সম্পূর্ণ নিউজ সময়
অন্যান্য সময়
১২ টা ২০ মিঃ, ১২ মে, ২০২১

পৃথিবীর ভেতরের গঠন, টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া এবং ভূমিকম্প

আপনি একটি পুকুরের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ দেখতে পেলেন, পুকুরের পানি নড়তে শুরু করলো। তবে স্রোতময় না, বরং হেলে দুলে এমন একটা অবস্থা। বা, ঘরে চেয়ারে বসে আছেন। টেবিল নড়াচ্ছেন না। কিন্তু তা সত্ত্বেও টেবিলের ওপর রাখা গ্লাসটির পানি কাঁপছে, মাথার উপর ফ্যান নড়ছে, বাসার থাই বা অ্যালুমিনিয়াম গ্লাসটা থর থর করে কাঁপছে, আর আপনার মনে হচ্ছে যেন মাথা ঘুরাচ্ছে। ভূমিকম্প!- বলেই দিলেন ভো-দৌঁড়। হ্যাঁ।
ওয়েব ডেস্ক

এটাই ভূমিকম্প৷ এটি এমনই এক ঘটনা যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে আমরা কেউ কারোর না। কারোর জন্যে অপেক্ষাও করি না। ভূমিকম্প শুরু হলেই দেখা যায়- যে যার যার জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত, পেছন ফিরে তাকানোরও প্রয়োজনবোধ করি না।

যাই হোক, ভূমিকম্প কেন হয়? সহজভাবে, আমরা যা জানি, পৃথিবীর ভূ-অভ্যন্তরের টেকটোনিক প্লেটগুলো অনবরত গতিশীল। এ গতিময়তার মধ্যে যখন কখনও দুই বা ততধীক প্লেটের সাথে ঘর্ষণ হয়, তখন সেখান থেকে উৎপন্ন শক্তি তরঙ্গ আকারে চতুর্দিক ছড়িয়ে পড়ে এবং ফলস্বরুপ মাটি কেঁপে ওঠে- যাকে আমরা ভূ-কম্পন (Earthquake) বলে থাকি। কিন্তু, কী এই টেকটোনিক প্লেট? কী তাদের গতি? কেন তারা গতিশীল? ভূমিকম্প সৃষ্টির পেছনে এদের ভূমিকা ই বা কি?- এসব বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর এই পোষ্টে আশা করি পাওয়া যাবে৷ তবে, তার আগে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে অবশ্যই সুস্পষ্ট ধারণা থাকা চাই। আগে সে সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।

এতে, আমাদের অনেকের মনের আরও অজানা দুটি প্রশ্নের উত্তর পাবো:
১। পৃথিবীর ভেতরে কি আছে? বা,
২। পৃথিবীর ভেতর যেতে থাকলে কি পাওয়া যাবে?

‘পৃথিবী’- নামক গ্রহটি এমন একটি বৃহৎ বিষয় যা নিয়ে লিখতে গেলে হয়তো আনায়াসেই দু' তিনটি ভলিউম বই লিখা হয়ে যাবে। যাই হোক, অল্পকথায় স্পষ্টভাবে জেনে নেয়া যাক। পৃথিবীকে আমরা তুলনা করতে পারি, একটি ফুটবলের সাথে। আমরা রয়েছি পৃথিবীর পৃষ্ঠে, ভেতরে না৷ পৃথিবীতে আমাদের অবস্থানটা ঠিক এমন- আপনি একটি ফুটবলের ওপর কিছু পিঁপড়া ছড়িয়ে দিন। তারা যেভাবে থাকবে, আমরাও ঠিক সেভাবেই রয়েছি পৃথিবীর পৃষ্ঠে। আর, পৃথিবী যেন শূন্যে ভাসমান একটি ফুটবল, যার পৃষ্ঠে লেগে থাকা পিঁপড়াগুলো আমরা। বা অন্য কথায়, একটি ফুটবলের পৃষ্ঠে ময়লা যেভাবে লেগে থাকে, আমরাই সেভাবেই পৃথিবী পৃষ্ঠে লেগে আছি। আর, আপনি নিশ্চয় ঘরের ভেতর থেকে আকাশ দেখতে পাবেন না, যদি না সর্বোচ্চ স্থান- খোলা ছাদে না যান? সেভাবেই, আমরা পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থান, ভূ-পৃষ্ঠের ওপর অবস্থান করছি।

যাই হোক, পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহদের যদি ব্যাবচ্ছেদ করা হয় তবে আমরা তিনটি স্তর পাবো। গঠনের দিক থেকে আমরা পৃথিবীকে তুলনা করতে পারি ক্রিকেট বলের সাথে। আপনি যদি ক্রিকেট বলের ভেতরটা দেখেন, তবে তাতে তিনটি প্রধান অংশ পাবেন। সবার ওপরে চামড়ার আবরণ, তার ভেতরে কর্কের একটি অংশ এবং সবার ভেতরের অংশটি কর্ক-রাবারের একটি ছোট গোল অংশ। ঠিক পৃথিবীর গঠনও হুবহু তেমনই। (অবশ্যই ৩ নং চিত্রটি আগে দেখুন, এরপর ৪ নং) সর্ববহিঃস্থ অংশ ক্রাস্ট, তার ভেতরে গেলে ম্যান্টেল এবং সবার ভেতরের অংশ কোর৷ পৃথিবীর ক্ষেত্রে এ তিনটি স্তরের পরিচিত সংক্ষেপে দেখে নেই:

 

১। ক্রাস্ট (Crust): ক্রাস্টকে আমরা তুলনা করতে পারি, ক্রিকেট বলের বাইরের চামড়ার আবরণের সাথে। এটি খুবই পাতলা একটি অংশ এবং খুবই ভঙ্গুর। এটি পৃথিবীর একটি পাতলা আবরণস্বরুপ, যা অভ্যন্তরভাগকে আবৃত করে রেখেছে। যে কোনো গ্রহ বা বস্তুর পৃষ্ঠের শক্ত অংশকে বলা হয় ক্রাস্ট। পৃথিবীর ক্রাস্টের পুরুত্ব সবজায়গায় সমান না৷ কোথাও কম, তো কোথাও বেশি। এ কমবেশি অনুযায়ী, পুরুত্ব বা গভীরতা ৫ থেকে ৭০ কি.মি পর্যন্ত। মহাদেশীয় অংশের ক্রাস্টের পুরুত্ব বেশি, প্রায় ৩০ -৫০ কি.মি, যা মহাসাগরীয় ক্রাস্টের (মহাসাগরের তলদেশ) তুলনায় হালকা পদার্থ দ্বরা গঠিত।

অপরদিকে, মহাসাগরীয় অংশের ক্রাস্টের পুরুত্ব সে তুলনায় বেশ কম, মাত্র ৫-১০ কি.মি পর্যন্ত, এবং অপেক্ষাকৃত ঘন (মুলত আগ্নেয়িরি উদগীরণে নির্গত শক্ত হওয়া ম্যাগমা দ্বারা) পদার্থ দ্বারা গঠিত। ক্রাস্ট সৃষ্টিকারী শিলাগুলোর বয়সও আবার খুব একটা বেশী না, প্রায় ১০০ মিলিয়ন বছরের পুরনো এবং বর্তমান আমরা যে ক্রাস্ট বা ভূমি দেখছি, হিসাবমতে আজ থেকে তা ২ বিলিয়ন বছর পুর্বে সৃষ্টি হয়েছিলো৷ ক্রাস্টের মোট আয়তন পৃথিবীর মোট আয়তনের ১% এরও কম। গভীরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে ক্রাস্টের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।

২। ম্যান্টেল (Mantle): ক্রাস্টের পর ভেতরে গেলে আমরা পাবো ম্যান্টেল স্তর। এ স্তরটি মূলত সিলিকেট শিলা দ্বারা গঠিত। এর পুরুত্ব প্রায় ২৯০০ কি.মি। এ স্তর পৃথিবীর মোট ভরের প্রায় ৬৭% এবং পৃথিবীর মোট আয়তনের ৮৪% স্থান দখল করে আছে। ক্রাস্টের অপেক্ষাকৃত নিচের অংশ এবং ম্যান্টেলের উপরের অংশ- এই দুই অংশকে একত্রে বলা হয় লিথোস্ফিয়ার। লিথোস্ফিয়ার অংশটি বিশালাকার কিছু পাথরখন্ড দ্বারা গঠিত, যারা খুবই ভঙ্গুর। এই একেকটি পাথরখন্ডকেই বলা হয় টেকটোনিক প্লেট (Techtonic plates)।

অর্থ্যাৎ, আমরা যে টেকটোনিক প্লেটের নাম শুনে থাকি এদের অবস্থান মাটির খুব বেশি একটা গভীরে নয় (অবশ্যই ৫ নং ছবি দেখুন)। এদের অবস্হান ক্রাস্ট ও ম্যান্টেল স্তরের মধ্যবর্তী স্হানে। আবার, লিথোস্ফিয়ারের নিচের অংশ কিছুটা গলিত অবস্হায় রয়েছে। এ স্তরকে বলা হয় আবার অ্যাসথেনোস্ফিয়ার। টেকটোনিক প্লেটগুলোর নিচের অংশ এ স্তরে রয়েছে এবং এখানেই তাদের গতিশীলতা বজায় থাকে৷ ব্যাপারটা এমন, আপনি যখন হাঁটেন তখন আপনার পুরো শরীর গতিশীল থাকলেও নিশ্চয় আপনার পুরো শরীর হাঁটার কাজ করে না, করে শুধু আপনার শরীরের নিচের অংশ- পা। ম্যান্টেল স্তরের তাপমাত্রার ভিন্নতা দেখা যায় বেশ। যেমন- ক্রাস্ট সংলগ্ন অংশের তাপমাত্রা ১০০০°সে., থেকে শুরু করে নিচে যেতে যেতে কোর সংলগ্ন অংশে প্রায় ৩৭০০°সে., পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়।

ম্যান্টেলকে আবার কয়েকটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। আপার ম্যান্টেল, ট্রানজিশন জোন, লোয়ার ম্যান্টেল এবং ডি প্রাইম জোন। আপার ম্যান্টেল হলো ম্যান্টেলের উপরের অংশ- লিথোস্ফিয়ার ও অ্যাসথেনোস্ফিয়ারে বিভক্ত যা উপরে বলা হয়েছে৷ এ জোনের গভীরতা ক্রাস্ট থেকে ৪১০ কি.মি ভূ-অভ্যন্তর পর্যন্ত৷ এরপর ৪১০ থেকে ৬৬০ কি.মি পর্যন্ত রয়েছে ট্রানজিশন জোন। এ স্তরের শিলাগুলো কখনো গলা বা ভেঙ্গে যায় না, এরা খুবই ঘন অবস্থায় রয়েছে। ভূ-পৃষ্ঠে সাগরসমুহে যতো পানি জমা হয়ে রয়েছে এ স্তরে ঠিক সেই পারিমাণ পানি জমা হয়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু তা তরল অবস্থায় নেই। জানামতে, তা বাষ্প, কঠিন এমনকি প্লাজমা অবস্থায় রয়েছে।

এরপর ৬৬০ থেকে ২৭০০ কি.মি গভীর পর্যন্ত রয়েছে লোয়ার ম্যান্টেল। এ অংশ আপার ম্যান্টেল ও ট্রানজিশন জোনের চেয়ে বেশি ঘন ও উত্তপ্ত। আর ডি প্রাইম জোন ম্যান্টেলের সর্বনিম্ম অংশ যা কোরের ঠিক উপরেই, তাকে বেষ্টিত করে অবস্থিত।

৩। কোর (Core): ম্যান্টেলের পর আরো ভেতরে গেলে আমরা পাবো পৃথিবীর কেন্দ্র বা কোর৷ এর গড় ব্যাসার্ধ প্রায় ৩৪৮০ কি.মি। কোরটিকে আবার দুটি অংশে বিভক্ত করা যায়। এর বাইরের দিকটা প্রায় গলিত অবস্থায় রয়েছে৷ এ অংশকে বলা হয় বহিঃস্হ কোর (Outer Core) এবং কেন্দ্রের দিকটা রয়েছে অপেক্ষাকৃত শক্তাবস্হায়। একে বলে অন্তঃস্থ কোর (Inner core)। পৃথিবীর কোর মূলত লোহার, সেই সাথে রয়েছে নিকেলও। এর সর্বত্র একই তাপমাত্রা নেই। কোরের উপর সৃষ্ট বিভিন্ন অংশে চাপের ভিন্নতা, গঠন পদার্থের ভিন্নতা এবং পৃথিবীর ঘূর্ণনের উপর ভিত্তি করে এর ভিন্ন ভিন্ন অংশের তাপমাত্রা ভিন্নমাত্রার হয়ঃ ৪৪০০°সে., থেকে শুরু করে ৬০০০°সে. পর্যন্ত, যা কিনা সূর্যের পৃষ্ঠ তাপমাত্রার চেয়েও বেশি।

কোরটির আকৃতি পৃথিবীর আকৃতির মতোই- গোলাকার। কিন্তু, পৃথিবীর আকৃতি যতোটা বর্তুলাকার, সে তুলনায় কোরটি বেশ গোলাকার। হিসাবমতে, কোরটির ব্যাস পৃথিবীর বিষুবরেখা বরাবর যতো, মেরু অক্ষ বরাবর তার চেয়ে ৩ কি.মি কম। যেখানে পৃথিবীর ব্যাস বিষুবরেখার চেয়ে মেরু অক্ষ বরাবর প্রায় ৪৩ কি.মি কম। পৃথিবীর সাথে এর কোরও ঘূর্ণনশীল৷ তবে তা কিছুটা দ্রুততর। পৃথিবী যখন নিজ অক্ষে এক দিনে একবার ঘুরে, তখন সে ৩৬০° পথ অতিক্রম করে। এভাবে সে ১ বছরে যতো ডিগ্রী ঘুরে, কোরটি সে তুলনায় ২° বেশি ঘুরে।

আজ আর নয়, এর বেশি আর বলা ঠিক হবে না৷ তাহলে, যদি আমরা পৃথিবীর অভ্যন্তরের দিকে যেতে থাকি, তবে কি কি পাবো? বা পৃথিবী পৃষ্ঠের একপাশ থেকে খুঁড়ে আরেকপাশ যেতে থাকলে কি কি পাবো?

- প্রথমে ক্রাস্ট> তারপর ম্যান্টেল> তারপর কোর। এরপর? এরপর একই জিনিস, শুধু বিন্যাস বিপরীত হবে, যেহেতু পৃথিবী গোলাকার। অর্থ্যাৎ, তখন কোর>ম্যান্টেল>ক্রাস্ট>পৃষ্ঠদেশে পৌঁছাবেন। আজকে আপাতত এতোটুকুই। এরপরের পোষ্টে টেকটোনিক প্লেটের গতি ও ভূমিকম্প নিয়ে কথা হবে।

লেখক: মো. শাকিল আহমেদ সাজ্জাদ, বি.এস.সি ইন সিভিল ইন্জিনিয়ারিং, ময়মনসিংহ ইন্জিনিয়ারিং কলেজ।

© ২০২১ সময় টিভি মিডিয়া নেটওয়ার্ক
সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
DMCA.com Protection Status
সময় মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
Somoy Tv App PlayStore Somoy Tv App AppleStore
ফলো সামাজিক সময়