SomoyNews.TV

Somoynews.TV icon বিনোদনের সময়

আপডেট- ২২-১১-২০১৮ ১৭:২২:৩০

ভালো থাকিস: পাশাপাশি ভিন্ন আগুনে জ্বলতে থাকা দুজনের গল্প

bhalo-thakis-cover

'জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার-
তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার আমার!' 

-জীবনানন্দ দাশ

দূর নক্ষত্রের যেমন ক্ষয় হয় তেমনি প্রেমকেও ধীরে মুছে যেতে হয়। এমনি এক গল্প নিয়ে নির্মিত ১৪ মিনিটের স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা 'ভালো থাকিস'। 

একটা টেবিলে দুইজন মানব-মানবীর মুখোমুখি বসে থাকা কতটা বিষণ্ণ হতে পারে তার দলিল 'ভালো থাকিস'। এই সিনেমার মূল চরিত্র ইশান ও মীরা। অঞ্জন দত্তের ৪০০ বছরের 'ইট সিমেন্টের জঙ্গল' কলকাতা শহরেরই কোনো গল্প এটি। 

এক ভেজা আলোর ভেতরে পুরনো নোনা দেয়ালে ইশানের লেখা কবিতার লাইন ঝুলতে দেখি আমরা। দেখা যায় মীরার বানানো নৌকাগুলো ঝুলছে বাতাসে। এই ঘরেরই মাঝে একটি টেবিল। 

বাঙালি নারীদের ড্রেসিং টেবিলের কাঁচে লাগানো থাকে টিপ। সেখান থেকেই তারা একটি যুতসই টিপ পড়ে দিন শুরু করেন। এই চিরায়ত দৃশ্যই দেখা যায় 'ভালো থাকিস' এ। মীরাকে আমরা একটি প্রস্তুতির ভেতর দিয়ে যেতে দেখি। এই প্রস্তুতি খুবই সাদামাটা তবু এর আড়ম্বর চোখে পড়ার মতো। মীরার এই অপেক্ষার হেতু প্রকাশ পায় যখন আমরা ইশান চরিত্রে মীর আফসারকে দেখি মুখোমুখি বসতে।

এই বসা যেন দীর্ঘ জনম পরের বসা। দুজনের চেহারাতেই ভেসে উঠেছে কোনো কিছু হারানোর বেদনা ও জড়তা। এই জড়তা কাউকে হারানোর পর স্মৃতির ভার থেকেই যে উৎসারিত তা দর্শক বুঝতে পারেন মীরার চোখের জল আর ইশানের আমতা আমতা ভাব দেখে।

মীরাই এগিয়ে দেন কথোপকথনের সুরকে। বলেন, 'বল কোথা থেকে শুরু করব?' মীরের উত্তরটাও যুতসই। 'আমাদের পক্ষে কি আর শুরু থেকে শুরু করা সম্ভব?' 

এরপরেও সরোদ বেজে উঠে ব্যাকগ্রাউন্ডে। এই সরোদ এর পর থেকে বাকি সিনেমাজুড়েই চলেছে। তাদের দুজনের দেরি হয়ে গেছে। জীবনের যে ট্রেনে একসঙ্গে ওঠার কথা ছিল সে ট্রেন তাদেরকে স্টেশনে রেখে চলে গেছে। তারা এখন ভালোবাসা হারানো নিঃস্ব মানুষ। যাদের কাছে পোড়াধূপের মতো স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। 

কথোপকথনের সূতা ধীরে ধীরে ছড়াতে থাকে ডালপালা। জানা যায়, কোনো এক দূরত্বজাত অভিমান গ্রাস করেছিল ইশানকে। সম্পর্ক একসময় ভার হয়ে উঠেছিল তাদের কাছে। 

কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে মীরার অনুযোগ, আজ আর ঝগড়া করিস না। এরপরই শিউলি ফুল আসে। এই শিউলি ফুলই যেন আরেকটি চরিত্র হয়ে ধরা দেয় দর্শকের মনে। ফুল এখনো ভালো লাগে ইশানের। ইশান বলে, ফুল ভালো লাগে কারণ, ফুলই উপড়ে ফেলার মর্ম বোঝে। অর্থাৎ আমরা বুঝতে পারি উপড়ে ফেলা হয়েছে একজন মানুষকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে। বেঁচে থাকার লড়াইটা তার কাছে আর 'লড়াই' নেই। এটি তার কাছে যে বোঝা বা ভার হয়ে দাঁড়িয়েছে তার দলিল আমরা পাই সিনেমার বাকি অংশে।

২০ বছর আগেকার গল্পে ফিরে যান দুজনই। অতীতচারিতার গহনে একবিন্দু বাধাপ্রাপ্ত হন না কেউই। দুজনকেই এই বৈঠকে 'নরম' দেখায়। 

কোনো এক লেখকের গল্প পড়ে আমরা জানতে পারি স্মৃতি হচ্ছে সাগড়পাড়ে এক বালকের হাতে কুড়িয়ে পাওয়া নুড়ি, অবুঝ বালক যেকোনো পাথরটি তার হাতে তুলে নেবে তা কেউ বলতে পারে না। স্মৃতিও তেমনই। বালকের কুড়ানো নুড়ির মতোই এই দুইজনও ২০ বছরের পুরনো অজস্র স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেছেন যেন। তারা কোন স্মৃতিটি নিয়ে কথা বলবেন তা কেউই জানে না। 

মীরা আর ইশানের নিজেদের কাছ থেকে আর কিছুই দেয়া-নেয়ার নেই। তবু মীরার কাছে কিছু মুহূর্ত চান ইশান। আর মীরা চান একটি কবিতা।

এরপরই সিনেমার মোড় ঘোরে।  কবিতার ভাষায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে টানাপোড়েন। কবিতায় ইশান উল্লেখ করেন ফেলে আসা স্মৃতি নিয়ে তার ঐকান্তিক নস্টালজিয়া। আমরা দেখি নৌকা বাতাসে ঝুলছে কোথা থেকে যেন বেহালার সুর এসে ভিড় করছে ঐ ছোট্ট টেবিলটির কাছে। 

কিন্তু পরমুহূর্তেই বাস্তবতার চপেটাঘাতে নড়েচড়ে বসতে হয় দর্শককে। দুজনই এখন অজানা মানসিক রোগে আক্রান্ত এই ইশারা ঠিকই পাওয়া যায় দুজন নার্সের আগমনে। ঘুমের ওষুধ খাওয়াতে গেলে ইশানের প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদে ফুটে ওঠে জীবন ঠিক কতটা তেতো হয়ে উঠেছে। ওইদিকে মীরার সামনেও আর ইশান নেই। 

দর্শক ধাক্কা খেয়ে বুঝতে পারেন তারা দুজনই আটকা পড়ে গেছেন নিজেদের একাকিত্বের চিরায়ত বৃত্তে। এখানে নিজের জন্য আর কিছুই করার নেই তাদের। তারা যেন দুই বার্নারের কোনো গ্যাসের চুলার মতো ভিন্ন আগুনে নিয়তির টানে জীবনযুদ্ধে পৃথকভাবে জ্বলছেন।