সম্পূর্ণ নিউজ সময়
মুক্তকথা
১০ টা ৩৩ মিঃ, ৩০ এপ্রিল, ২০২০

জীবন যুদ্ধে হার না মানা একজন ক্ষিরোদের গল্প

আজ লিখছি জীবন যুদ্ধে হার না মানা একজন ক্ষিরোদের গল্প। একজন বীর যোদ্ধার গল্প‌। একজন অ্যাম্বুলেন্স চালকের গল্প। তার করোনা আক্রান্তের গল্প। তার বিনা বেতনে মানব সেবার গল্প। তার পিছিয়ে পড়া হাজং সমাজকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার গল্প । 
সুজন হাজং

সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্স চালক ক্ষিরোদ কুমার হাজং‌ করোনায় আক্রান্ত। বেশ কিছুদিন সর্দি, জ্বর, কাশিতে ভোগার পর‌ গত ২৭ এপ্রিল তার করোনা রিপোর্ট পজিটিভ আসে। করোনার এই দুর্যোগে তিনি মানবতার সেবায় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিনা বেতনে ক্ষিরোদ রোগীদের জরুরি সেবা দিতে গিয়ে নিজেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

হাজং জনগোষ্ঠীর মধ্যে তিনিই প্রথম করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তার গ্রামের বাড়ি বিশ্বম্ভপুর উপজেলার কাইতকোনা। ক্ষিরোদের বাবা নেই। বাবার রেখে যাওয়া ভিটেমাটি ছাড়া চাষাবাদের কোন জমি নেই। ঘরে ৬৫ বছর বয়স্ক মা আছে। পরিবারে স্ত্রী রস্মিতা দেবী হাজং স্বামী ক্ষিরোদের উপার্জন না থাকায় সেলাইয়ের কাজ করে কোন রকম সংসার চালাতো। কিন্তু করোনায় এখন গৃহবন্দী। কাজ বন্ধ। উপার্জন নেই। মহাজনদের কাছে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সংসার চলছে। এখন আবার ঘরে খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। মা, স্ত্রী, এক ছেলে এবং এক মেয়েকে নিয়ে ক্ষিরোদের অভাবের সংসার। সংসারে  নানান ধরণের টানাপোড়েন আছে। বড় ছেলে কলেজে পড়ে আর মেয়ে প্রথম শ্রেণীতে। ছেলে কলেজে যাওয়ার জন্য বাবার কাছে সাইকেল আবদার করেছে। কিন্তু ছেলের সেই আবদার বাবা এখনো পূরণ করতে পারেনি। কারণ বাবা তো বিনা বেতনে অ্যাম্বুলেন্স চালিয়ে মুমূর্ষু রোগীদের সেবা দেন।

এই দুঃসময় তার মতো একজন মহৎ মানুষটির জন্য আমরা কি কিছুই করতে পারিনা। এই রাষ্ট্রের কি কিছুই করার নেই? সেখানকার উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। 

ক্ষিরোদ আমার সাথে ফেসবুকে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। অসাধারণ বিনয়ী এবং আত্মপ্রত্যয়ী ক্ষিরোদ। একজন সংস্কৃতিমনা ক্ষিরোদ গান ভালবাসেন। গল্পের বই পড়েন। নিয়মিত খবরের কাগজ পড়েন। স্বপ্ন দেখেন আমাদের মতো তরুণ প্রজন্মের ছেলেদের নিয়ে এবং সে সবসময় বলে আমরা যেন সমাজকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যাই। 

ক্ষিরোদ লোভ লালসার উর্ধ্বে একজন সৎ,বিনয়ী এবং পরিশ্রমী মানুষ। তিনি ২০১১ সালে অ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে একটি প্রজেক্টের মাধ্যমে যোগদান করেন সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ৫ বছর প্রজেক্টে চাকুরি করার পর ২০১৬ সালে তার মেয়াদ শেষ হয়। তারপর তিনি আর অন্য কোথাও চাকুরি খুঁজেননি। যদিও একজন অ্যাম্বুলেন্স চালকের ব্যাপক চাহিদা আছে। কারণ তিনি নিজ এলাকায় থেকে নিজ এলাকার মানুষদের সেবা দিতে চেয়েছেন। প্রজেক্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর ২ বছর তিনি বিনা বেতনে সেখানে সেবা দিয়ে গেছেন। 

অ্যাম্বুলেন্স চালক পদটি শূন্য থাকায় তিনি এতদিন অস্থায়ী হিসেবে বিনা বেতনে সেখানে চাকরি করছেন। যদি পদটি স্থায়ী করা হয় তবে হয়তো ক্ষিরোদ আবার নতুন করে পরিবারকে নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখবে। 

একজন অ্যাম্বুলেন্স চালকের কাছে যে কোন সময় জরুরি কল আসে এবং নির্ধারিত জায়গায় মুমূর্ষু রোগীকে পৌঁছে দিতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনার সেবা দিতে গিয়ে আজ তিনি করোনায় আক্রান্ত। 

আজ ক্ষিরোদের মত একজন সাহসী যোদ্ধার পাশে দাঁড়াতে হবে আমাদের। দাঁড়াতে হবে তার অসহায় বিপন্ন পরিবারের পাশে। আর্থিক সহযোগিতা করতে হবে তার পরিবারকে। সে যেন করোনার যুদ্ধে পরাজিত না হয়। সে যেন করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করে সুস্থ হয়ে ফিরতে পারে তার দুঃখিনী মা'র কাছে, তার প্রিয়তমা স্ত্রী এবং আদরের সন্তানদের কাছে। তাঁর পরিচিত বন্ধু-বান্ধব,আত্মীয়-স্বজন এবং সমাজের মানুষের কাছে। 

মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াবার একজন মানবতাবাদী ক্ষিরোদকে আজকে আমাদের খুব প্রয়োজন। এই করোনার দুর্যোগ মুহূর্তে মানুষ যখন মানুষের পাশে থাকে না যখন একজন মুমূর্ষু রোগীর আত্মচিৎকারে কেউ এগিয়ে আসে না। তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্ষিরোদের মতো ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষেরা এগিয়ে আসে। আক্রান্ত হয়। আবার জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। তখন শ্রদ্ধায় মাথা নত করতে হয় আমাদের।

হাজংদের শৌর্য-বীর্যের ইতিহাস আছে, জীবন বলিদানের ইতিহাস আছে,বঞ্চনার ইতিহাস আছে। ভূমি হারানোর ইতিহাস আছে। তবে হারানোর ইতিহাস দীর্ঘ। এই দীর্ঘ ইতিহাসে আমরা ক্ষিরোদকে হারাতে চাই না। 

ক্ষিরোদ খুব আশাবাদী মানুষ। করোনার বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে তিনি টিকে থাকবেন বলে মনে করেন। আমরাও বিশ্বাস করি ক্ষিরোদ এই লড়াইয়ে টিকে থাকবে এবং আবার নব উদ্যমে মানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখবে। ক্ষিরোদের জন্য ভালবাসা এবং শুভকামনা।

লেখক: সুজন হাজং,গীতিকার

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। সময় সংবাদের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতে পারে। লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় সময় সংবাদ নেবে না।

© ২০২১ সময় টিভি মিডিয়া নেটওয়ার্ক
সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
DMCA.com Protection Status
সময় মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
Somoy Tv App PlayStore Somoy Tv App AppleStore
ফলো সামাজিক সময়