সম্পূর্ণ নিউজ সময়
অন্যান্য সময়
১১ টা ১২ মিঃ, ৬ মার্চ, ২০১৯

ময়ূরপঙ্খী বিমান ছিনতাই, নাকি এক রহস্যের বৃত্ত! (ভিডিও)

সাব্বির সামি মুহিত সকলকে স্বাগত জানাচ্ছি সময়ের অসঙ্গতি অনুষ্ঠানে। বিভিন্ন ধরণের অসঙ্গতিকে তুলে ধরাই আমাদের লক্ষ্য। কাউকে হেয় করা, ছোট করা বা ভালো মন্দ বিচার করা মোটেও আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমারা চাই শুধু অসঙ্গতিটি ধরিয়ে দিতে। আমাদের এবারের পর্বের অসঙ্গতির নাম ‘ময়ূরপঙ্খী বিমান ছিনতাই, নাকি এক রহস্যের বৃত্ত!'
সাব্বির সামি

অসঙ্গতিগুলো দেখাতে চাই কিন্তু তার আগে আপনাদের আরও একবার স্মরণ করিয়ে দেবো কি  ঘটেছিল ফেব্রুয়ারির ২৪ তারিখ রোববার। চলুন দেখে আসি।

২৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৫ টা। ১৩৪ যাত্রী ও ১৪ ক্রু নিয়ে বিজি-১৪৭ ফ্লাইটটি  ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে দুবায়ের পথে শাহজালাল থেকে উড়াল দিলো ময়ূরপঙ্খী, উড়াল দিলো শাহ আমানতের উদ্দেশ্যে। কিছুক্ষণ পরেই ঘটে গেলো অবিশ্বাস্য এক ঘটনা। একজন ছিনতাইকারী জিম্মি কর বসলো বিমানটিকে। তারপর ক্রুদের বুদ্ধিমত্তায় শাহ আমানতে জরুরি অবতরণ ময়ূরপঙ্খীর। স্তব্ধ হয়ে যায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত। পরে খুব দ্রুত সময়ে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে অবসান ঘটে ছিনতাই ঘটনার। আর ছিনতাইয়ের চেষ্টাকারী সেই অভিযুক্তও নিহত হন।

কিন্তু এর পর দায়িত্বশীল বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তি দিতে থাকেন ভিন্ন ভিন্ন সব তথ্য। ছিনতাইকারীর পরিচয় নিয়ে ছিল বিভ্রান্তি। বিমানটি ছিনতাই হয়েছিলো কিনা সেটি নিয়েও দেখা দেয়া প্রশ্ন। আর এতো নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে অস্ত্র বা বোমা নিয়ে প্রবেশ সম্ভব কিনা সেটি নিয়েও দেখা দেয় প্রশ্ন। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, ছিনতাইকারীর হাতে থাকা অস্ত্রটি ছিল খেলনা। কেউ বলেন, তার হাতে কোন অস্ত্রই ছিল না। সেখানে পটকা ফোটানো হয়েছিলো জাতীয় তথ্যসহ বিভিন্ন অসঙ্গতি দেখা যায় বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে।

রোববার রাতে নিহত ওই যুবকের পরিচয় নিয়ে একাধিক তথ্য জানানো হয়,যা নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়। প্রথমে বলা হয়,তার নাম মাহাদী। পরে বলা হয় মো. মাজিদুল। তবে টিকিটে তার নাম মো. মাজিদুল লেখা ছিল বলে জানানো হয়। কিন্তু সোমবার যে তথ্য এলো, তাতে দেখা যাচ্ছে তার নাম মাহাদী ও মাজিদুল কোনটিই নয়, তার নাম মো. পলাশ আহমেদ।

পলাশ আহমদ র‍্যাবের তালিকাভুক্ত অপরাধী। তাকে ২০১২ সালে তরুণী অপহরণের অভিযোগ এবং ৮ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল।তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছিলেন র‍্যাবের লিগ্যাল ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান।

অপরদিকে, সম্পূর্ণ বিপরীত তথ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ জানায়, পলাশকে অপরাধী বা সন্ত্রাসী বলার মতো কোন রেকর্ড তাদের কাছে নেই। তবে সে বাড়িতে কম আসতো এবং ভবঘুরে টাইপের মানুষ ছিল।

বিমান মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, পলাশের হাতে অস্ত্র থাকলে স্ক্যানিং মেশিনে শব্দ হতো। কিন্তু তা হয়নি। অন্য যাত্রীদের মতো পলাশকেও অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের স্ক্যানিং মেশিনে পরীক্ষা করে বিমানে উঠানো হয়েছিল।
তবে প্রত্যক্ষদর্শী অনেকের মতে, বিমান ছিনতাই চেষ্টাকারীর হাতে থাকা পিস্তল দিয়ে গুলি করা হয়েছে। তাতে শব্দও হয়েছে। যদিও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ বলেছে, খেলনা পিস্তলেও শব্দ হয়। আর গুলি হলে এয়ারক্রাফটে চিহ্ন থাকার কথা। কিন্তু সেটি পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ বিমানের একটি উড়োজাহাজ ছিনতাইচেষ্টার লোমহর্ষক ও শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা অবস্থার বর্ণনা করেছেন ফ্লাইটে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী এক কেবিন ক্রু। এ যেন গা শিউরে ওঠা কোন এক হলিউড মুভির কাহিনী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ঢাকা থেকে ফ্লাইটটি টেক অফের ঠিক ১০ মিনিটের মাথায় ১৫ হাজার ফুট উপরে ওঠে যায়।

বিজনেস ক্লাসে বসা ৯ যাত্রী। আন্তর্জাতিক যাত্রী ছিলেন ৫৮ জন। অভ্যন্তরীণ যাত্রী ছিলেন ৭৫ জন। ৫ জন বিদেশি যাত্রীও ছিলেন। ফ্লাইটের ককপিটে ছিলেন ক্যাপ্টেন শফিউল ও ফার্স্ট অফিসার মুনতাসির। কেবিন ক্রু ছিলেন- নিম্মি. হুসনে আরা, সাগর, সাকুর ও বিথী।

আলোচিত যাত্রী পলাশ আহমেদ ওরফে মাহদী নামে বসা ছিল ইকনোমি ক্লাসের ১৭-এ নং আসনে। একজন কেবিন ক্রু দেখতে পান হঠাৎ মাহাদী নিজের আসন ছেড়ে বিজনেস ক্লাসের একটি সিটে বসে নিজের সঙ্গে থাকা হ্যান্ডব্যাগে পিস্তল ও বোমা আছে বলে চিৎকার করতে থাকেন। এ সময় তিনি ককপিটের দরজা খুলে পাইলটের সঙ্গে কথা বলার বায়না ধরেন।

যদি কথা বলতে না দেয়া হয় তাহলে ফ্লাইট বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেন। এ পর্যায়ে কেবিন ক্রুদের একজন তার আড়ালে গিয়ে ককপিটে থাকা পাইলটকে জরুরি কোডে সংকেত পাঠান। এ সময় পাইলট তাকে অত্যন্ত সুকৌশলে ঠাণ্ডা মাথায় মাহদীর কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কথা বলার পরামর্শ দেন।

কেবিন ক্রুরা সেভাবেই হ্যান্ডেল করছিলেন তাকে। এর মধ্যে মাহদী একবার ককপিটের দরজার কাছে গিয়ে পটকা জাতীয় কিছু ফোটান। তাতে বিকট শব্দ হলে যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ সময় কেবিন ক্রুরা তাকে ঘিরে তার সমস্যা জানার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তাকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেয়া হবে বলে আশ্বস্ত করা হয়।

এ ঘটনায় নিহত পশালের জীবন নিয়েও পাওয়া যাচ্ছে নান তথ্য। মাহাদী বাংলাদেশি অভিনেত্রী সিমলার স্বামী বলেও জানা যায়। মাস ৪ আগে তাদের মধ্যে ডিভোর্স হয়েছে বলে স্বীকারও করেছেন নায়িকা সিমলা। আর এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়েছে পলাশ এমনটিই এখন পর্যন্ত ধারণা করা হচ্ছে।

তবে একটি ফেসবুক প্রোফাইলকে পলাশের প্রোফাইল হিসেবে ধরে বেরিয়ে আসে আরও বিভিন্ন তথ্য, মাহাদী নামের এ ফেসবুক প্রোফাইল দেখে জানা যায়, ২০১৮ সালের এপ্রিলে মাসে থেকে পলাশ প্রেমের সম্পর্কে জড়ান ঢাকাই ছবির নায়িকা পলাশের চেয়ে বয়সে প্রায় ১৫-২০ বছরের বড় শিমলার সঙ্গে। ফেসবুকে তাদের দুজনের ঘনিষ্ঠ অসংখ্য ছবিও দেখা যায়।

তবে, ২০১৮ সালের শেষ দিকে তার কিছু ফেসবুকে স্ট্যাটাসে তাদের সম্পর্কের অবনতির কিছু লক্ষণ দেখা গেছে। যেখানে কিছু তার আবেগ ঘন লেখা ছিল। ২০১৯ সালে ২৫ জানুয়ারি নিজের ঘনিষ্ঠ কিছু ছবি দিয়ে বিরহের একটি গান ফেসবুকে নিজের ওয়ালে শেয়ার দেয় পলাশ।

সর্বশেষ, সোমবার দুপুর একটার দিকে 'ঘৃণা নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে'স্ট্যাটাস দিয়ে বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটান।
অভিনেত্রী সিমলাকে বছর খানিক আসে বিয়ে করেছিলেম বলে নিশ্চিত করেন মাহাদী ওরফে পলাশের বাবা পিয়ার জাহান সর্দার নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, সিমলাকে বিয়ে করে বাসায় নিয়ে এসেছিল। বয়সে বড় মেয়েকে বিয়ে করায় বাড়ির লোকজন ক্ষুব্ধ ছিল।

জানা গেছে, বর্তমানে সিমলা ভারতে মুম্বাইয়ে রয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি মুম্বাই থেকে এক ভিডিও বার্তায় তার নিজের অবস্থানটি ব্যাখ্যা করেছেন।

বাংলাদেশের বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ নিয়ে ফলাও কর সংবাদ প্রতারিত হয় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে।

সর্বশেষ তথ্য হচ্ছে,এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। হচ্ছে বিমান ছিনতাই চেষ্টার ঘটনায় নিহত হওয়া পলাশ আহমদের হাতে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না। মামলার বিবরণ অনুযায়ী তাঁর হাতে ছিল একটি খেলনা পিস্তল। বিমানের ভেতর আলামত সংগ্রহ করতে যাওয়া সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন,ভেতরে দুটি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। একটি গুলি ককপিটের দরজা ভেদ করে ইলেকট্রিক প্যানেলে লেগেছে। আরেকটি বিজনেস ক্লাসের পার্টিশন ভেদ করে কেবিনেটে লেগেছে। প্রশ্ন উঠেছে,তাহলে এসব গুলি এলো কী করে?

তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ ঘটনায় তিনি পলাশের সাবেক স্ত্রী সামসুন নাহার সিমলা ও পলাশের বাবা–মাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।

গত রোববারের বিমান ছিনতাইচেষ্টার ঘটনায় সোমবার রাতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের প্রযুক্তি সহকারী দেবব্রত সরকার বাদী হয়ে পতেঙ্গা থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় গুলিতে নিহত পলাশ আহমদের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট মামলাটি তদন্ত করছে। তারা মামলার আলামত হিসেবে খেলনা পিস্তল, বোমাসদৃশ বস্তু, বিমান, নিহত পলাশের জামাকাপড়সহ ১৫টি বস্তু জব্দ করে।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিট চট্টগ্রামের প্রধান উপ-কমিশনার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ গতকাল দুপুরে তাঁর কার্যালয়ে প্রথম আলোকে বলেন, সেদিন বিমানটির ভেতর কী হয়েছিল তা জানার জন্য ব্ল্যাক বাক্স, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রীদের বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে। কী উদ্দেশ্যে পলাশ ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেছিলেন, তা জানার জানার চেষ্টা চলছে।

এসব দেখে শুনে কি মনে হয় আপনাদের। এ ধরণের অনাকাঙ্খিত বিষয় মোকাবেলায় আরও বেশি সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে সংশ্লিষ্ট সকলকে। আজ এখানেই বিদায় নিচ্ছি দেখা হবে আগামীতে নতুন কোন পর্বে নতুন কোন অসঙ্গতিকে সঙ্গে করে। ততক্ষণ পর্যন্ত বিবেকের জানালাটি উন্মুক্ত রাখুন, ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন আর সঙ্গে থাকুন সময়ের।

© ২০২১ সময় টিভি মিডিয়া নেটওয়ার্ক
সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
DMCA.com Protection Status
সময় মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
Somoy Tv App PlayStore Somoy Tv App AppleStore
ফলো সামাজিক সময়