সম্পূর্ণ নিউজ সময়
মুক্তকথা
২২ টা ২৫ মিঃ, ৯ মে, ২০২০

পশ্চিমাদের দ্বিমুখী আচরণ: বাংলাদেশ ও গণতন্ত্র

১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা নেয়ার পর থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিদের বিচারের আওতায় আনার চেষ্টা করেছেন। খুনিদের অধিকাংশই বিদেশে পলাতক আছেন। যুদ্ধাপরাধ আদালতের মাধ্যমে কয়েকজনকে ফাঁসিতে ঝুলানোর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে পশ্চিমারা সমালোচনা শুরু করে দিলো। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার যদি অগ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে তাহলে স্ট্যাচু অব লিবার্টি ধ্বংস করার দায়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিচারকরা কি শাস্তি দেন তাও দেখা উচিত। নাইন ইলেভেনের কারণে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এখনো সেই অবস্থা থেকে দেশকে উদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। 
Somoy News
ওয়েব ডেস্ক

শেখ হাসিনার পুত্র ও তার তথ্য প্রযুক্তি এবং যোগাযোগ উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় নিউ ইয়র্ক টাইমসে লেখেন, ' ৪০ বছর পার হয়ে গেলেও আমার পরিবারের অন্যতম একজন খুনি রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীনভাবে বসবাস করছেন। ঢাকার একটি আদালত তার অনুপস্থিতেই তাকে হত্যা ও হত্যা ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। যদিও লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে তার সাবেক সামরিক যে পদমর্যাদা আছে সে অনুযায়ী কোর্ট মার্শালে তার অনেক আগেই দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার হওয়ার কথা।

১৯৯৬ সাল থেকে পলাতক রাশেদ চৌধুরীকে তার অপরাধের জন্য এখনো বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। ২০০০ সালে তাকে বাংলাদেশের কাছে সমর্পণের জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। দেড় দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাকে হস্তান্তর করা হয়নি।'

গণতন্ত্রের মন্দির হিসেবে পরিচিত গ্রেট ব্রিটেনেও আরেক যুদ্ধাপরাধী অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কথিত আছে মার্কিনিরা যা করে তার চেয়েও ভাল করে ব্রিটিশরা। ১৯৭১ সালে হাজার হাজার মানুষকে হত্যাকারী যুদ্ধাপরাধী চৌধুরী মুইনুদ্দিনও তাই লন্ডনের বাসিন্দা হয়ে আছেন। অথচ ১৯৯৫ সালে পশ্চিম বাংলার পুরুলিয়ায় অসংখ্য অস্ত্র চালানকারী পিটার ব্লিচকে ভারতের ছেড়ে দিতে হয়েছে। তার ঘনিষ্ঠ সহচর জন ক্রিস্টাইন নিলসেন ওরফে কিম ডেভির 'কয়েদখানার বেহাল দশা' অভিযোগের দোহাই দিয়ে বিচারের জন্য ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। একইসঙ্গে ডেনমার্কে মৃত্যুদণ্ড আইনি নয় মর্মে নিলসেনকে মৃত্যুদণ্ড না দেয়ার বিষয়েও নিশ্চয়তা চাওয়া হয়। অথচ এই ডেনিশরাই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিত বাম সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামাতে হিন্দুত্ববাদী একটি দলকে অস্ত্র দিয়েছিলো। 

পিটার ব্লিচকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমার জন্য ভারতের কাছে পিটিশন করতেও একটুও দ্বিধাবোধ করেনি ব্রিটেন। ঐ সময়ে ভারতের কয়েদখানার বেহাল দশা নিয়েও মাতামাতি করে দেশটি। অথচ যুক্তরাজ্যে জালিয়ানওয়ালাবাগে অসংখ্য মানুষ হত্যাকারী জেনারেল ডুয়ারকে গুলি করে মারার অভিযোগে উধাম সিংকে ফাঁসিতে ঝুলাতে একটুও দ্বিধাবোধ করেনি ব্রিটেন। 

এখনো দ্বিমুখী আচরণ করে যাচ্ছে পশ্চিমারা। এইবার বাংলাদেশকে টার্গেট করা হয়েছে। গত ৭ই মে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল আর মিলার, বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিতর্কিত পোস্টের বিষয়ে সরকারের সতর্কবার্তার তীব্র বিরোধিতা করেন। এক টুইট বার্তায় তিনি, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য স্বাধীন গণমাধ্যমের কথা উল্লেখ করেন। তাই বিষয়টা এমন যেন, গণতন্ত্রের নামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের যা তা বলতে পারবেন তা সামাজিক বা ধর্মীয় যে উত্তেজনাই দেখা দেক না কেনো!! গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে লেকচার দেয়ার আগে গুয়ান্তানামো বে'র বন্দি নির্যাতনশালার বিষয়ে খতিয়ে দেখা উচিত মিলারের। 

মিলারের নিজের দেশের দিকে নজর দেয়া উচিত। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীদের বার্তা ও হোয়াইট হাউজের নেয়া পদক্ষেপের দিকেই আলোকপাত করা যাক। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন জানায়, করোনা প্রাদুর্ভাবের জেরে মহামারি ঘোষণা দেয়া থেকে শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বিরত রাখেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। হোয়াইট হাউজের অনুমতি ছাড়া গণমাধ্যমে কিছু বলার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ভাইরাস বিশেষজ্ঞ ড. এন্থোনি এস ফসিকে নিষেধ করা হয়। 

মিলারের টুইটের পরপরই বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাই কমিশনারও বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষা ও বাক স্বাধীনতার জন্য হইচই শুরু করে দেন। স্বাধীন মাধ্যম থেকে গ্রহণযোগ্য তথ্য নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়ে ব্রিটিশ হাই কমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন বলেন, কোভিড নাইন্টিন প্রাদুর্ভাবের মধ্যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে জানা যায়, ব্রিটেনে স্বাস্থ্যকর্মীদের হুমকি দিয়ে করোনা মহামারি নিয়ে কিছু না বলতে চুপ করে রাখা হয়েছে। জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার অসংখ্য কর্মী জনসম্মুখে সব কথা বলতে পারছেন না। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর অপ্রতুলতার বিষয়টিও এড়িয়ে যেতে বাধ্য করা হয়। 

বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা উদ্ধারের জন্য মিলার ও ডিকসন উঠে পড়ে লেগেছেন। করোনা মহামারি ঠেকাতে তাদের নিজেদের গণমাধ্যমের বাকস্বাধীনতা কতটুকু নিশ্চিত করা হয়েছে সেদিকে নজর দিতে বলব তাদের। তাদের সরকার ইতোমধ্যে যা করেছে তা বাংলাদেশকে করতে না দেয়া এটা কি কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা অতিক্রম করে না?

সম্প্রতি এশীয় একটি গণমাধ্যমে রোহিঙ্গা ইস্যুতে পশ্চিমাদের দ্বিমুখী আচরণ নিয়ে সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন। বাংলাদেশকে যেন দশ লাখ রোহিঙ্গার মানবিকতার সব দায়িত্ব নিতে হবে আর অন্যদিকে গণহত্যায় অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও সব দায় থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে মিয়ানমার। 

সবশেষ ঢাকার মেয়র পদে নির্বাচনে বাংলাদেশের নির্বাচনী আচরণবিধি ও স্থানীয়দের বিদেশি পর্যবেক্ষক নিয়োগের বিষয়ে দশটি পশ্চিমা মিশন বিদ্রূপ করেছে। এরমধ্যে আবার মার্কিন দূতাবাসে জামায়েতে ইসলামির সঙ্গে সম্পৃক্ত ও আওয়ামী লীগ বিরোধী স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকও রয়েছেন। 
এমনকি সবশেষ জাতীয় নির্বাচনেও মার্কিন অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক সুশীল প্রতিনিধিদের সংগঠন ANFREL কে নিয়োগের জন্য সব ধরণের চেষ্টা করেছেন দূতাবাসের কর্মকর্তারা। বাংলাদেশের গণমাধ্যম সময় টেলিভিশনকে ভারতীয় এক বিশ্লেষক বলেন, মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে BIR যেভাবে শাসক দল পরিবর্তন করে সে পথ অনুসরণ করতে পারে ANFREL। 

১৯৭১ সালে ইয়াহিয়া খানের মতো হত্যাকারী শাসক থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ড্যান মোজেনা বা ডেভিড মিলাররা যেভাবে সমর্থন দিয়ে আসছে আসলে তারা মোটেই মানবাধিকার বা বাক স্বাধীনতার বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়। বরং তারা শাসক দল পরিবর্তনের প্রভাবকের অপারেশনে নেমেছে।

ANFREL কে অর্থায়ন, মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা নিয়ে হইচই, দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ধ্বংস করার পর এবার তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্টের হুমকি দিচ্ছে।

লেখক: সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত 

'দ্য ইস্টার্ন লিংক'-এ প্রকাশিত মূল ইংরেজি লেখাটি অনুবাদ করেছেন ওমর ইনান।

© ২০২১ সময় মিডিয়া লিমিটেড
সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
DMCA.com Protection Status
সময় মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
Somoy Tv App PlayStore Somoy Tv App AppleStore
ফলো সামাজিক সময়