সম্পূর্ণ নিউজ সময়
মুক্তকথা
১১ টা ৪২ মিঃ, ৫ মে, ২০২০

সুলতান মামা নেই, নেই চায়ের কাপে টুংটাং শব্দ

রাত সাড়ে বারোটা। হঠাৎ ফেইসবুকের ম্যাসেঞ্জারে বন্ধু সৈকতের একটি ম্যাসেজ এবং একটি ছবি। ছবিটি একজন চা বিক্রেতার। ছবিটির মানুষটাকে চিনতে ভুল হলও না। এটি সুলতান মামার ছবি। পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের বিপরীতে পানির ট্যাংকের নিচে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর লেবু ও গুড়ের চা বিক্রি করতেন সুলতান মামা। হঠাৎ তার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে থমকে গেলাম। তিনি স্ট্রোক করে মারা গেছেন গতকাল সন্ধ্যা পৌনে আটটায়‌। ভীষণ মন খারাপ হলও। স্মৃতি রোমন্থনে মনে পড়ে গেল ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। আমাদের প্রিয় সুলতান মামার কথা । 
ওয়েব ডেস্ক

জীবনে কিছু কিছু সম্পর্ক থাকে একান্ত গোপন এবং শব্দহীন । আবার হৃদয় নিংড়ানো। জীবনে কিছু কিছু সখ্যতা থাকে নিবিড় এবং ভ্রান্তি-হীন । আবার অশ্রু মেশানো । 

কিছু সম্পর্ক চাইলেই আসলে স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা যায় না। সেটা হোক ক্ষণিকের কিংবা দীর্ঘ সময়ের। সুলতান মামা নেই, নেই চায়ের কাপে টুংটাং শব্দ। নেই চায়ের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা অপেক্ষমাণ তৃষ্ণার্ত মানুষের লম্বা লাইন। জানিনা সুলতান মামার পরিবারে কে কে আছে। তার বাড়ি কোথায়? তিনি কোথায় থাকেন? আবার সৈকতের কাছ থেকে সুলতান মামার সম্পর্কে কিছু জানার চেষ্টা করলাম। সৈকত কিছুই বলতে পারছে না।

বেঁচে থাকতে সুলতান মামার সাথে তাঁর পারিবারিক বিষয় নিয়ে গল্প করার সময় কিংবা সুযোগ ছিল না। সুলতান মামার চায়ের দোকানের আশেপাশে সন্ধ্যার পর এত মানুষের ভিড় জমে থাকতো দেখে মনে হতো যেন একটা উৎসব। একটি আয়োজন। দেখতাম চায়ের প্রতিটি চুমুকে চুমুকে শব্দ। দেখতাম সবার ঠোঁটের কোণে রঙিন হাসি যেন আর কোন বিষণ্ণতা নেই। নেই কোন মানসিক অবসাদ। মনে হয় প্রতিটি চায়ের চুমুকে যেন নতুন একটি আমেজ। নতুন একটি ফিলিংস। কেউ পাশে হাতে চায়ের কাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। কেউ তার বন্ধু,সহকর্মী কিংবা সহপাঠীদের নিয়ে তুমুল আড্ডা দিচ্ছে। আবার কেউ কেউ মনের অজান্তেই সিগারেটে সুখটান দিচ্ছে । 

প্রতিদিন সন্ধ্যার পর ১ হাজার কাপ চা বিক্রি হতো। সুলতান মামা সবার কাছে খুব জনপ্রিয় ছিল। তিনি খুব সৎ,বিনয়ী এবং সাদা মনের মানুষ ছিলেন। তার অকৃত্রিম সুন্দর আচরণ সবাইকে মুগ্ধ করতো।

সপ্তাহে তিন দিন সুলতান মামার চা খাওয়ার জন্য ছুটে যেতাম পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে। সন্ধ্যায় প্রচণ্ড ভিড় হতো। আমি একসাথে দুই কাপ চা খেতাম। প্রতিটি চায়ের কাপ ৮ টাকা। আমি সুলতান মামাকে বলতাম এতো অসাধারণ চা আপনি চায়ের দাম বাড়িয়ে ১০ টাকা করেন। তিনি হেসে বলতেন আমার এখানে তো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বেশি আসে। ছাত্ররা এতো টাকা কোথায় পাবে। তারা তো বাড়ি থেকে বাবা মা'র কাছ থেকে টাকা আনে।  

আমার বন্ধু কামরুল তোহা আমাকে সুলতান মামার কাছে নিয়ে যেত। তার মাধ্যমেই সুলতান মামার সাথে আমার প্রথম পরিচয়। আমরা দুই বন্ধু বাইকে করে চা খেতে যেতাম। কামরুল থাকে মালিটোলা আর আমি ওয়ারীতে। কামরুল তোহা একজন গল্পকার। ছোট ছোট চমৎকার গল্প লেখে। বানের জলে স্বপ্ন ভাসে তার একটি অসাধারণ ছোট গল্প। যেখানে জেলেদের জীবনে স্বপ্নের কথা বলা হয়েছে। করোনার এই দুর্যোগে সে তার গ্রামের বাড়ি বরিশালে চলে গেছে। হয়তো সে আবার ফিরে আসবে। কিন্তু খুঁজে পাবেনা সবার প্রিয় সুলতান মামাকে। চায়ের তৃষ্ণা মিটাতে আর যাওয়া হবে না ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে সুলতান মামার কাছে। জানি আবার কোন এক সন্ধ্যায় চায়ের তৃষ্ণা পেলে আমাদের সুলতান মামার কথা খুব মনে পড়বে। আমরা তাকে খুব মিস করবো ।

লেখক: সুজন হাজং, গীতিকার ।

© ২০২১ সময় টিভি মিডিয়া নেটওয়ার্ক
সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
DMCA.com Protection Status
সময় মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
Somoy Tv App PlayStore Somoy Tv App AppleStore
ফলো সামাজিক সময়