SomoyNews.TV

Somoynews.TV icon অন্যান্য সময়

আপডেট- ৩১-০৩-২০১৫ ২৩:২৩:৪৯

রাজকাহিনী: আত্মা তাঁর রাজার মতোই

sssssss

এঁর বাবা-দাদারা রাজপরিবারের ছায়াও দেখেননি কোনোদিন। তবুও অতিবিলাসিতায় আক্রান্ত বাবা ছেলের নাম রেখেছেন রাজা!!! নামের বদৌলতে যদি ভাগ্য খোলে কখনও, এমন চিন্তাধারায় হয়তো নামটি রাখা।

এমন আর্থিক-সামাজিক দৈন্যতায় ভোগা পরিবারে সন্তানদের নাম রেখে বাবা-মা হয়তো একধরনের উপহার দেন সন্তানদের। রাজপ্রাসাদ, রাজভাণ্ডার কোনো কিছুই যখন উত্তরাধিকার সূত্রে পাবার জো নেই, তখন সারাজীবন বয়ে বেড়ায় যারা নামের বোঝা- সেরকম একটি চরিত্র 'রাজা'।

বাগেরহাটের মংলা পোর্টের কাছে নদীর পাড়ে ঘুরতে গিয়ে সাতসকালে দেখা এ বেমানান নামসর্বস্ব রাজা'র সঙ্গে।

পিকনিক স্পটের পাশে নদীর পাড়ে ক্ষয়ে যাওয়া বেড়িবাঁধ। এর আশ্রয়ে তিনটি ঘর, প্রথম দু'টিতে খড়-ছন-বাঁশের আবাস, নুয়ে পড়া রান্নাঘর, জালের অংশ, মাছ ধরার উপকরণ আর গোবরের গন্ধে বোঝা যায় বাড়ির বাসিন্দাদের দশা ও পেশা সম্পর্কে।

গল্প-উপন্যাস ও অন্যান্য মাধ্যমে যেমন পরিচয় পাওয়া যায় তেমনি বর্ণনার- নেড়ি কুকুর, কলাগাছ, নুয়ে পড়া লতা, কোনা ভাঙা বাঁশের মাচা, হাঁসের খাবারের ছিটানো অংশ- চোখে দেখে, পায়ে এড়িয়ে কিছুদূর গেলে বাম পাশেই রাজের বাসা। কয়েক গজ দূরেই আধামরা নদী; জোয়ারে জীবিত-ভাটায় মরা।

অন্য দু'টি ঘর থেকে রাজের ঘরটি অবশ্যই বাড়তি নজর কাড়ে। কেননা- বেঁদে দলের একেকটি খুপড়ি যেমন হয়, এটি তেমন নড়বড়েও নয়, আবার স্থায়ীভাবে থাকার মতো কোনো ঘরও নয়। অথচ বাইরে তার পাখির খাঁচা, হাঁস-মুরগির খোপ, মাছ ধরার জাল, থাকার ঘরের মতোই নিচুজাতের একটি রান্নাঘর- সবই আছে।

চেহারা দেখে মনে হলো ছেলেটি দিনের অর্ধেক সময় কাটে দুঃশ্চিন্তায়। বয়স অনুমান আঠারো-উনিশ, মুখের গড়নে লাজুক ভাব স্পষ্ট। স্নেহের দৃষ্টি আকর্ষণের সব উপাদান ঐ চেহারায় যে আছে- তা খুব চোখে পড়ে।

শুরু হলো পাখির খাঁচা আর কবুতরের খোপ সম্পর্কে জানতে চেয়ে....
খাঁচা খালি কেন? কবুতর কয় জোড়া?- প্রশ্নের জবাবে মাথা নিচু করেই কাঠি দিয়ে মাটিতে আঁকতে থাকা ছেলেটির উত্তর
-'পাখি পুষপো কেমন করি, নিজেগেই থাকা জোটে না, পাখি রাখপো কোথায়?'

-ভাই, তোমার নাম কি?
এবার তার মাথা তুলে তাকানো। ছবি তোলার জন্য সহযোগীকে দেয়া হাতের ইশারা সে দেখতে পেয়েছে। 
-'নাম ভাই রাজা, আচ্ছা ভাই, ছবি নিচ্ছেন তাতে কোনো সমস্যা হপি না তো?'
কৌতুহল আরো বাড়লো, কেন, কী সমস্যা? জানতে চাইলাম।

পোর্টের লোক আসি কখন যে তুলি দেয়.....
নদীর পাড়ে থাকা মেয়েটার দিকে এবার নজর গেল, রাজাকে রাজহাঁসের বাচ্চার জন্য খাবার বের করতে বলছেন তিনি।
-তুমি আসি নিয়ে যাওগে, দেখতে পাচ্ছো না, মেহমান স্যারেগে সঙ্গে কতা কচ্চি।

এবার বুঝলাম এজন রাজার স্ত্রী, কিন্তু যথারীতি অকালে কিছুটা বুড়িয়ে যাওয়া; যে কেউ দেখলে রাজার মা-ফুপু-খালা ভেবে বিব্রত হতে পারে। একটি ঝাড়ি নির্গত হবার শব্দ আশা করলেও রানি ঠিক ভদ্রতার রানির মতোই উঠে নিঃশব্দে উঠে গেলেন।

রাজার কথায় আবার চোখে-মনে আগ্রহ ফিরে এলো।

---' ডিসি সাহেব এখানে একবার এসছিলেন, তো কথা বলা শালিক দেখে তিনি পছন্দ করলেন....... আমাকে বললো দাম কত?

-আমি বললাম দাম দিতি হবে না একটা টাচ মোবাইল পেলে....
তিনি তাতেই রাজি হয়ে গেলেন....
অন্য খাঁচায় ভরে দিয়েছি, এই প্রথম টাচ মোবাইল পেলাম.....

লাজুক রাজ বলেই চলছেন-
'বোজলেন ভাইজান, সিভিলে এসছিলেন তো, যখন জানতি পারিচি তিনি ডিসি সাহেব, 
তখন তো আমি কিছুতেই ফোন নেবো না....
পোরথমে ভাবিচি পিকনিকের লোক আসিছে এলাকাতে... 
আমারও একটা টাচ মোবাইল দরকার ছেলো....'
পরিচয় পেয়ে বুজলাম- তিনি আমাগে এলাকার মেহমান, তার কাচ থেইকে টাকা বা মোবাইল রাখি কেমন কইরে... 
আমি তো মোবাইল রেখে লজ্জায় পড়িচি, ডিসি সাহেব এলাকার মেহমান......তিনি জোর করে.....'

এই প্রথম আমার ধারণা পাল্টালো, এর আত্মাটাকে মনে হলো রাজার মতোই। বাবা মায়ের নামটি হয়তো এখানেই স্বার্থক; ওর বিবেক আর বিবেচনা বোধ.......

এবার কৌতুহল শ্রদ্ধার সাথে বাড়লো।
-ঘরের অবস্থা এমন কেন?
'কি করবো ভাইজান, পোর্টের লোক এসে তুলে দেয়....তাই ছাপড়া তুলি, ভাঙতি আসলি দূরে ঘুরি বেড়াই, পাবলিকৈর সাতে মিশি থাকি... মেয়ে-ছেলেরা ঘরে থাকে- তাগে মারে না;
খালি ঘর তুলি ফেললি আর কিচু কয় না।'

- মেহমান আসে না?
-খবর নিয়ে পরে আসে....আমি পোর্টে গিয়ে খবর নিয়ে আসি-কবে ভাঙবে...

'একবার বুজিছেন, বাচ্চার মামাবাড়ির লোক বেড়াতে এসেচে তাগে সামনেই ঘর তুলি দিলো, পোর্টের লোক গেলি পরে রাতে ঘর ঠিক করিচি......'

চার বছর বয়সী বাচ্চাটি তখন বাসায় নেই, অপুষ্টির শিকার অগ্রিম বুড়িয়ে যাওয়া বউটি ব্যস্ত রাজহাঁসের বাচ্চাগুলোকে খাওয়াতে.....
কখনো ছাপড়ায় ঢুকে এটা-ওটা নিয়ে বাইরে আসছেন.....

ওনারা নদীর পাড়ে থাকেন জীবিকার তাগিদে।

....বর্তমান নিবাস থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে রাজের বাবার জমি আছে এক টুকরা; 
সে জমিরও বেশিরভাগই ঘরের দখলে। অর্থাৎ- চৌহদ্দির বাইরে আর জমি নেই, চাষবাস চলা-ফেরা অন্যের জমিতে। সবকটি ভাই অন্যের জমিতে, বোনরা বিয়ের পরে পরের বাড়িতে, তারাও পরিবারসহ থাকে অপরের জমিতে-গোষ্ঠীশুদ্ধ ভূমি প্রতিবন্ধি। পরিবারের নারী-পুরুষ সবারই উপার্জনের সম্বল কেবল শ্রম, শ্রম আর শ্রম.....

-'আচ্ছা ভাই, ডিসি সাবরে কেমনে দেখা পাতি পারি?'
-ওনারা তো বদলি হন, কখন কোথায় থাকেন বলা কঠিন......
আর কোনো জবাব তাৎক্ষণিকভাবে মনে এলো না।
 
'ক্ষতি হবে না'-এমন বায়বীয় নিশ্চয়তা দিয়ে বিদায় নিলাম রাজের কাছ থেকে।

একটু এগিয়ে আশপাশে পোর্টের বিশাল আয়তনের খালি জায়গা দেখে অবাক হলাম!!
যেকোনো সময়ে রাজদের আশ্রয়ের জায়গাটি নদীর পেটে যেতে পারে। নদী মাত্র কয়েক ফুট দূরেই।
নিজেকেই প্রশ্ন করলাম- 
আচ্ছা, নদীতে ভাঙলে বন্দর কর্তৃপক্ষ নদীর পেট থেকে জায়গাটি কীভাবে উদ্ধার করবেন?
যদি সেটা নাই পারেন তবে রাজদের প্রতি এতো আগ্রাসন কেন?

মংলা বন্দরের কাছে নদীর পাড়ে রাজের অস্থায়ী যে বাসা, তা উচ্ছেদ আতঙ্কে অনিশ্চয়তায় ঠাসা। তবুও জীবন চলছে। তবে অস্থায়ী হলেও এখানে তার বাস কয়েক বছর ধরে.....

নদীটি আধামরা হলেই তাদের পোয়াবারো। ভাটিতে গড়ানো জীবনে ভাটির প্রতিই লক্ষ্য তাঁদের। 

কেননা, ভাটার কালে নদীতে চিংড়ি পোনা শিকার করে জীবন চলে রাজদের!
হাঁটতে হাঁটতে ভাবি.......

পরিচয় পেয়ে রাজ যদি ডিসি সাহেবকে বিনামূল্যে দিতে চান কথা শেখানো শালিকটি;
তবে এ ভূমিহীনের পরিচয় জেনে কোনো বড়সাহেব কি জোগাড় করে দিতে পারেন না
নিশ্চয়তার একটু ভূমিখণ্ড???

রাজদের এতো বড় আত্মা যে দেহে থাকে, সে দেহের জন্য তো অতবড় জায়গা দরকার নেই;
চিৎ হয়ে শুয়ে পা টান করার মতো একখণ্ড জমিই তো যথেষ্ট...........!!!

আবার চিন্তা করি, রাজাকে কি এটি শিখিয়ে দিয়ে যাবো?

ডিসি সাহেবের সঙ্গে রাজের দেখা সেটা মহাভাগ্যের ব্যাপার। তার চেয়ে বরং পাখিটিকে কথা শেখানোর ছলে যদি সে দুঃখের বাণী শেখাতো, তবে হয়তো পরোক্ষভাবে ভূমিহীনতার কথা সাহেবের কানে পৌঁছতো। রাজ পেতে পারতো কিছু নিশ্চয়তা।

আবার নিজেই মন্তব্য করি- না, অতো ছোট নয় রাজের মন-মানসিকতা। রাজাত্মা বলেই সে ব্যক্তিত্বহীন হয় না। নাম তার রাজা, আত্মা তার রাজার মতোই।