সম্পূর্ণ নিউজ সময়
মুক্তকথা
১০ টা ০ মিঃ, ২২ মে, ২০২০

মানুষের জন্যই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রয়োজন

আমাদের পৃথিবী বিভিন্ন প্রজাতির, রঙের, বর্ণের, আকৃতির জীব কূল নিয়ে গঠিত। এদের মধ্যে আছে যেমন প্রজাতিগত বৈচিত্র্য, ঠিক তেমন আছে বাসস্থানগত বৈচিত্র্য, আবার সব থেকে মজার ব্যাপার জীনগত বৈচিত্র্যও পরিলক্ষিত হয় এ জীব কূলের মধ্যে। আর এই সব কিছু নিয়ে তৈরি জীববৈচিত্র্য বা Biodiversity.
আশিকুর রহমান সমী

সৃষ্টির শুরু থেকে ধাপে ধাপে বিভিন্ন ধরনের পরিবেশ বিভিন্ন বৈচিত্র্যের প্রাণীরা মানিয়ে নিয়েছে তাদের বৈচিত্র্য দিয়ে আর তার ফলে ধরিত্রী মাতা আজ বৈচিত্র্যময়।

চারপাশের জীব দের নিয়ে আমাদের জীবন। আর এই জীবেরা পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আর এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই পরিবেশ প্রকৃতির মধ্যে রয়েছে ভারসাম্য, রয়েছে সুষ্ঠু নিয়ম। পরিবেশের একে অপরের সাথে গভীর ভাবে জড়িয়ে। একটু কোথাও সমস্যা হলে পুরো নিয়মে ভারসাম্য নষ্ট হয়। প্রকৃতি বিভিন্ন দূর্যোগের মাধ্যমে সেটি জানান দিতে ভোলে না।

বর্তমানে আমরা মানুষ সমাজ নিজেদের চাওয়ার পরিধি টা বাড়িয়ে দিয়েছি। পৃথিবীটা আমাদের একার হয়ে গেছে। শুধু আমাদের মানব সমাজকে টিকে থাকতে হবে। বাকিদের কথা আমরা ভুলেই গেছি। আমরা ভুলে গেছি আমাদের চারপাশের পরিবেশটা আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, আমরা তাদের আবাসস্থল নষ্ট করে ফেলছি। আর আমরা যে স্থানে বসবাস করছি তা একসময় ঐ জীব সবার ছিল। আমরা আজ যে বনের গাছ উজার করে বাড়ি বানাচ্ছি নিজেদের জন্য, হয়তো ওই গাছে পেঁচার বাড়ি ছিল। সে হয়তো ইঁদুর খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি কৃষির অর্থনৈতিক উপকার করতো। ওই গাছে হয়তো বক/মাছরাঙার বিশ্রামের জায়গা ছিল, যারা জলাশয়ের অসুস্থ মাছ খেয়ে মাছের সংক্রমক ব্যাধি দূর করতো, গাছটিতে হয়তো সাপ আশ্রয় নিতো, যা ক্ষতিকর পোকামাকড় খেত বা ইঁদুর খেয়ে ফসল রক্ষা করতো। গাছ কাটার মাধ্যমে ওই সকল স্থানে শুধু গাছের অভাব হলো তাই নয়, এই গাছে বসবাসকারী সকল প্রাণী হারিয়ে গেল। যার কারণে, ক্ষতিকর প্রভাব পড়লো পরিবেশে, কৃষিতে, কৃষি অর্থনীতিতে। তখন এই ইঁদুর দমনে, পোকা মাকড় দমনে মানুষ নিল বিভিন্ন ব্যবস্থা যেমন ধরুন বিভিন্ন কেমিক্যাল আর বিষ। যা সেই মানুষ খাবে আর ধীরে ধীরে মানুষ মৃত্যু বরণ করবে।
জলচর পাখিরা অসুস্থ মাছ ধরে না খেলে পুরো জলাশয়ের মাছের মধ্যে দেখা দিতো বিভিন্ন সংক্রমক রোগ বালাই।

বিভিন্ন গবেষণা দেখায়, একটি পেঁচা সারাজীবনে ২০ লক্ষ টাকার ফসলের উপকার করে শুধু ইঁদুর খেয়ে।

দ্বিতীয়ত, বন্যজীব আর মানুষের মধ্যে প্রায় তৈরী হচ্ছে সংঘর্ষ। মানুষ শুধু তার আবাসস্থল নষ্ট করে শান্তিতে নেই, অসহায় বন্যজীবদের উপর অজ্ঞতা, শিক্ষার অভাব এমন কি মানুষ মজার ছলেও হত্যা করছে জীব কূলকে। একটি প্রাণের মূল্য তাদের কাছে খুবই তুচ্ছ।

গত কয়েকদিনের বিভিন্ন খবরের রিপোর্টে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উঠে এসেছে এমন কিছু তথ্য। Leopard cat, Fishing Cat, Jungle Cat সহ বুনো বিড়াল জাতীয় প্রাণিদের বাঘের বাচ্চা হিসাবে দাবি করে মেরে ফেলা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। মানুষ জানেই না, বাঘকে অনেক আগেই তারা মারতে মারতে সংখ্যা এত কমিয়ে দিয়েছে, যে বাংলাদেশে সুন্দরবন আর পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু অংশ ছাড়া বাঘ আর কোথাও রয়েল বেঙ্গল টাইগার এর অস্তিত্ব নেই। এই ছোট বুনো বিড়াল জাতীয় প্রাণিদের শারীরিক গঠন হয়তো কিছুটা বাঘের মতো দেখতে কিন্তু মানুষের শারীরিক কোন ক্ষতি এরা করে না। আগে সারা দেশে প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রাচুর্যতা ছিলো, তারা সেখানেই ছিল, সেখান থেকে বন্য পশুপাখি শিকার করে খেতো। মানুষ তো আজ তার সমস্ত জায়গা দখল করে নিয়েছে। এখন আর আগের মতে বন নেই, তাদের সংখ্যাও দিন দিন কমে গিয়েছে একে বারে, যে কয়টি বেঁচে আছে সেগুলোও আজ মানুষের সাথে লড়াই করে হাপিয়ে উঠেছে। তাদের ও তো খাবার দরকার বেঁচে থাকার জন্য, মানুষ তো আর তাদের প্রাকৃতিক খাদ্যের ব্যবস্থার প্রতুলতা রাখেনি পরিবেশে। বন মুরগি, অন্যান্য প্রাণী অনেক আগেই সাবার করেছে। কিন্তু মানুষ জানেই না প্রতিবেশ ব্যবস্থায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা।

তৃতীয়ত, মানুষের কুসংস্কার, ভ্রান্ত ধারণা, আর বন্যপ্রাণী সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের মধ্যে বন্যজীব দের নিয়ে বিভিন্ন কুসংস্কার প্রচলিত। যুগে যুগে এই সকল জীবদের সাথে সংঘর্ষ সহ বিভিন্ন কারণে মানুষের বন্যপ্রাণী নিয়ে তৈরী হয়েছে কুসংস্কার এবং ভ্রান্ত ধারণা। যার ফলে মারা পড়ে এই সকল জীব। যেমন মানুষের ভ্রান্ত ধারনায় মারা পড়ে বিভিন্ন প্রজাতির বিষাক্ত ও অবিষাক্ত সাপ। পরিবেশে এরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, আর শুধুমাত্র আত্মরক্ষার কাজে এরা মানুকে আক্রান্ত করে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের বন্যপ্রাণীরা মানুষের শখ নামক জিনিসটির প্রতি হার মেনে আজ খাঁচায় বন্দি।

চতুর্থত, আমাদের কাজের সমম্বয়হীনতা। মানুষের কাছে সঠিক বার্তা না পৌঁছানো, টেকসই সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব। আর জনগণের কাছে খবর গুলো না পৌছানো।

বিজ্ঞানীদের কাজ, গবেষণা বা চিন্তাধারা কতটা পৌছায় সবার মধ্যে এটা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সঠিক পরিকল্পনা, জনগণের অংশগ্রহন ছাড়া কখনো সংরক্ষণ সম্ভব নয়।

পরিবেশ, প্রতিবেশ আর জীববৈচিত্র্যের এমন ক্ষতি মানুষ করে ফেলেছে এখন, পরিবেশ আজ জানান দিচ্ছে তার কথা। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগের কবলে পড়ছে আজ পুরো বিশ্ব।

সময় এসেছে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহনের। গত পরশু পুরো বাংলাদেশ দেখেছে ঘূর্ণিঝড় আমফান এর ভয়াল গ্রাস। কেন এখন এত ঘন ঘন প্রকৃতিক দূর্যোগের কবলে পড়ছে আমাদের এই ধরিত্রী । এখানে একটি দেশ নিজ থেকে করা না, দরকার পুরো বিশ্বের সচেতন হওয়া। সকলের একসাথে উদ্যোগ নেয়া।

আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় শুধু সুন্দরবনকে মনে রাখি, কেন এর আগে কেন ভাবি না এই বনের কথা। এই বন বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করছে বাংলাদেশকে। এটি প্রাকৃতিক ভাবে তৈরী হওয়া বন, দিনে দিনে আমরা একে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছি, এই বন না থাকলে কি হবে এটা যেন ফেসবুক স্ট্যাটাসের বাইরে মন থেকে আমরা একটু চিন্তা করি।

আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় শুধুমাত্র সুন্দরবন কে মনে রাখি, কেন এর আগে কেন ভাবি না এই বনের কথা। এই বন বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করছে বাংলাদেশ কে। এটি প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি হওয়া বন, দিনে দিনে আমরা একে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছি, এই বন না থাকলে কি হবে এটা যেন ফেসবুক স্ট্যাটাসের বাইরে মন থেকে আমরা একটু চিন্তা করে দেখি। যান্ত্রিকতা দিয়ে আর যাই হোক, মানুষ প্রকৃতির সাথে পেরে উঠবে না। প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারিয়ে রুদ্র মূর্তি ধারণ করতে সময় নেবে না।

বিশ্বব্যাপী বর্তমানে হওয়া করোনা ভাইরাস, মানুষ কে করেছে আজ গৃহবন্দী। আর বন্য জীবরা খুঁজে ফিরছে তাদের পরিবেশ। মানুষ যেন তাদের কথা এবার একটু ভাবে। একটু তাদের কথাও চিন্তা করে। পৃথিবীর কি হাল করেছে এটা যেন তাদের মধ্যে একটু হলেও নাড়া দেয়।

ধরিত্রী মাতাকে বাঁচাতে, এই জীব বৈচিত্র্য কে বাঁচাতে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে সকলকে। প্রত্যেক মানুষ কে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দাড়াতে হবে সংরক্ষণের জন্য।
আর সংরক্ষণের বার্তা পৌছাতে হবে সাধারণ মানুষের মাঝে। তাদের অংশগ্রহণ না থাকলে, যতই কথা বলা হোক এটা সম্ভব নয়। আর তাদের কাছে কথা গুলো পৌঁছাতে হবে তাদের ভাষায়। এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ যশোর এর কেশবপুরে হনুমান সংরক্ষণ প্রকল্প। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও বন্যপ্রাণী গবেষক প্রফেসর ড. ফিরোজ জামান ও তার গবেষক দল একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ করে রেখেছে যশোরের হনুমান সংরক্ষণে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে। যে মানুষ এক সময় হনুমান হত্যা করতো তারা এই গবেষণা প্রকল্পের পর থেকে নিজ সন্তানের মত স্নেহে হনুমান সংরক্ষণ করছে।

প্রথমত সঠিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। পরিকল্পনা ছাড়া সংরক্ষণ সম্ভব নয়। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে সকলকে অন্তর্ভুক্ত করে, বিশেষ করে জন সাধারণ কে।

কারণ তারা ঐ এলাকায় থাকবে আর তাদের সাথেই ঐ এলাকার জীবকুলের সম্পর্ক সব থেকে বেশি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন বহুল জনপ্রিয়। এই মাধ্যম গুলোতে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি সম্ভব যার উদাহরণ, Deep Ecology and Snake Rescue Organisation নামক গ্রুপ। এই গ্রুপ থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক মানুষ আজ সাপ সম্পর্কে সচেতন যেখানে তাদের ছিলো অনেক অজ্ঞতা।

বর্তমানের সংবাদ মাধ্যম গুলো রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে। বিশেষ করে সাংবাদিক বৃন্দ। সঠিক সংবাদ, জীব বৈচিত্র্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে তারা সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে পারেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন উদ্যোগ আসলেই প্রশংসনীয় জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণে। এখন এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে দরকার জনগণের অংশগ্রহণ। 

পৃথিবীতে এখন দরকার মানুষ আর অন্যান্য জীব কূলের সহ অবস্থান। সকলকে নিয়ে আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। আর সকলেই পরিবেশের জন্য দরকারি। সকালের আছে ধরণী মায়ের বুকে সুস্থ নিশ্বাসে বেঁচে থাকার অধিকার। 

এমন একটি দিন হয়তো আসবে যেদিন মানুষ জীববৈচিত্র্যকে দিয়ে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করবে। আর তার সূচনা এখনই হওয়া উচিত।

লেখক:
শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

© ২০২১ সময় টিভি মিডিয়া নেটওয়ার্ক
সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
DMCA.com Protection Status
সময় মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
Somoy Tv App PlayStore Somoy Tv App AppleStore
ফলো সামাজিক সময়