সম্পূর্ণ নিউজ সময়
অন্যান্য সময়
১৪ টা ১ মিঃ, ৯ মে, ২০২১

বাংলাদেশের পাসপোর্টে ১১৫ দেশ ভ্রমণ, খেটেছেন জেল!

হতাশার কারণে আত্মহত্যা করতে চাওয়া কাজী আসমা আজমেরি ভ্রমণ করেছেন ১১৫টি দেশ। বাংলাদেশের পাসপোর্ট দিয়ে ১১৫টি দেশ ভ্রমণ করে তাক লাগিয়েছেন বিশ্বকে। ভ্রমণ করতে গিয়ে জেল খাটতে হয়েছে বেশ কয়েকবার।
অন্যান্য সময় ডেস্ক

বাংলাদেশের পাসপোর্ট দিয়ে তিনি ভ্রমণ করতে চান পুরো বিশ্ব। প্রতিটি দেশে রেখে আসতে চান বাংলাদেশের পদচারণা।

আজমেরি জানান, ঘাড়ের চিকিৎসার জন্য ভারতে আসি ৭ মার্চ, এরপর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হই ১১ এপ্রিল,  করোনার বিপর্যস্ত সময়ে ভারত যখন রূপ নিয়েছে মৃত্যুপুরীতে চিকিৎসা নিতে এসে তখন আটকে আছি ভারতের গোয়ায়।

আজমেরি বলেন, বিচ্ছিন্ন ঘটানাকে কেন্দ্র করে একটা সময় আমি আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলাম, এরপর ভ্রমণই আমাকে সুন্দর জীবন দিয়েছে। ডিপ্রেশনে ভুগলে আত্মহত্যার মতো পথে না হেঁটে; ভ্রমণের পথে হাঁটা উচিত, মানুষ জীবনকে উপভোগ করতে পারবে।

২০১০ সালে ভিয়েতনামে ভ্রমণ করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হন তিনি। ইমিগ্রেশনের যাওয়ার পর তাকে রিটার্ন টিকেট দেওয়া হয়নি বরং বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখার পর ভিয়েতনামের ইমিগ্রেশনের জেলে ২৩ ঘণ্টা বন্দী করে রাখা হয় তাকে। সেই আক্ষেপ থেকেই তিনি বিশ্বের সব দেশ ভ্রমণের চিন্তা করেন, বাংলাদেশের পাসপোর্ট দিয়েই।

তিনি বলেন, আমার কাছে বাংলাদেশের পাসপোর্ট থাকার কারণে জেল খাটতে হয়েছে, তখন ভাবি আমাকে এমন কিছু করতে হবে যেন দেশের বাইরের মানুষ বাংলাদেশের পাসপোর্টকে সম্মানের চোখে দেখে, আমার মতো ভ্রমণে গেলে কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়। বাংলাদেশিরা শুধু শ্রমিক হিসেবেই বিভিন্ন দেশে যায় না, ভ্রমণ করতেও যায়, বিশ্বের দরবারে এই ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে নিজে ভ্রমণ করেন এবং নিয়মিত ভ্রমণের উৎসাহ দেন তরুণ প্রজন্মকে। ভ্রমণের জন্য বেশি অর্থ কারও না থাকলে স্বল্প খরচে ভারত ভ্রমণের পরার্মশ তার।

আজমেরি বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমি খুব দুরন্ত ছিলাম, ঘুরে বেড়নোর ইচ্ছে ছিল প্রবল, ছোটবেলার সেই ইচ্ছে আকাঙ্খা থেকেই বিশ্ব ঘুরে দেখার ইচ্ছেটা জাগে, প্রথমে গিয়েছিলাম থাইল্যান্ডে, নীল সমুদ্র দেখার পর আমার মনে হয়েছিল ভ্রমণের জন্য যত টাকা খরচ হয়েছে এই সমুদ্র দেখার পর সব ওঠে গেছে, এক কথায় থাইল্যান্ডের সৌন্দের্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম। এরপর নেপালে যাই, হিমালয় দেখার পর পুরো বিশ্বের সৌন্দর্য আমাকে টানতে থাকে, তখন থেকে আমি পৃথিবীর নানা দেশে যাওয়ার ভিসা সংগ্রহের লক্ষ্যে নামি। আমি যেই দেশে গিয়েছি বাংলাদেশি যারা ছিল তারা আমাকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা করেছেন, অনেক দেশের মানুষ আামাকে ভারতের নাগরিক ভাবতেন তাদের সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতাম আমি ভারতের নয়, লাল সবুজের পতাকাওয়ালা বাংলাদেশি।

ভ্রমণের টাকা কিভাবে জোগান? প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি আমি চাকরি করতাম আর টাকা জমাতাম সেই টাকা দিয়েই আমি ভ্রমণ করি, পড়াশোনা শেষ হলে আমি এক দেড় বছর চাকরি করি আর ৬ মাস ভ্রমণ করি।

আজমেরি জানান, নারী হিসেবে তাকে কতটা বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে, সমাজে শুনতে হয়েছে নানান ধারণের কথা। তিনি বলেন, আমার আত্মীয়রা আমাকে নিয়ে কানাঘুষা করত, যেসব আত্মীয়রা আমাকে নিয়ে বিভিন্ন কথা বলত আমিও তাদের এরিয়ে চলতাম, অনেকে ফোন করে বলত দেশের বাইরে আমি কোথায় থাকছি তখন হোটেলে থাকার কথা জানাতাম, তারা সমলোচনা করত, আমার পরিবারের কাছে বলত হোটেলে ভালো মানুষ থাকে না, মেয়ে খারাপ হয়ে গেছে।    

প্রায় একযুগের মতো সময় ধরে তিনি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, প্রকৃতি, দেশের মানুষ সম্পর্কে জানাচ্ছেন। ১১৫তম দেশ গ্রিসে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে করোনা পরিস্থিতির মধ্যে তিনি দেশে ফিরেন, করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) কারণে তিনি ভ্রমণে বের হতে পারেননি। করোনার কারণে নতুন কোনো দেশে যাওয়ার সুযোগ না পাওয়ায় আপতত আগের ঘুরে দেখা দেশগুলোই ভ্রমণ করছেন বলে জানান তিনি। তার ভ্রমণের সংগৃহীত সামগ্রী দিয়ে লাইব্রেরি, জাদুঘর, ল্যাংগুয়েজ ক্লাব চালু করেছেন তার বাড়িতে। যার নির্মাণে এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১৪ লাখ টাকা। দেশ ভ্রমণের মাধ্যমে মানুষের মাঝে ইতিবাচক মনোভাব মানবিক মূল্যবোধ ও দেশ পরিচিতি বৃদ্ধি হয় বলে জানান আজমেরি।

তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইন, নিয়ম নীতি নৈতিকতা জানা ও শেখা যায়, ভ্রমণ করলে নিজের মধ্যে থেকে হিংসা বিদ্বেষ চলে যাবে, যারা ভ্রমণ করে তারা উদার মনের হয়, নিজের মধ্যে দক্ষতা তৈরি হয় ভ্রমণের মাধ্যমেই। তরুণ প্রজন্ম হতাশায় ভোগে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নেয়, ভ্রমণ কী সেই পথ ভুলিয়ে দিতে পারবে? প্রশ্ন করলে কাজী আসমা আজমেরি বলেন, একটা সময় আমিও আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলাম এরপর ভ্রমণই আমাকে সুন্দর জীবন দিয়েছে। যারা আত্মহত্যার মতো পথে হাঁটার চিন্তা করে তাদের একবার ভ্রমণের পথে হাটা উচিত, জীবনকে উপভোগ করতে পারবে। আমার মনে হয়েছে আমি যেখানে বসবাস করছি তারাই আমাকে পছন্দ করছে না, কিন্তু বাইরের মানুষ তো আমাকে অসম্ভব রকম ভালোবাসছে, তাহলে আমি কেন আত্মহত্যা করবো!। বিশ্ব অনেক বড়, জীবনে অনেক কিছু দেখার আছে, দেখানোর আছে, শেখার আছে এবং শেখানো আছে, আত্মহত্যা পথে গিয়ে সুন্দর জীবন নষ্ট না করে বিশ্ব ঘুরে জীবনকে উপভোগ করার পরামর্শ আজমেরির।

লেখক: মোশারফ হোসাইন, প্রেস অ্যান্ড মিডিয়া প্রধান, ১৪ তম  আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব ২০২১, চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটি বাংলাদেশ।

© ২০২১ সময় টিভি মিডিয়া নেটওয়ার্ক
সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
DMCA.com Protection Status
সময় মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
Somoy Tv App PlayStore Somoy Tv App AppleStore
ফলো সামাজিক সময়