সম্পূর্ণ নিউজ সময়
মহানগর সময়
১২ টা ২৫ মিঃ, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৯

ফিরে দেখা ২০১৯: বছরজুড়ে অগ্নিকাণ্ড, আর কত দীর্ঘ হবে লাশের মিছিল?

শেষ হতে চলেছে ২০১৯। নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার মধ্যে বছর জুড়ে আলোচনায় ছিল আগুন। ২০১৯ যেন ছিল ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের বছর।
শতরূপা দত্ত

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর রাজধানীসহ সারা দেশে আগের বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি বছরের ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে প্রায় ২২ হাজার ৩৫২টি, যা ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এ সময় নিহত হয়েছেন প্রায় ১৮৭ জন, আর আহত প্রায় ৩৯১ জন। আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২০৫ কোটি টাকার।

ফায়ার সার্ভিসের গত কয়েক বছরের হিসাব:

  • ২০০৮ সালে ৯ হাজার ৩১০টি অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন ২২৯ জন, আহত হন ১ হাজার ৩৫৬ জন।
  • ২০০৯ সালে ১২ হাজার ১৮২টি অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন ১১৮ জন।
  • ২০১০ সালে ১৪ হাজার ৬৮২টি অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ৬৩ জন।
  • ২০১১ সালে ১৫ হাজার ৮১৫টি অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন ৩৬৫ জন। ২০১২ সালে ১৭ হাজার ৫০৪টি অগ্নি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ২১০ জন।
  • ২০১৩ সালে অগ্নি দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৯১২তে। নিহত হন ১৬১ জন।
  • ২০১৪-তে ১৭ হাজার ৮৩০টি অগ্নি দুর্ঘটনায় ৭০ জন প্রাণ হারান।
  • ২০১৫ সালে ১৭ হাজার ৪৮৮টি অগ্নি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৬৮ জন।
  • ২০১৬-তে ১৬ হাজার ৮৫৮টি অগ্নি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৫২ জন।
  • ২০১৭ সালে ১৮ হাজার ১০৫টি অগ্নি দুর্ঘটনায় মারা যান ৪৫ জন।
  • ২০১৮-তে ১৯ হাজার ৬৪২টি অগ্নি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১৩০ জন।
  • ২০১৯ সালে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে প্রায় ২২ হাজার ৩৫২টি, নিহত হয়েছেন প্রায় ১৮৭ জন, আর আহত প্রায় ৩৯১ জন।

রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ আগুন :
বছরের শুরুতেই ২০ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) রাতে পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুন লাগার পর থেকেই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন। তারপরও মৃত্যুপুরী চকবাজার থেকে বের হয়ে এসেছে একের পর এক লাশ। এ দুর্ঘটনায় শেষ পর্যন্ত ৭১ জনের মৃত্যু হয়। চকবাজারের ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতালায় রাসায়নিকের গুদাম থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছিল বলে তদন্তে বেরিয়ে আসে। এই দুর্ঘটনা মনে করিয়ে দেয় নিমতলী ট্র্যাজিডির কথা। ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতেই রাসায়নিকের গোডাউন থেকে আগুনে পুড়ে মারা যান ১২৪ জন মানুষ।

ভাসানটেক বস্তিতে আগুন :
চকবাজারের পর ভাসানটেক বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ২৭ ফেব্রুয়ারি রাত দেড়টার আগুনের সূত্রপাত হয়। এ আগুনে পুড়ে যায় প্রায় হাজারখানেক বস্তিঘর। আগুনের হাত থেকে জীবন বাঁচাতে নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার সময় মায়ের কোল থেকে পানিতে পড়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়। ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিট প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা চেষ্টার পর পরদিন সকাল আটটায় আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করতে সক্ষম হয়।

বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ড :
চুড়িহাট্টার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানীর বনানীর বহুতল ভবন এফআর (ফারুক রূপায়ন) টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ড ঘটে গত ২৮ মার্চ। ২২ তলা এই ভবনটির অষ্টম তলা থেকে বেলা ১টায় আগুনের সূত্রপাত হয়, যা পরে অন্যান্য তলাতেও ছড়িয়ে পড়ে। আগুন থেকে বাঁচতে ভবন থেকে লাফিয়ে নিচে পড়ে মারা যান কয়েকজন। এ ঘটনায় শেষ পর্যন্ত মোট ২৭ জনের মৃত্যু হয় এবং আহত হয় ৭০ জন।

কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানায় আগুন :
১১ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ উপজেলার চুনকুটিয়ার হিজলতলা এলাকার প্রাইম পেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কারখানায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট দুই ঘণ্টায় চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এই দুর্ঘটনায় আগুনে দগ্ধ হয়ে ২২ জনের মৃত্যু হয়। ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে এখনো মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন আরও দশজন। এর আগে, চলতি বছরের ২৫ এপ্রিলও এই কারখানাটিতে আগুন লাগে। তবে, সে সময় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

গাজীপু‌রে ফ্যান তৈরির কারখানায় আগুন :
সর্বশেষ ১৫ ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজীপু‌র সদর উপ‌জেলার বা‌ড়িয়া ইউনিয়‌নের কেশরিতা এলাকায় লাক্সারি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ফ্যান তৈরির এই কারখানাটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়, অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান ১০ জন। গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ জানান, আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর দুটি ইউনিট গিয়ে দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপর সেখানে ১০ জনের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

আরও কিছু অগ্নিকাণ্ড:

২৬ ডিসেম্বর মিরপুরের কালশীতে বাউনিয়াবাঁধ বস্তিতে দিবাগত রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে আগুন লাগে। শুরুতে ফায়ার সার্ভিসের ৬টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। পরে পর্যায়ক্রমে মোট ১১টি ইউনিটের চেষ্টায় রাত দুইটার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুনে বস্তির বেশির ভাগ ঘর পুড়ে গেছে।

২৬ ডিসেম্বরই দিবাগত রাত ১টা ৩০ মিনিটে কামরাঙ্গীচরের লোহার ব্রিজ ঢাল এলাকার একটি প্লাস্টিক কারখানায় আগুনের ঘটনা ঘটে। প্রায় দেড় ঘন্টা চেষ্টার পর রাত ২টা ৫৭ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পেছনের কারণ হিসেবে বারবার উঠে এসেছে সচেতনতার অভাব এবং ত্রুটিপূর্ণ ভবন ব্যবস্থার কথা। গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বহুতল ভবন ও কারখানার প্রায় ৯০ শতাংশেরই অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকার তথ্য। আগুন ঝুঁকিতে থাকা বাসভবন ও কারখানার তালিকা করা হলেও সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি এখন পর্যন্ত। তাই লাশের মিছিল আর কত দীর্ঘ হলে আমাদের মরচে ধরা টনক নড়বে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

© ২০২১ সময় টিভি মিডিয়া নেটওয়ার্ক
সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
DMCA.com Protection Status
সময় মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
Somoy Tv App PlayStore Somoy Tv App AppleStore
ফলো সামাজিক সময়