SomoyNews.TV

Somoynews.TV icon মহানগর সময়

আপডেট- ০৫-১১-২০১৭ ১৩:৩০:১৭

নিষ্ঠুরতা থামাতে দরকার কী?

social-responsibility

আর্থিক বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য, পারিবারিক কলহ কিংবা পরকীয়ার মতো ঘটনায় সমাজে অপরাধ ক্রমেই বাড়ছে। শিশু ও নারীরা এর মূল শিকার হলেও কিছুক্ষেত্রে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন নারীরাও। আবার বাবা-মায়ের হাতে কিংবা তাদের মদদেও খুন হচ্ছে সন্তান। সামান্য কারণেও খুনোখুনির এমন ঘটনাগুলোকে সমাজের চরম বিশৃঙ্খলা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় হিসেবে দেখছেন সমাজ বিজ্ঞানীরা। সুশাসন, আইনের শাসন, সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই অবস্থার উত্তরণ ঘটানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

১ নভেম্বর রাজধানীর উত্তর বাড্ডার ৩০৬ নম্বর নিজ বাসায় খুন হন জামিল শেখ নামে এক ব্যক্তি ও তার মেয়ে নূসরাত। জামিল শেখের স্ত্রী আরজিনা বেগমের মদদেই শাহীন নামের এক ব্যক্তি ওই হত্যাকাণ্ড ঘটান বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে। হত্যার অভিযোগে পুলিশের হাতে গ্রেফতারের পর অভিযুক্তরা জানান, প্রথমে পরিকল্পনা ছিল শুধুমাত্র জমিলকেই হত্যা করা। কিন্তু নূসরাত তার বাবাকে হত্যার ঘটনা দেখে ফেলায় তাকেও হত্যা করা হয়। এবং এই দুই হত্যায়ই নূসরাতের মা আরিজিনার সমর্থন ছিল।

অন্যদিকে আর্থিক বিষয় নিয়ে মনোমালিন্যের পর একই দিন রাজধানীর কাকরাইলে মা-ছেলেকে হত্যা করেন করিম নামের এক ব্যক্তি। আর্থিক বিষয়ে মনোমালিন্য ও পারিবারিক কলহের কারণেই তাদের হত্যা করা হয় বলে জানান র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান।

সম্প্রতি বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার মাসিক পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় দেখা যায়, গত অক্টোবর মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৪ জন নারী ও শিশু । এদের মধ্যে শিশু ২৮ জন। ২৭ জন নারী। ১৭ জন নারী গণ ধর্ষণের শিকার হন ও ২ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এছাড়া গতমাসেই হত্যা করা হয় ৩০ শিশুকে। এদের মধ্যে মা-বাবার হাতে নিহত হয় পাঁচজন। সাভারে দেড় বছরের এক শিশুকে লাথি মেরে হত্যা করে পাষণ্ড পিতা। নরসিংদীতে ১৫ বছরের এক শিশুকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে তার চাচী।

একই মাসে পারিবারিক কলহে নিহত হন ৪২ জন, যার মধ্যে ১২ জন পুরুষ ও নারী ৩০ জন। এদের মধ্যে স্বামীর হাতে নিহত হন ২৭ জন নারী। সামাজিক অসন্তোষের শিকার হয়ে এই অক্টোবরে নিহত হয়েছেন ১১ জন। আহত হয়েছেন ২৯৭ জন। গতমাসে সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছেন ৮৬ জন।

সাধারণ মানুষের মধ্যে যে শুধু ‘মূল্যবোধের অবক্ষয়’ হয়েছে এমনটা নয়। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও জড়িয়ে পড়ছেন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। খোদ বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রক্টর লাথি দিয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দিনকে লাথি দিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সমাজের সকল শ্রেণির মধ্যেই করে অপরাধের মাত্রা বাড়ার কারণ হিসেবে পুলিশের সাবেক মহা-পরিদর্শক নুরুল হুদা সময় নিউজকে বলেন, মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক অসন্তুষ্টি অপরাধ বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। তাদের মধ্যে আয়ের পরিমাণ কমে যাওয়ায় এবং দারিদ্র বেড়ে যাওয়ায় সমাজে ক্রমাগত অপরাধ বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, মানুষের মধ্যে বৈষম্য, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা ও সংস্কৃতির বিরূপ প্রভাবেও বাড়ছে অপরাধের মাত্রা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞাপন অনুষদের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলাম খান এ বিষয়ে বলেন, সমাজে সব শ্রেণির মধ্যেই অপরাধের মাত্রা বাড়ছে। এর মধ্যে কিছু অপরাধ পরিকল্পিত এবং কিছু ঘটনা ঘটছে আকস্মিকভাবে। আকস্মিকভাবে যেসব ঘটনা ঘটছে সেক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব রয়েছে। অন্যদিকে পরিকল্পিত হত্যার পিছনে কিছু উদ্দেশ্য থাকছে। আর উদ্দেশ্য নিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটলে বুঝতে হবে আমরা ঠিক পথে নেই।

তিনি বলেন, একটা হত্যাকাণ্ডের অনেকগুলো দিক থাকে। মনস্তাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সংস্কৃতির বিরূপ প্রভাবে হচ্ছে এসব অপরাধের পিছনের অন্যতম প্রধান কারণ। 

তবে মানুষের অপরাধ প্রবণতার ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক প্রভাব খুব একটা নেই বলে মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের গণমাধ্যম বিষয়ক অধ্যাপক ও কালচারাল স্টাডিজের গবেষক সুমন রহমান। তিনি সময় নিউজকে বলেন, সংস্কৃতির কিছুটা প্রভাব সমাজে থাকলেও সেটা মানুষকে যে অপরাধের দিকে ধাবিত করে এমনটা সরাসরি বলা যাবে না। বিশ্বের অনেক দেশেই উপন্যাস ও সিনেমায় সিরিয়াল কিলিং ও ক্রাইম থ্রিলার দেখানো হয়। এজন্য সেসব দেশে এমন অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধি পায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড রিগ্যানের হত্যাচেষ্টার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, রিগ্যানকে হত্যাচেষ্টাকারী ব্যক্তি নিজেই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন যে তিনি ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ দেখেই এভাবে হত্যাচেষ্টায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তবে এজন্য তো আর সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশকে থামিয়ে দেয়া যাবে না। আর শিল্প –সংস্কৃতি সবসময় সমাজের আদর্শের জায়গা নিয়েও বসে থাকবে না। তার কাজ শুধু সমাজের আদর্শিক জায়গাগুলোতে শিক্ষা দেওয়াই নয়। সংস্কৃতি তার নিজস্ব গতিতে এগুবে।

তবে সামাজিক শৃঙ্খলার অভাব, মানুষের অর্থ সম্পদ কমে যাওয়া, সম্পদের অপ্রাতিষ্ঠানিক মালিকানা, দরিদ্রতা, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই সমাজে অপরাধ বাড়ছে বলে মনে করেন সুমন রহমান।

সমাজে ঘটমান এসব অপরাধের ফলাফল খুবই ভয়াবহ বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ এহসান হাবিব।

তিনি বলেন, গণমাধ্যমের বরাতে আমাদের শিশু-কিশোররা এসব অপরাধ সম্পর্কে জানছে। সমাজে এসব অপরাধ কর্মকাণ্ডের ফলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা এসব অপরাধ শিখছে এবং এতে ভবিষ্যতে তাদের অপরাধে জড়িয়ে যাবার আশংকা বাড়ছে।

‘অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এসব অপরাধের প্রতি কম নজরদারি এবং বিচারহীনতার কারণেও অপরাধের মাত্রা আরও বাড়বে। এই কারণগুলো মানুষকে অপরাধ করতে উদ্ভুদ্ধ করবে। এসব ঘটনা ভবিষ্যতে অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।’ বলেন ড. এহসান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের সহকারি অধ্যাপক মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী এ বিষয়ে সময় নিউজকে বলেন, পশ্চিমা বিশ্বে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি হত্যার ঘটনা ঘটছে। তবে সেগুলোর মূল কারণ হচ্ছে পরিবারহীনতা। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ পরিবারের মধ্যে থেকেও অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। এর অন্যতম মূল কারণ সুশাসন ও আইনের শাসনের অভাব।

তিনি বলেন, সমাজের শাসন ব্যবস্থা যতটা ভালো হবে সেই সমাজে ততটা শান্তি বিরাজ করবে। তাই আমাদের সমাজে এ দুটি বিষয় আগে নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে নৈরাজ্য ও বিচারহীনতার কারণে ঘটা অপরাধগুলো বন্ধ হবে।

সাজ্জাদ হোসেন আরো বলেন, ‘অন্যদিকে লোভের কারণে যেসব অপরাধের ঘটনা ঘটছে সেগুলো কমাতে দরকার সামাজিক কাঠামোগত পরিবর্তন। সমাজ কাঠামোর প্রত্যেকটা স্তরে পরিবর্তন এনে এবং সেখানে প্রতিষ্ঠানিকভাবে মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া গেলে এই অপরাধগুলোও কমবে’।