সম্পূর্ণ নিউজ সময়
মুক্তকথা
১১ টা ৩১ মিঃ, ২১ এপ্রিল, ২০২০

কোভিড -১৯ এবং সামাজিক বিজ্ঞানের দায়

২০২০ সাল সামাজিক বিজ্ঞানীদের জন্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। জার্মান বুর্জোয়া সমাজতাত্ত্বিক ম্যাক্স ভেবার (অনেকেই ওয়েবার ডেকে থাকেন) ১৯২০ সালের ১৪ই জুন মারা যান। সুতরাং ২০২০ সাল ম্যাক্স ওয়েবার এর মৃত্যু শতবর্ষ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরে স্প্যানিশ ফ্ল শুরু হয়। এই ইনফ্লুয়েঞ্জা জ্বরের স্থায়িত্ব কাল ছিল ১৯১৮-২০ পর্যন্ত। মিলিয়ন মানুষ তখন মারা যায় এবং ম্যাক্স ওয়েবারকে ও সেই পরিণতি ভোগ করতে হয়।
ওয়েব ডেস্ক

ওয়েবার এর বয়স ছিল মাত্র ৫৬ বৎসর। বেশ কিছু দেশের এমন বিপর্যয় ঘটে যাতে সামাজিক ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়। ব্রিটিশ উপনিবেশ পশ্চিম সামোয়ার ৯৫ শতাংশ মানুষ ওই ভাইরাসে আক্রান্ত হয় এবং প্রায় ২২ শতাংশ মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। নানান ক্ষতির মধ্যে ডেমগ্রাফিক ক্ষতিটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। বয়স্ক কিংবা শিশুরা বেশি মারা যায়নি। ওই ভাইরাসের শিকার ছিল যুব সমাজ, যাদের বয়সের ব্যাপ্তি ছিল ১৫-৪০ এর মধ্যে।

ওয়েবার যখন মারা যান, ওই সময়ে তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইকনমি অ্যান্ড সোসাইটি’ নিয়ে কাজ করছিলেন। অভিযোগ উঠেছে যে, কোন সমাজতাত্ত্বিকই ওই ফ্লুয়ের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে কাজ করেন নি। ওয়েবার তাঁর জীবদ্দশার শেষ বছরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে লিখেছিলেন; কিন্তু কিছুই লিখেননি মহামারির অর্থনৈতিক প্রত্যাঘাত নিয়ে।

কাজেই সামাজিক বিজ্ঞানিদের কাছ থেকে আমরা লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভাগ্য মৃত্যু এবং তদজনিত স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক শক নিয়ে তেমন কিছু জানিনা।কেউ কেউ বলেন যে, আজকের মত অবাধ তথ্য ভাণ্ডার হাতের কাছে থাকলে হয়ত ম্যাক্স ওয়েবার এ সম্পর্কে অবশ্যই লিখতেন।

ওয়েবারকে ‘বুর্জুয়া মার্ক্স’ বা ‘মার্ক্সের ভূত’ বলা হয়ে থাকে। কার্ল মার্ক্স ডানে বললে ওয়েবার বামে বলেছেন। ওয়েবার ছিলেন বুর্জুয়া সমাজ বিজ্ঞানের নেতা। তিনি মার্ক্সের অর্থনীতি নির্ভর দান্ধিকতা নিয়ে তির্যক সমালোচনা করেছেন; যুক্তি দিয়েছেন প্রটেস্টান্ট ধর্ম ও পুঁজিবাদের আন্তঃসম্মিলনের কথা; উন্মেষের কথা এবং তা ইউরোপের প্রেক্ষাপটে। তাঁর মতে, প্রটেস্টান্ট এর ‘নৈতিকতা’ হচ্ছে পুঁজিবাদের প্রাণভোমরা।

কিন্তু ভাইরাস এর সাথে পুঁজিবাদের বস্তুগত সম্পর্ক কি কিংবা থাকতে পারে কি—ইহজাগতিক দুনিয়ায় পুঁজিবাদের আত্ম বিনাশী উপাদান গুলো কি—তা আমরা ওয়েবারের অন্তধানের পূর্বে কিংবা পরে তার সদুত্তর দেখিনা। পুঁজিবাদ বড়ই নির্মম, এটি নিজ অন্তঃদন্ধে জ্বলে পুড়ে যায়, এবং তাই পুঁজিবাদী সমাজ অবিনাশি নয়। বহু বছর আগে জার্মান সমাজ চিন্তুক কার্ল মার্ক্স তাঁর লেখনীতে এই কথা গুলো লিখে গিয়েছেন। নিকট ভবিষ্যতে আমরা দেখব, করোনা প্রভাবে বাংলাদেশ সহ সারা দুনিয়ার স্টক মার্কেট, শ্রম বাজার, উৎপাদন, বণ্টন এবং জিডিপি কিভাবে ধ্বস নামে তা সময় বলে দেবে। সেদিক থেকে কভিড-১৯ পুঁজিবাদের জন্য সার্বিকভাবে দুর্যোগ।

স্বাস্থ্য আগে না অর্থনীতি আগে—এই বিতর্ক পুঁজিবাদী দুনিয়াকে থমকে দিয়েছে। একবার লক ডাউন আরোপ করা, আবার তুলে নেয়া পুঁজিবাদী জগতকে ধাঁধায় ফেলে দেয়। বাংলাদেশের মত দেশে ‘ছুটি’ ঘোষণা করে—অপ্রকাশ্যে লক ডাউন বলে। সারা দেশ নয়—ভাশুরের নাম না নেবার মত। একটাই কারণ অর্থনীতি যেন থমকে না যায়। সেই জন্যে গার্মেন্টস খোলা না, আবার বন্ধও না—এই আলো আধারি খেলা চলে।

ম্যাক্স ওয়েবার সম্ভবতঃ তৎকালীন বুর্জোয়া সমাজে স্প্যানিশ ফ্লুয়ের ওই অন্তদন্ধ বলতে চাননি। কিন্তু তাঁর ধর্মতত্তে মৃতদেহের করুণ সৎকারের উল্লেখ নেই। পুঁজিবাদ এতই সঙ্কটাপন্ন যে, স্পেন, জার্মান, ইটালি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষতঃ নিউইয়র্কে করোনা মৃত্যুজনিত লাশের সৎকার হয়না; গণকবরে লাশ পুঁতে ফেলা হয়। কে জানে, আমার দেশেও আমি বা আমরা লাশ হয়ে ওই করুণ পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছি কিনা?

ম্যাক্স ওয়েবার নিজের জীবন দিয়ে পুঁজিবাদের নির্মমতার বলি হয়েছেন। যে পুঁজিবাদকে তিনি বন্দনা করেছেন; সমাজতন্ত্রের বিপরীতে অবিনাশি সমাজ বলে প্রশস্তি গেয়েছেন—তিনি নিজেই তার ছোবল থেকে রক্ষা পাননি। মৃত্যুর পর ওয়েবারকে দাহ করা হয়েছিল। ১৯২০ সালে জার্মানিতে প্রটেস্টাণ্টদের দাহ করা খুবই অপ্রচলিত ছিল। আর ক্যাথোলিকদের ক্ষেত্রে তো নিষেধই ছিল। অনেকেই বলেন, ম্যাক্স ওয়েবারের মৃতদেহ দাহ করার মধ্য দিয়ে প্রকৃতিতে কার্বনডাই অক্সাইড যুক্ত হয়েছে—মৃত্যু আর এক ভাবে জীবনকেই চালু রেখেছে। কিন্তু খ্রিষ্টান ধর্ম চর্চায় (মুসলিম সহ) মৃতদেহের ধর্মীয় রীতি নীতি বিরোধী সৎকার পুঁজিবাদী সমাজের আত্মবিনাশী মতাদর্শকে কি তুলে ধরেনা?

লেখাক:
নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

© ২০২১ সময় টিভি মিডিয়া নেটওয়ার্ক
সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
DMCA.com Protection Status
সময় মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
Somoy Tv App PlayStore Somoy Tv App AppleStore
ফলো সামাজিক সময়