরিয়ায়, সার্বিয়া, কসোভোতে ছড়ায়। চলতি বছর এশিয়া মহাদেশের চীন ও ভারতের কিছু কিছু অঞ্চলে দেখা যায়।

চিটাগং ডেইরি ফার্ম এসোসেয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নাঈম উদ্দিন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট কোনো ভ্যাকসিন না থাকায় খামারিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। দ্রুত এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মাংস ও দুধ উৎপাদনকারী খামারগুলোর অনেক গবাদি পশু ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশে উৎপাদন সম্ভব না হলে দ্রুত বিদেশ থেকে ভ্যাকসিন আনার দাবি জানান তিনি।

লাম্পি স্কিন-কে কেউ কেউ ‘কাউ ফক্স’ও বলেন। এই রোগটি বাংলাদেশে আগে দেখা যেতো না। সম্ভবত এই বছরই প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে।

রোগের লক্ষণ : আক্রান্ত গরু প্রথমে জ্বরে আক্রান্ত হয় এবং খাবার রুচি কমে যায়। জ্বরের সাথে সাথে মুখ দিয়ে এবং নাক দিয়ে লালা বের হয়। পা ফুলে যায়। সামনের দুই পায়ের মাঝ স্থান পানি জমে যায়। শরীরের বিভিন্ন জায়গা চামড়া পিন্ড আকৃতি ধারণ করে, লোম উঠে যায় এবং ক্ষত সৃষ্টি হয়। ধারাবাহিকভাবে এই ক্ষত শরীরের অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষত মুখের মধ্যে, পায়ে এবং অন্যান্য জায়গা ছড়িয়ে পড়তে পারে। ক্ষত স্থান থেকে রক্তপাত হতে পারে। পাকস্থলী অথবা মুখের ভিতরে সৃষ্ট ক্ষতের কারণে গরু পানি পানে অনীহা প্রকাশ করে এবং খাদ্য গ্রহণ কমে যায়।

লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত গরু থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে রোগটি অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়ে। এই রোগ এক গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়ার প্রধান মাধ্যমগুলো হচ্ছে মশা ও মাছি। গরুর লালা থেকেও ছড়ায়। আক্রান্ত গাভী থেকে বাছুর দুধ পান করলে সেই বাছুরও আক্রান্ত হতে পারে। আক্রান্ত গরুকে যে সিরিঞ্জ দিয়ে ইনজেকশন দেয়া হয় সেটি দিয়ে সুস্থ গরুকে ইনজেকশন দিলেও ছড়াতে পারে। খামারে কাজ করা মানুষের পোশাকের মাধ্যমে আক্রান্ত গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ভাইরাস আক্রান্ত ষাঁড়ের সিমেন এই রোগের অন্যতম বাহন।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপপরিচালক ফরহাদ হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, মূলত কোরবানির সময় থেকেই এই রোগ ব্যাপক হারে দেখা দিয়েছে। যেহেতু চাহিদা ছিল না তাই ভ্যাকসিনও ব্যাপক হারে তৈরি হয়নি। বর্তমানে রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর ভ্যাকসিনের সংকট তৈরি হয়েছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। সরকার ভ্যাকসিন তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে। তিনি জানান, এই রোগ শুধু চট্টগ্রামে নয়। দেশের অন্যান্য জেলাতেও দেখা দিয়েছে।