সম্পূর্ণ নিউজ সময়
মহানগর সময়
১৬ টা ৩ মিঃ, ৭ মে, ২০২১

জরিমানার টাকা তুলতেই ৩-৪ গুণ বেশি ভাড়া আদায়!

রাইয়ান বিন আমিন
মহামারি করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে হঠাৎ করেই বাড়তে থাকে আক্রান্ত-মৃত্যুর সংখ্যা। এরপরই প্রকোপ ঠেকাতে প্রথমে আসে কঠোর বিধিনিষেধের আদেশ। এরপর লকডাউন। বন্ধ করে দেওয়া হয় গণপরিবহন। ২২ দিন বন্ধ থাকার পর ৬ মে থেকে সারা দেশে চালু হয়েছে গণপরিবহন। তবে, দেওয়া হয়েছে বেশকিছু শর্ত।
 
এরমধ্যে অন্যতম জেলার গাড়িগুলো জেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং অর্ধেক আসন খালি রেখে নতুন সমন্বয়কৃত ভাড়ায় (৬০ শতাংশ বৃদ্ধি) চলতে হবে। কিন্তু রাজধানীতে প্রবেশ ও বের হওয়ার অন্যতম পথ আমিনবাজারে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। অর্ধেক আসন খালি তো দূরের কথা, সব সিট পূর্ণ করে দাঁড়িয়েও যাত্রী বহন করছে বাসগুলো। আর ভাড়া নিচ্ছে তিন থেকে চারগুণ। 
 
বৃহস্পতিবার থেকেই পরিবহন সংশ্লিষ্টদের চলছে এমন স্বেচ্ছাচারিতা। এতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন যাত্রীরা। প্রতিবাদ করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। বিকল্প যান হিসেবে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশাও ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এমন অনিয়ম ঠেকাতে পুলিশকে তেমন কোনো ভূমিকা নিতে দেখা যায় নি।
 
পরিবহন শ্রমিকদের দাবি, রাস্তায় রাস্তায় পুলিশকে ‘টাকা’ দিতে হয়। আবার জরিমানাও হয়, সব মিলে তাদের বেশি ভাড়া নিতে হয়। 
 
শুক্রবার (০৭ মে) বিকেলে সরেজমিনে আমিনবাজার ঘুরে এমন সব অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে। 
 
সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী রাজধানী থেকে কোন বাসই গাবতলী পার হতে দিচ্ছে না পুলিশ। একইভাবে সাভারের দিকে থেকে আসা কোনো বাসকেই আমিনবাজারের চিশতিয়া ফিলিং স্টেশন পার হতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে যারা ঢাকা থেকে বের হচ্ছেন তাদের আমিনবাজার ব্রিজ পার হয়ে অপর পাশে থাকা বাসে উঠতে হচ্ছে। ব্রিজ পার হতেই দেখা যায় ট্রাক স্ট্যান্ড সংলগ্ন বেশ কিছু বাস সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাত্রী ডাকছে।
 
আমিনবাজার থেকে পাটুরিয়া ঘাট, চন্দ্রা ও সাভার-নবীনগর- এই তিন রুটে ভাগ হয়ে বাসগুলো সেখান থেকে ছেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু অর্ধেক আসন খালি রেখে নতুন সমন্বয়কৃত ভাড়ায় (৬০ শতাংশ বৃদ্ধি) চলার নিয়ম কেউ মানছেন না। সব সিট পূর্ণ করে দাঁড়িয়েও যাত্রী নিয়ে আমিনবাজার ছাড়ছে বাসগুলো। আর ভাড়া নিচ্ছে তিন থেকে চারগুণ।
 
আমিনবাজার থেকে সাভারের সাধারণ সময়ের ভাড়া ২০ টাকা। ৬০ শতাংশ বৃদ্ধিতে ভাড়া দাঁড়ায় ৩২ টাকা। কিন্তু বাস পূর্ণ করেও ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা। পাটুরিয়া ঘাটের ভাড়া বাস ভেদে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। ৬০ শতাংশ বৃদ্ধিতে ভাড়া দাঁড়ায় ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। অথচ ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৩০০ টাকা। চন্দ্রার ভাড়া ৫০ টাকা হলেও সেই ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১০০ টাকা। 
 
এত বেশি ভাড়া নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে মৌমিতা বাসের এক হেলপার জানান, ‘আগে সারাদিনে চার থেকে পাঁচ ট্রিপ দিতাম। এখন দুই ট্রিপও ঠিকমতো হয় না।’ তিনি বলেন, ‘১২ টার সময় সিরিয়ালে লাগাইছি, মাত্র (বিকেল ৫ টা) ট্রিপের সিরিয়াল পাইলাম। এই ট্রিপ গেলে মাত্র দুই ট্রিপ হইব। তারমধ্যে রাস্তায় জরিমানা হয়, আগের চাইতে বেশি ট্যাকা দিতে হয়। তাইলে আমরা কেমনে চলমু’।
 
তার সাথে কথা বলা অবস্থায়ই সেখানে পুলিশের এক সদস্য আসেন। তিনি এসে ওই বাসে উঠে আবার নেমে পড়েন। ততক্ষণে ওই বাসের প্রায় অনেকটাই পূর্ণ হয়ে গেছে যাত্রীতে। সবাই দুই সিটে দুইজন করেই বসে ছিলেন। কিন্তু তিনি সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে ওই বাসের চালক ও হেলপারের সাথে কথা বলেন। এরপর প্রায় পাঁচ মিনিটের মতো ওইদিক দিয়ে ঘোরাঘুরি করে পরে ডিভাইডার পার হয়ে অন্য একটি বাসে উঠে চলে যান।
 
ওই বাসের ঠিক পেছনেই লাগানো মৌমিতার অপর বাসের সুপারভাইজারকে বেশি ভাড়ার কথা জিজ্ঞাসা করতেই, ‘৫০০ ট্যাকা দিয়া গাড়ি এই জায়গায় রাখুন লাগে, ওইডাতো আপনে বুঝবেন না। খালি ওই জায়গা (চিশতিয়া ফিলিং স্টেশন এর সামনে) দিয়া ঢুইকা রং সাইডে এনে আমু, ৫০০ ট্যাকা দিওন লাগে। ফাও কতা কইলে লাভ আছে ভাই।’
 
টাকা কে নেয় জানতে চাইলে বলেন, ‘পুলিশে নেয়। এহন ১০ টাকা আপনেগো থিকা বেশি না নিলে কেমনে হইব।’
 
একটু সামনে এগিয়ে দেখা গেল ইতিহাস পরিবহনের হেলপার সাভার যাওয়ার জন্য যাত্রী ডাকছে। সেখানে কথা হয় তার সাথে। তিনি অনেকটা হতাশা নিয়ে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার (৬ মে) সাভার থানাস্ট্যান্ড এ ১০ হাজার টাকার মামলা খেয়েছেন। ভাড়া বেশি নিয়েও ওই মামলার টাকা এখনও তুলতে পারেন নি।’ 
 
শুধু বাসই না। প্রাইভেটকার থেকে শুরু করে অটোরিকশা পর্যন্ত তিন থেকে চার গুণ ভাড়া বাড়িয়ে গন্তেব্যে যাচ্ছে। আমিনবাজার থেকে পাটুরিয়া ঘাট পর্যন্ত প্রাইভেটকার জন প্রতি ভাড়া নিচ্ছে ৪০০ টাকা। আর অটোরিকশাগুলো সাভার পর্যন্ত ভাড়া নিচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা।
 
সার্বিক বিষয়ে জানতে ঢাকা জেলা উত্তরের ট্রাফিক পুলিশের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি দেখবেন বলে জানান। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তিনি বলেন, ‘আমাদের পক্ষে সব সময় ওই বিষয়গুলো দেখা সম্ভব হয় না। স্বাস্থ্যবিধি বা অতিরিক্ত ভাড়ার বিষয়টি গাড়ি থামিয়ে দেখতে গেলে তখন পেছনে জ্যামের সৃষ্টি হয়। আবার পর্যপ্ত লোকবলেরও অভাব আছে। তবে কেউ যদি অভিযোগ করে তাহলে আমরা তাদের জরিমানা করি। আপনি এখন বিষয়টি জানালেন আমি আবার গুরুত্ব দিয়ে দেখব।’
 
আর বাস থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাসের স্টাফদের সুবিধার্তেই আমরা আমিনবাজার ব্রিজের ওইখানে যেতে দেই। কারণ, গাবতলি থেকে যাত্রীদের হেঁটে চিশতিয়া পাম্প পর্যন্ত আসতে অনেক কষ্ট হবে। তাই তারা আমাদের অনুরোধ করে যে গাড়ি যেন ব্রিজের কাছে যেতে দেই। আমরাও যাত্রীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে তাদের যেতে দেই। তারা যে অভিযোগ করেছে, তারা কি সেটা প্রমাণ করতে পারবে? তারা কাকে টাকা দিছে এটা কি তারা বলতে পারবে? এখন উল্টো পরিবহন স্টাফরা আমাদের দোষারোপ করছে।’  
© ২০২১ সময় টিভি মিডিয়া নেটওয়ার্ক
সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
DMCA.com Protection Status
সময় মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
Somoy Tv App PlayStore Somoy Tv App AppleStore
ফলো সামাজিক সময়