সম্পূর্ণ নিউজ সময়
মহানগর সময়
৮ টা ৫৫ মিঃ, ২৩ জুন, ২০১৯

রাজধানীতে ভয়াবহ হয়ে উঠছে ডেঙ্গু, দু’দিনে ভর্তি ৯১ জন

বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই লাগামহীন হয়ে উঠেছে ডেঙ্গু। আষাঢ়ের প্রথমে বৃষ্টির পরেই রাজধানীতে মিলছে ডেঙ্গুর বাহক এডিসের লার্ভার উপস্থিতি। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে রোগীর সংখ্যা। জানা গেছে, গত শুক্র-শনিবারের মধ্যেই এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ৯১ জন মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। নগরবাসীর অসাবধানতা আর অসচেতনতাই এর বড় কারণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 
শতরূপা দত্ত

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের আবহাওয়া অনুযায়ী জুন-জুলাই ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার প্রজনন মৌসুম। এ সময় থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানি জমে যায়। জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার জন্ম হয়।

এ বছর জুনের শুরু থেকে রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে সাতজন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা প্রায় ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এরমধ্যে দুই রোগীর রক্ত পরীক্ষা করে সেরোটাইপ-৩-এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এবার ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে সেরোটাইপ-৩-এর প্রভাব বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার দেশের সামগ্রিক আবহাওয়া ডেঙ্গুর যথেষ্ট উপযোগী। এ রোগ থেকে নিজেকে নিরাপদে রাখতে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি সরকারিভাবে সমীক্ষা চালিয়ে ডেঙ্গুর সেরোটাইপ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। 

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে জানা গেছে, এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ জুন পর্যন্ত নারী-পুরুষ-শিশু মিলিয়ে ৭০৭ জন রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জানুয়ারিতে ৩৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১১৮, মার্চে ১২, এপ্রিলে ৪৪, মে-তে ১৩৯ জন ভর্তি হন। শুধু জুন মাসেই এ পর্যন্ত ৪৪০ জন ভর্তি হয়েছে। অর্থাৎ দিনে গড়ে ১৪ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯ ও ২০ জুন ৯১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ভর্তি রোগীদের মধ্যে এপ্রিলে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। সুস্থ হয়ে ৫৮৭ জন বাড়ি ফিরে গেছেন। গতবছর এ রোগে ৯ হাজার ২২৮ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং ২৪ জনের মৃত্যু ঘটে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক এবং মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. একেএম শামসুজ্জামান জানিয়েছেন, এর আগে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ১ ও ২নং সেরোটাইপের মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটলেও, গতবছর ৩নং সেরোটাইপের দেখা পাওয়া যায়। সেরোটাইপ সম্পর্কে আগে থেকে জানতে পারলে রোগীদের চিকিৎসায় এবং মৃত্যুঝুঁকি রোধে বিশেষ ভূমিকা রাখা সম্ভব। 

জানা গেছে, এবারও ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে সেরোটাইপ-৩-এর প্রভাব বেশি। তাই এ ক্ষেত্রে রোগীদের নিরাপত্তায় সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

চলতি বছর বর্ষার আগে করা জরিপে দেখা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৭ টি আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৫ টি ওয়ার্ড রয়েছে ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে। সিটি করপোরেশন বলছে, রিপোর্ট আমলে নিয়েই ব্যবস্থা নিচ্ছেন তারা। আর এবারে একই সঙ্গে কাজ করবে দুই সিটি।

রোগ প্রতিরোধেও নেয়া হয়েছে প্রস্তুতি। রাজধানী ও এর আশেপাশে ২৮ টি সরকারি ও ৩৬টি বেসরকারি হাসপাতালের ১ হাজার ৩৫০ জন চিকিৎসক ও ১৫৯ জন সেবিকাকে দেয়া হয়েছে ডেঙ্গু চিকিৎসার বিশেষ প্রশিক্ষণ। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে বিকল্প নেই সচেতনতার।

বড় পরিসরে প্রচারণায় শিগগিরই একযোগে মাঠে নামছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, প্রত্যেকটা ডিরেক্টরের কাছে আমরা মেইল ও চিঠি পাঠিয়েছি। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে দ্রুত ডেঙ্গু রোগ শনাক্তকরণের বিশেষ কিট বিতরণ করা হয়েছে। 

তিনি জানান, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ২০১৭ সাল থেকে নিয়মিতভাবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বছরে তিনবার এডিস মশার জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। ২০১৯ সালের ৩-১২ মার্চ পর্যন্ত চালানো জরিপে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বেশকিছু এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব পরিমাপে ব্যবহৃত সূচকের মাত্রা বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের এ জরিপের ফল অনুসারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব সূচক (বিআই) সর্বোচ্চ ৮০ পাওয়া গেছে। 

পুরান ঢাকার দয়াগঞ্জ, নারিন্দা, স্বামীবাগ, গেণ্ডারিয়াসহ আশপাশের এলাকা এবার বৃহত্তর ঢাকা মহানগরীর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত হয়েছে বলেও জানান ডা. সানিয়া তাহমিনা। এরপর ঝুঁকিতে আছে যথাক্রমে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১২নং ওয়ার্ড, ১৭নং ওয়ার্ড, ৪ ও ৩৯নং ওয়ার্ড, দক্ষিণ মুগদাপাড়া ও বাসাবো, মানিকনগর বিশ্বরোড, শেরেবাংলা রোড ও হাজারীবাগ, মগবাজার ও রমনা, সেগুনবাগিচা, শাহবাগ, হাজারীবাগ, ফরাশগঞ্জ, শ্যামপুর, উত্তর যাত্রাবাড়ী ও ৪৮নং ওয়ার্ড।

অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে তেজগাঁও-এ। সেখানে লার্ভার ঘনত্ব সূচক (বিআই) সর্বোচ্চ ৪০ পাওয়া গেছে। এরপর আছে তুরাগ, পল্লবী, বনানী, গুলশান, বারিধারা।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে জ্বরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ বেড়ে যায়। জ্বর ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। তবে, তরুণ ও শিশুদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পরও উপসর্গ দেখা যায় খুবই সামান্য। কখনও বা একেবারেই উপসর্গহীন থাকে। তবে ডেঙ্গুর ভাইরাসবাহী মশা কামড়ানোর চার থেকে সাত দিন পর এসব উপসর্গ স্পষ্টভাবে লক্ষণীয় হয়। 

এ রোগের কিছু সাধারণ উপসর্গ হল- বিরামহীন মাথাব্যথা, হাড়, হাড়ের জোড় ও পেশিতে ব্যথা, বমিভাব ও বমি হওয়া, গ্রন্থি ফুলে যাওয়া, সারা শরীরের ফুসকুড়ি দেখা দেয়া, চোখের পেছনে ব্যথা হওয়া ইত্যাদি। 

এ সময় পর্যন্ত স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং প্রচুর পরিমাণে তরল গ্রহণ করার মাধ্যমে দ্রুত রোগমুক্ত হওয়া যায়। 

এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে ডেঙ্গু সচরাচর সেরে যায়। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়তে পারে। এসব ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। 

ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের উপসর্গ হল- শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা হওয়া কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যাওয়া। ত্বক শীতল হয়ে যাওয়া। অবিরাম অস্বস্তি, ত্বকের ভেতরের অংশে রক্তক্ষরণের কারণে ত্বকের উপরের অংশে লাল ছোপ সৃষ্টি হওয়া। বমি, মল কিংবা প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, প্রচণ্ড পেটব্যথা ও অনবরত বমি হওয়া, নাক ও দাঁতের মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ ও অবসাদ। এ উপসর্গগুলো চোখে পড়লে আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

© ২০২১ সময় টিভি মিডিয়া নেটওয়ার্ক
সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
DMCA.com Protection Status
সময় মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
Somoy Tv App PlayStore Somoy Tv App AppleStore
ফলো সামাজিক সময়