সম্পূর্ণ নিউজ সময়
বাণিজ্য সময়
১৪ টা ৪৪ মিঃ, ২৯ এপ্রিল, ২০২১

পুরান ঢাকার আরমানিটোলার অগ্নিকাণ্ড ‘দুর্ঘটনা নয়’

পুরান ঢাকাসহ দেশের সব স্থানে অনুমোদনহীন ও বেআইনিভাবে গড়ে ওঠা রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা স্থাপনকারীদের আইনের আওতায় এনে মানুষের জীবন রক্ষার্থে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
ঈষিতা ব্রহ্ম

একইসাথে ঢাকা সাবওয়ে নির্মাণের মতো মেগা প্রকল্প শুরুর আগে রাজধানী ঢাকা ও বাংলাদেশের পরিকল্পনাগত ও আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা আর বিভিন্ন বিকল্পকে মাথায় রেখে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। বৈশ্বিক করোনা মহামারির শিক্ষা কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন দর্শন ও পরিকল্পনায় প্রথাগত অবকাঠামোগত উন্নয়ন ধারণাকে প্রাধান্য না দিয়ে সামাজিক সুবিধা, স্বাস্থ্য, শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানো উচিত এবং সব নাগরিককে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসা উচিত। 

বৃহস্পতিবার (২৯ এপ্রিল) অনলাইনে আয়োজিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বি.আই.পি.) এর “সমসাময়িক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গ” নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিআইপি'র পক্ষ থেকে এসব মতামত তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স এর সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

বিআইপির পক্ষ থেকে বলা হয়, পুরান ঢাকার আরমানিটোলার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাকে দুর্ঘটনা নয়, বরং ব্যবসায়ী, বাড়ির মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের অতি মুনাফা লাভের প্রবণতা এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার সম্মিলিত দায়ের ফলাফল। পুরান ঢাকা বোমার ওপর বাস করছে, এটা জানার পরও মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সংস্থার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে প্রভাবশালী মহল ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার যে দায় আছে, তা উপেক্ষা করে জনস্বার্থ ও মানুষের জান-মাল রক্ষায় সরকার কঠোর পদক্ষেপ না নিলে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতেই থাকবে।

বিআইপির সাধারণ সম্পাদক বলেন, পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদাম ও কারখানাগুলোর অধিকাংশই ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও আদর্শগত মান অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি এবং অনুমোদনহীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

ড. আদিল বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় কেমিক্যাল শিল্প পার্ক বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ। অন্তর্বর্তীকালীন সমাধান হিসেবে পুরান ঢাকায় যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা রাসায়নিক গুদামগুলোকে শৃঙ্খলায় আনার জন্য পাঁচটি প্রস্তাবনা দেয়া হয় বি.আই.পি.'র পক্ষ থেকে।

প্রস্তাবনাগুলো হলো-
১. অতিরিক্ত বিপজ্জনক রাসায়নিক গুদামগুলোকে দেরি না করে সরকারি-বেসরকারি শিল্প এলাকায় স্থানান্তর করার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। 

২.  তুলনামূলক কম বিপজ্জনক রাসায়নিক গুদামকে পুরান ঢাকার সুনির্দিষ্ট কিছু ভবনের মধ্যে স্থানান্তর করে ঝুঁকি কমানো যায় কিনা সে ব্যাপারেও পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। 

৩. আবাসিক ভবনে মিশ্র ব্যবহারের নামে রাসায়নিক গুদাম বা কারখানা কোনোভাবেই অনুমোদন দেয়া যাবে না এবং দেরি না করে আবাসিক ভবন থেকে সব রাসায়নিক গুদাম বা কারখানা সরাতে হবে। 

৪. রাসায়নিক উপাদান উৎপাদন, বিপণন, বিক্রি ও গুদামজাত করার বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।  

৫. পুরান ঢাকার বাইরে টঙ্গী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম এসব শিল্প এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে রাসায়নিক গুদাম আছে, সেগুলোকে নজরদারির আওতায় এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

ঢাকার সাবওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ সম্পর্কে বি.আই.পি.'র পক্ষ থেকে বলা হয়, সেতু কর্তৃপক্ষের সাবওয়ে সংক্রান্ত সমীক্ষা প্রকল্প প্রধানত কারিগরি সমীক্ষা। এই ধরনের সাবওয়ে প্রকল্পের কোন দিক নির্দেশনা বর্তমান কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা, আরএসটিপি বা ঢাকা শহরের মহাপরিকল্পনা, বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় নেই। পরিবহন বিষয়ক অবকাঠামোগত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চতর পরিকল্পনা প্রস্তাবনা অনুসরণ না করে বিচ্ছিন্নভাবে ও পর্যাপ্ত পরিকল্পনাগত বিশ্লেষণ না করেই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারা আছে।

অধ্যাপক আদিল বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নগর পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাবওয়ে প্রধানত উচ্চ আয়ের দেশগুলোর সীমিত সংখ্যক কিছু শহরে নির্মিত হলেও সাবওয়ে নির্মাণ অনেক ব্যয়বহুল প্রকল্প। বিশ্বের অতি ধনী দেশগুলোও এখন নতুন করে নগরের বিস্তৃত নেটওয়ার্কজুড়ে সাবওয়ে নির্মাণের মত উচ্চাভিলাষী প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে অনেক সাবধানী।  সেখানে বাংলাদেশ যদিও মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হবার যাত্রাপথে আছে, দেশের মাথাপিছু আয় উন্নত দেশের তুলনায় এখনও অল্প। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় যেখানে প্রায় ২ হাজার ডলার, সেখানে আমেরিকার ৭০ হাজার (বাংলাদেশের ৩৫ গুণ), সিঙ্গাপুরের ৬৫ হাজার (৩৩ গুণ), জার্মানির ৫০ হাজার (২৫ গুণ), ইংল্যান্ড ৪৫ হাজার (২৩ গুণ), জাপান ৪০ হাজার ডলার ( ২০ গুণ)। তাই সাবওয়ে নির্মাণের মত অর্থনৈতিক শক্তি এ দেশের নেই বললেই চলে।

সাধারণত এক কিলোমিটার সাবওয়ে লাইন নির্মাণে অন্তত ৩০০ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে নির্মিত সিঙ্গাপুর, হংকংয়ের মতো দেশ ও প্রশাসনিক অঞ্চলগুলোতে পাতাল রেলের নির্মাণ ব্যয় আরো বেশি। সিঙ্গাপুরের ডাউনটাউন এমআরটি লাইন (পুরোটাই পাতালপথে) নির্মাণে কিলোমিটার প্রতি খরচ হয়েছে ৪৯৩ মিলিয়ন ডলার।

প্রতি কি.মি. সাবওয়ে নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ফুকোকা শহরে ৩২১ মিলিয়ন ডলার, কায়রো ৩১০, স্টকহোম ২৫৯, সাও পাওলো ২২৩ মিলিয়ন ডলার। সাবওয়ে নির্মাণে প্রতি কি.মি. এ খরচ হয়েছে আমেরিকাতে ৫০০ মিলিয়ন ডলয়ার, ইংল্যান্ড ৪৫০, নেদারল্যান্ডস ৪১০ (রান ওভার বাজেট ২ গুণের অধিক;; বার্সেলোনা ১৭০ (রান ওভার বাজেট ৩গুণ); জাপান (টোকিও মেট্রো) ২৮০ (ভবিষ্যত এক্সটেনশন ৫০০) মিলিয়ন ডলার । 

বৈশ্বিক বিবেচনায় সাবওয়ে নির্মাণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রকল্পের শুরুতে প্রাক্কলিত ব্যয় বাস্তবায়নের সময় অনেক বেড়ে যেতে পারে। ফলে অনেক দেশ ও শহর এ ধরনের ব্যয়বহুল প্রকল্প থেকে সরে আসছে। বাংলাদেশের অতীত প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতায়  সাবওয়ে নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় বাস্তবায়নকালে কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা, হয় ইমারত ও নগর পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধান সংশোধন করে এবং সুষ্ঠু নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে নগর এলাকায় সবুজ এলাকা ও জলাশয় বাড়ানোর মাধ্যমে নগর এলাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধি রোধ না করতে পারলে সামনের দিনগুলোতে আরো বিপদ অপেক্ষা করছে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য নগর এলাকার জন্য। পাশাপাশি পরিবেশ-প্রতিবেশ, জনস্বার্থ-জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্প প্রণয়ন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে মত দেন নগর পরিকল্পনাবদদের পেশাজীবি সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স।

© ২০২১ সময় টিভি মিডিয়া নেটওয়ার্ক
সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
DMCA.com Protection Status
সময় মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
Somoy Tv App PlayStore Somoy Tv App AppleStore
ফলো সামাজিক সময়