সম্পূর্ণ নিউজ সময়
বিনোদনের সময়
৯ টা ৪২ মিঃ, ৬ মে, ২০২১

ওয়াল্ট ডিজনি: খবরের কাগজ বিক্রেতা থেকে কালজয়ী অ্যানিমেশনের রূপকার

মিকি মাউসের নাম শোনেনি এমন মানুষের খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। আর মিকি মাউস বা ডোনাল্ড ডাকের নাম আসা মানেই তো ওয়াল্ট ডিজনি। আর এই নামটা শুনলেও কেমন এক কথায় চোখের সামনে ভেসে উঠবে ছটফটে দুটো প্রাণির মুখ, যারা সারাদিন নিজেদের মধ্যে খুনসুটি লড়াই করে আমাদের আনন্দ দিয়ে চলেছে। কিন্ত নির্ভেজাল আনন্দের পেছনে লুকিয়ে আছে দাঁতে দাঁত চাপা এক জেদ আর জীবন সংগ্রামের গল্প। সেই গল্প মিকি মাউসের স্রষ্টা ওয়াল্ট ডিজনির জীবনের। 
ফাতেমা এ্যানি

১৯০১ সালের ডিসেম্বর মাসে এলিয়াস ডিজনি আর ফ্লোরা ডিজনির অভাবের সংসারে শিকাগোতে জন্ম নিল তাদের চতুর্থ সন্তান। ছেলের নাম রাখা হলো ওয়াল্টার এলিয়াস। শিকাগোয় তখন অপরাধ জগতের রমরমা, খুন, রাহাজানি, টুকটাক অসামাজিক কাজকর্ম লেগেই আছে। তাই বাবা এলিয়াস ডিজনি তার পরিবার নিয়ে পাড়ি জমান মিসৌরিতে। জমানো টাকা দিয়ে নতুন শহরে এসেই একটি ফার্ম কিনে ফেলেন তিনি। কাঠমিস্ত্রির পেশা ছেড়ে শুরু হয় চাষবাস।

রাগী বাবা চাইতেন তার ছেলেমেয়েরা অনুশাসনের মধ্যে বড় হয়ে উঠুক। গরীব পরিবার, বেশি কর্মচারী রাখার সামর্থ্য কই! তাই পাঁচ ছেলেমেয়েকে স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়ির কাজে হাত লাগাতে হতো। বাবার ফার্মে কাজ করতে গিয়েই নানারকম পশুপাখিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান ডিজনি। মনে করা হয়, শৈশবের সেই পর্যবেক্ষণই ভবিষ্যৎ জীবনে তার কার্টুন তৈরির কাজে অনেকখানি সহায়ক হয়েছিল।

সেসময় ওয়াল্ট’র আর তার দু’বছরের ছোট বোন খামারে ইদুঁরের ছোটাছুটি দেখে খুব মজা পেত আর চেষ্টা করল আঁকার খাতায় সেইসব মুহূর্তকে জীবন্ত করে তোলার। ছবি আঁকতে বরাবরই ভালোবাসতেন ডিজনি। কমবয়সে মিসৌরিতে থাকাকালীন অনেকেরই পছন্দ ছিল তার আঁকা ছবি। গ্রামে ছোটখাটো কোনো অনুষ্ঠান হলে ঘর সাজানোর জন্য ওয়াল্টের কাছ থেকে ছবি চেয়ে নিয়ে যেতেন গ্রামবাসী। বিনিময়ে মিলত, রঙ পেন্সিল বা মিষ্টি চকলেট।

ওয়াল্টের বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় কিছুদিন পরই ফার্ম বিক্রি করে সপরিবারে কানসাস চলে আসেন তারা। টাকা-পয়সার চরম অভাব তখন। কানসাসে এসে তাই আর ফার্ম নয়, খবরের কাগজ বিক্রির ব্যবসা শুরু করলেন এলিয়াস ডিজনি। সেই কাগজ ফেরি করার দায়িত্ব এসে পড়ল স্কুলপড়ুয়া ছেলের কাঁধে। ভোর হতে না হতেই কাগজের বাণ্ডিল নিয়ে ছোট্ট ডিজনি ছুটতেন এ পাড়া থেকে ও পাড়া। পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে কখনও কখনও ঘুমিয়ে পড়তেন ক্লাসে। তবু এতকিছুর মধ্যেও আঁকার প্রতি ভালবাসা কমেনি তার। 

পড়াশুনায় মনোযোগ না থাকলেও মিস করতেন না স্কুলের ছবি আঁকার ক্লাসগুলো। স্কেচ করতে তো ভালোবাসতেনই, পাশাপাশি ভালোবাসতেন ছোট্ট রেলস্টেশনে চুপচাপ বসে ট্রেনের যাওয়া-আসা দেখতে। কমেডি-শো আর সেলুলয়েডের ছবির প্রেমে পড়াও সেই অল্পবয়সেই।

খবরের কাগজের ব্যবসাতেও সুবিধা করতে না পেরে এলিয়াস সপরিবারে আবার ফিরে এলেন শিকাগোতে। পার্টনারশিপে শুরু করলেন জেলি ফ্যাক্টরির ব্যবসা। পরিবারের নিয়মকানুনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে বড় দুই ভাই ততদিনে অন্যত্র উঠে গেছেন। শিকাগোতে এসে ১৬ বছরের কিশোর ওয়াল্টকে ভর্তি করা হলো হাইস্কুলে। আঁকার হাত তো বরাবরই ভালো ছিল, তাই খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের দক্ষতায় হয়ে উঠলেন স্কুল ম্যাগাজিনের জুনিয়র আর্ট এডিটর। কিন্তু সংসারের অভাব মিটছিল না। টাকা রোজগারের তাগিদে এ সময় ছোটোখাটো কতরকম কাজ যে করতে হয়েছে তাকে! মাঝখান থেকে নষ্ট হল হাইস্কুলের পড়াশোনা। স্কুল ছাড়তে হয় তাকে, ইতি ঘটে পড়াশোনায়।

এরপরে অনেক চরাই-উতরাই পার করে ক্যানসাসেই সিটি ফিল্ম অ্যাড কোম্পানিতে যোগ দিলেন কার্টুনিস্ট হিসেবে। কাজ চলাকালীন কোথা থেকে যোগাড় করলেন পুরনো একটা ক্যামেরা, আঁকা ছবিগুলো তাতে জুড়ে সেই প্রথম শুরু হল এনিমেশনের কাজ। নাম দিলেন দিলেন ‘লাফ-ও-গ্রাম'। পরে ওই নামে কোম্পানিও খোলেন। ১৯২৮ সালে তৈরি করলেন ৮ মিনিটের একটা সাদাকালো ছবি। মিকি মাউস, মিনি মাউস ও মিকির শত্রু-চরিত্র ‘পিট'কে নিয়ে তৈরি সেই ছবিই পালাবদল নিয়ে এল কার্টুন ছবির ইতিহাসে। সেই যে ছোটোবেলায় খামারে বসে স্কেচ করতেন জন্তুজানোয়ারের, ঘুরে ঘুরে দেখতেন ইঁদুরদের দৌড়োদৌড়ি, সেই স্মৃতি থেকেই উঠে এল অ্যানিমেশনের বিখ্যাত চরিত্র মিকি মাউস।

শোনা যায়, মিকি মাউস নামটা না-কি ডিজনির নিজের দেওয়া নয়। বউয়ের ইচ্ছে অনুসারে ইঁদুর হিরোর পুরোনো নাম বদলে রাখা হয় মিকি। ব্যাস, আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি ওয়াল্ট ডিজনিকে। ১৯৩২ সাল নাগাদ তৈরি হলো তার প্রথম রঙিন কার্টুন ছবি ‘ফ্লাওয়ার্স অ্যান্ড ট্রিস'। এ কার্টুনটি ওয়াল্ট ডিজনির জীবনে নিয়ে এল প্রথম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড। ‘দ্য ব্যান্ড কনসার্ট’ ছবিতে মিকিকেও দেখা গেল রঙিন চেহারায়। ১৯৩৭ এ স্নো হোয়াইটকে নিয়ে তৈরি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবিটি চূড়ান্ত হিট করে বক্স অফিসে। সেসময় সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে ৪১৬ মার্কিন ডলারের ব্যবসা করেছিল। 

সুস্থ একটা ছেলেবেলা পাননি, ছিন্নমূলের মতো ভেসে বেরিয়েছেন এ শহর থেকে ও শহর। বারবার হেরে গেছেন জীবনযুদ্ধে। কিন্তু নিজেকে ফেলিওর ভাবতে রাজি ছিলেন না ওয়াল্ট ডিজনি। দাঁতে দাঁত চেপে লড়েছেন প্রতিকূল ভাগ্যের সঙ্গে, অনটনের সঙ্গে। আঁকতে ভালোবাসতেন, সেই প্রেম নিয়েই আজীবন ঘর করেছেন। আর সেই জেদ আর ভালোবাসাই একদিন তাকে এনে দিয়েছে বিশ্বজোড়া স্বীকৃতি, পুরস্কার।

ডিজনিল্যান্ড প্রতিষ্ঠার বছর দশেকের মধ্যেই মারা যান স্যার ওয়াল্ট ডিজনি। কিন্তু ততদিনে অ্যানিমেশন বিশ্বের ভোল পাল্টে দিয়েছেন তিনি। ক্ষণজন্মা এই শিল্পী আজও অ্যানিমেশন জগতের মুকুটহীন বাদশা।

© ২০২১ সময় টিভি মিডিয়া নেটওয়ার্ক
সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
DMCA.com Protection Status
সময় মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
Somoy Tv App PlayStore Somoy Tv App AppleStore
ফলো সামাজিক সময়