SomoyNews.TV

Somoynews.TV icon মহানগর সময়

আপডেট- ০৮-০১-২০১৯ ২২:১৭:০৩

কেন এমন করেন দুদু?

dudu

টেলিভিশনের লাইভ টকশো’তে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় অপরিচিত কোনো ঘটনা নয়। আর এমন অনুষ্ঠানের অতিথি যখন বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, তখন হয়তো এমন ঘটনার সাক্ষী হওয়ার সম্ভাবনা একটু বেশিই। কারণ, এরইমধ্যে একাধিক অনুষ্ঠানে উপস্থাপকের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হওয়া ও উপস্থাপককে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করার ঘটনা তিনি ঘটিয়েছেন। লাইভ অনুষ্ঠান হলেও ওই ঘটনা শুধু অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। অনুষ্ঠান শেষে ওই ঘটনার খণ্ডাংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে চলে গণমাধ্যমকে বিতর্কিত করার চেষ্টাও। গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশ্নের উত্তর দিতে অসমর্থ হওয়া, সত্য লুকাতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়া এবং বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়লেই এমন ঘটনা ঘটান অনুষ্ঠানের অতিথিরা। তবে অনুষ্ঠান শেষে ওই ঘটনার পূর্ণ বিশ্লেষণ দিয়ে ও আগত অতিথিদের জন্য আলোচনার নীতিমালা তৈরি ও তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই এমন ঘটনার উত্তরণ সম্ভব বলে মনে করেন তারা।

সময় টেলিভিশনের নিয়মিত অনুষ্ঠান ‘সম্পাদকীয়’তে ৫ জানুয়ারি অতিথি হিসেবে এসেছিলেন বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা এম এ মান্নান ও জাতীয় পার্টির উপদেষ্টা ব্যারিস্টার শামিম হায়দার। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক হিসেবে ছিলেন সময় টেলিভিশনের জেষ্ঠ্য প্রতিবেদক খান মুহাম্মদ রুমেল। আলোচনার বিষয় ছিল ‘একাদশ সংসদে বিরোধী দল...’। আলোচনার এক পর্যায়ে দুদুর প্রতি কিছু প্রশ্ন রাখেন এম এ মান্নান। নির্বাচনে বিএনপি’র ভরাডুবি নিয়ে এর আগে দলটির মহাসচিব বলেছিলেন, সব ভোট কেড়ে নিয়ে গেলেও তারা (বিএনপি’র কর্মী) কেউ বাধা দিতে পারেননি, কারণ তারা সংখ্যায় অনেক এবং তাদের আবেগ ও উত্তেজনা অনেক হলেও তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা নেই। 

ওই মন্তব্যকে টেনে উপস্থাপক দুদুকে প্রশ্ন করেন, শামসুজ্জামান দুদু আপনার কাছে আসতে চাই। এম এ মান্নান যেটি বলেছেন, তার উত্তর নিশ্চয় আপনি দেবেন। সঙ্গে একটু যোগ করতে চাই, আপনাদের দলের মহাসচিব আজ নোয়াখালীর একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, আমাদের শক্তি আছে, আমাদের আবেগ আছে কিন্তু আমাদের শৃঙ্খলা ছিল না। দলের মহাসচিব নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন। আসলে কি শৃঙ্খলার অভাব, এছাড়া এম এ মান্নান যেটি বলছেন, মাঠে আপনাদের দেখা যায়নি, আপনাদের সুনির্দিষ্ট কোনো গোল ছিল না, প্রধানমন্ত্রী কে হবেন কিংবা একজন ব্যক্তিকে মুক্ত করার জন্য আপনারা নির্বাচনে গিয়েছেন।

এরপর দুদু বলেন, মান্নান সাহেব যেটি বললেন...।

এরপর উপস্থাপক বলেন, আপনাদের মহাসচিবের মন্তব্যটি যদি একটু আলোচনা করতেন।

এরপর দুদু বলেন, মান্নান সাহেব আমার পাশে বসে রয়েছেন। উনি কত সুন্দর সুন্দর কথা বললেন। সেটা আমি বলতে চাচ্ছি, আপনি বাধা দিচ্ছেন। আপনার ট্রেন্ডটাই হচ্ছে যাতে আমি কথাগুলো ঠিকভাবে বলতে না পারি।

এরপর উপস্থাপকের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন তিনি। উপস্থাপক আওয়ামী লীগ করেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। এরপর উপস্থাপকের সঙ্গে ‘রূঢ়’ আচরণ করেন দুদু।

অনুষ্ঠান শেষে ওই আলোচনার প্রথম অংশ, উপস্থাপকের প্রশ্ন এবং তর্কের প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে এডিটেড ভিডিও ছড়িয়ে দেয়া ফেসবুকে। ‘বাংলাদেশের কণ্ঠ’, ‘কালাচাঁন মিয়া’সহ একাধিক ফেসবুক পেজ থেকে ছড়ানো হয় ওই এডিটেড ভিডিও।

তবে এবারই প্রথম নয়, ২০১৭ সালে এশিয়ান টেলিভিশনের ‘টেবিল টক’ নামের এক টকশো’তেও ঘটে এমন ঘটনা। ওই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন বাংলাদেশের একমাত্র যুদ্ধ সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার শিক্ষক আনিস আলমগীর। সেখানে যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ‘ক্ষেপে’ যান দুদু। উপস্থাপক কোনো একটি রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী বলে উল্লেখ করে তার সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ওই অনুষ্ঠানের এডিটেড ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়েছে ‘বিকৃতভাবে’।

দুদু কেন বারবার এমন ঘটনা ঘটান, প্রশ্ন রাখা হয়েছিল গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের কাছে। তাদের মত, মিডিয়া লিটারেসি না থাকা, সত্য বলার সাহসের অভাব, প্রশ্নে বিব্রত হওয়া এবং উপস্থাপককে নিজের মতো করে অন্য রাজনৈতিক দলের মতাদর্শে বিশ্বাসী বলে মনে করা এবং সাইকোলজিক্যাল সমস্যার কারণেই এমন ঘটনা বারবার ঘটছে।

বিষয়টি নিয়ে সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক গোলাম রহমান সময় নিউজকে বলেন, রাজনীতিবিদরা এক একটা মতাদর্শে বিশ্বাসী। সেই মতের পক্ষ হয়ে তারা কথা বলবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে অনেক সময় কিছু অতিথি এমন ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেন যেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রশ্ন সামাল দিতে না পারা, বস্তুনিষ্ঠভাবে কথা বলতে পারার যোগ্যতার অভাব, ব্যক্তিগতভাবে কমফোরটেবল মনে না করার কারণেই এমন ঘটনা ঘটে।

এছাড়া বিরুদ্ধ মত সহ্য করতে না পারার কারণেও অতিথিরা এমন ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক এ শিক্ষক। নিজেদের মত প্রকাশ করতে গিয়ে অতিথিরা বাদানুবাদে জড়ানোর বাইরে অনেক সময় ভুল তথ্য-উপাত্তও উপস্থাপন করেন বলে মন্তব্য করেন সাংবাদিকতা বিষয়ের এ বিশেষজ্ঞ।

অন্যদিকে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান ড. শেখ শফিউল ইসলাম এ বিষয়ে সময় নিউজকে বলেন, টক শো উপস্থাপকের কাজই হলো নানা দিক থেকে প্রশ্ন করা। সঞ্চালক সবদিকের প্রশ্নই করবেন। তবে প্রশ্ন অনেক সময় নিজের মন মতো না হলে দেখা যায় অতিথিরা রেগে যান। এর অন্যতম কারণ হলো তাৎক্ষণিকভাবে সাইকোলজিক্যালি নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা। এছাড়া প্রশ্নের উত্তর দিতে না চাওয়া, প্রশ্ন শুনে বিব্রতবোধ করা এবং উপস্থাপকের প্রশ্নের উত্তর দিলে তিনি পরবর্তীতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন এমন ধারণা থেকেও এই ধরনের ঘটনা ঘটান অতিথিরা।

তিনি আরও বলেন,  অনেক সময় দেখা যায় অতিথি কোনো ভুল তথ্য দিয়েছেন, তখন উপস্থাপক সেটি সংশোধন করে দিলেও অতিথিরা এমন ঘটনা ঘটান।

তবে লাইভ অনুষ্ঠানে অতিথিদের এমন আচরণ ও ওই ঘটনার খণ্ডিত অংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়ার ফলে মূলধারার গণমাধ্যম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন অধ্যাপক গোলাম রহমান।

তিনি বলেন, আংশিক সত্য কখনোই সত্য নয়। আংশিক সত্য অনেক সময় মিথ্যার চাইতেও খারাপ। এই কারণে যেহেতু গণমাধ্যম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাই তাদের উচিত পরবর্তীতে ওই ঘটনার পুরোটা উপস্থাপন করা। গণমাধ্যমের উচিত টকশো’তে যে বিষয়টি নিয়ে বাদানুবাদ হয়ে সেখানকার মূল ঘটনাটি পরবর্তীতে আলাদা করে উপস্থাপনা করা, ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হলে সেটি তুলে ধরা এবং ওই ঘটনার ফলোআপ করা।

এমন ঘটনা নিয়ে পরবর্তীতে আলাদা আলোচনার আয়োজন করা সম্ভব বলেও মত তার।

অন্যদিকে শেখ শফিউল ইসলাম মনে করেন, খণ্ডিত অংশ প্রচার করা কোনোভাবেই মেনে নেয়ার মতো নয়। কারণ খণ্ডিত কিছু কোনোভাবেই মূল ঘটনাকে রিপ্রেজেন্ট করে না। এই ব্যাপারে গণমাধ্যম আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে। এছাড়া ওই খণ্ডিত অংশের বিশ্লেষণও প্রকাশ করা যায়।

অন্যদিকে উপস্থাপক কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে থাকলে এবং উত্তেজিত হয়ে গেলেও অতিথির উচিত সেই বিষয়টিকে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দেয়া এবং উত্তেজিত না হয়ে ঠান্ডা মেজাজে বিষয়টি তুলে ধরা।

টকশো’তে উপস্থাপক এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে বেশিরভাগ সময়ই তা এড়ানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন চ্যানেল আই’র সিনিয়র বার্তা সম্পাদক, টকশো উপস্থাপক ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মীর মাসরুর জামান।

তিনি বলেন, এজন্য অতিথিদের মধ্যে মিডিয়া লিটারেসি বাড়ানো সম্ভব। যারা মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেন তাদের মিডিয়া লিটারেসি বাড়াতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। এছাড়া অনুষ্ঠানে আগত অতিথিকে কিছু নিয়ম-কানুন বলে দেয়া উচিত। অনুষ্ঠানের প্রযোজক আলাদাভাবে অতিথিকে বলে দিতে পারেন, এই বিষয়গুলো বলা যাবে এবং এই বিষয়গুলো বলা যাবে না। এছাড়া কোন ধরনের আচরণ লাইভে করা যাবে না সেটিও বলে দেয়া যেতে পারে।

পুরো বিষয়টি নিয়ে শামসুজ্জামান দুদুর সঙ্গে কথা বলতে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।