SomoyNews.TV

Somoynews.TV icon মহানগর সময়

আপডেট- ১৩-১০-২০১৭ ১৭:০৯:৩৪

‘প্রচারণার উদ্দেশ্যে’ই ডিম মেলা, ‘প্রতারিত’ সাধারণ মানুষ

eggs258

‘বিশ্ব ডিম দিবস-২০১৭’ উপলক্ষে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আয়োজনে শুক্রবার রাজধানীর খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণে ডিম মেলার আয়োজন করা হয়। ওই মেলায় তিন টাকা পিস মূল্যে ডিম বিক্রির ঘোষণা দেওয়া হয় কয়েকদিন আগে থেকেই। আয়োজকদের প্রচারণার কৌশল এতটাই শক্ত ছিল যে দেশ ছাপিয়ে বিদেশি গণমাধ্যমেও প্রকাশিত ওই তিন টাকায় ডিম বিক্রির এ সংবাদ। তবে শুক্রবার ডিম কিনতে যাওয়া ব্যক্তিদের অভিযোগ, ডিম বিক্রির জন্য নয় বরং প্রচারণার উদ্দেশ্যেই এত ফলাও করে প্রচার করা হয় তিন টাকায় ডিম বিক্রির সংবাদ। গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বে প্রচারণার মাধ্যমে লোকজনকে ডাকা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই না।

বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে মাত্র ১২ টাকা হালিতে ডিম বিক্রির ঘোষণা দিয়ে আয়োজকরা জানান, মেলার দিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রতিটি ডিম মাত্র ৩ টাকায় বিক্রি হবে। আগে এলে আগে পাবেন ভিত্তিতে এ ডিম বিক্রি করা হবে। একজন সর্বোচ্চ ৯০টি ডিম কিনতে পারবে।

ডিম মেলার বিষয়ে এমন ঘোষণা দিয়ে আয়োজক কর্তৃপক্ষ নানাভাবে প্রচারণা চালাতে থাকেন। পোস্টার থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও পাঠান আয়োজকরা। দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমসহ বিদেশের গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয় এই সংবাদ। খোদ ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায়ও এ সংবাদ প্রকাশিত হয়। ডিম মেলায় যাওয়া নিয়ে খোলা হয় ইভেন্টও। এসব ঘটনা থেকে আগে থেকেই আঁচ করা গিয়েছিল ডিম মেলায় বিপুল পরিমাণ সাড়া পাওয়া যাবে।

ডিম মেলায় কম দামে ডিম কিনতে অনেক সাধারণ মানুষও আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকাতে চায়ের দোকানে কয়েকজনকে এ বিষয়ে আলোচনাও করতে দেখা গেছে। সকালে খুব তাড়াতাড়ি উঠে মেলায় আসতে হবে বলে আলোচনা করছিলেন তারা। এমন ভাবনা থেকে মেলার দিন খুব ভোরেই মেলা প্রাঙ্গণে জড়ো হন সাধারণ মানুষ। সকাল ১০টায় মেলা শুরুর সময় নির্ধারণ করা হলেও ভোর পাঁচটা থেকেই মেলা প্রাঙ্গণে জড়ো হন সাধারণ মানুষ। 

এত ভোরে মেলায় আসার কারণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে ইকবাল হোসেন নামের এক ব্যক্তি সময় নিউজকে বলেন, ‘যেভাবে কর্তৃপক্ষ মেলার প্রচারণা চালিয়েছেন তাতে মেলায় প্রচণ্ড ভিড় হবে। তারা যেহেতু আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে ডিম বিক্রির ঘোষণা দিয়েছেন সেহেতু প্রচুর লোকের সমাগম হবে’।

সাধারণ মানুষের এমন ধারণার চাইতেও বেশি ছিল মেলায় সাধারণের উপস্থিতির সংখ্যা। এদিন সর্বোচ্চ ৯০টি করে ডিম দেওয়ার কথা থাকলেও মানুষের চাপ দেখে আয়োজকদের পক্ষ থেকে প্যাকেট করা হয় ২০টি করে। হুড়োহুড়ি আর ধাক্কাধাক্কিতে ডিম দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয় মিনিট দু-একের মধ্যেই। ধাক্কাধাক্কিতে একপর্যায়ে ডিম বিতরণের জন্য তৈরি অস্থায়ী মঞ্চ ভেঙে পড়ে।

তবে মেলায় গণ্ডগোল পাকানোর জন্য আয়োজক কর্তৃপক্ষকেই দায়ী করেছেন মেলায় আসা কয়েকজন। নারায়ণগঞ্জ থেকে ডিম কিনতে আসা ওবায়দুর নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘প্রচুর ভিড় হবে সেটা আগেই বুঝেছিলাম, সে কারণেই খুব ভোরে মেলায় চলে আসি। কিন্তু মেলা কর্তৃপক্ষের মধ্যে ডিম বিতরণের কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। তারা শুধুমাত্র নিজেদের প্রচারণা চেয়েছিলেন। নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য তারা মেলায় হট্টগোল পাকিয়ে সকল কিছু পণ্ড করে দিয়ে আমাদের হয়রানি করেছেন’।

আনিসুর রহমান নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘যেহেতু আগে থেকেই ঘোষণা ছিল যে আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে ডিম বিতরণ করা হবে সেহেতু যে পরিমাণ ডিম ছিল তা বিতরণ করলেই চলত। কিন্তু তারা কোনো ডিমই বিতরণ করেননি। নিজেদের প্রচারণার জন্য উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এমনটা করা হয়েছে। গণ্ডগোলের জন্য তারাই দায়ী। আর যদি তারা গণ্ডগোল না বাধান তবে তাদের সামর্থ্য নেই এই আয়োজন করার। সামর্থ্য না থাকলে মিডিয়ায় ঢোল পিটিয়ে আমাদের ডেকে কেন প্রতারণা করা হলো’।

সাধারণ মানুষ ডিম মেলার ভিড় সম্পর্কে আগে থেকেই অনুমান করতে পারলেও কর্তৃপক্ষ বলছে তাদের ধারণার চাইতেও মেলায় সাধারণের সমাগম বেশি ছিল। আয়োজক বিপিআইসিসির সভাপতি মসিউর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের প্রস্তুতি যেমন ছিল, তার থেকে অনেক বেশি ভিড় হয়েছে।

নিজেদের হাতে ১ লাখ ডিম ছিল বলে দাবি করে তিনি বলেন, আমরা এটা ব্যর্থতা মনে করি না, এটা আমাদের সফলতা। পরিস্থিতির কারণে আমরা ডিম বিক্রি বন্ধ করেছি। তবে মেলায় মাত্র ২০ হাজার ডিম আনা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন আয়োজকদের কেউ কেউ। আর মেলায় লোক সমাগম ছিল ৪০ থেকে ৫০ হাজার।

তবে এই মেলার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র নিজেদের প্রচারণাই ছিল কিনা এমন বিষয়ে জানতে মসিউর রহমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তবে সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও মিডিয়াতে ঢোল পিটিয়ে লোকজনকে ডাকা প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয় বলে মনে করেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শেখ শফিউল ইসলাম।

তিনি সময় নিউজকে বলেন, ‘যখন সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রতিষ্ঠান মিডিয়াতে কোনো বিষয় প্রচার করে তা সঠিকভাবে শেষ করতে পারে না তখন বোঝা যায় যে তারা নিজেদের বাহবা পাওয়ার জন্যই এমন কাজ করেছে। নিজেদের প্রচারণার জন্য এই মিথ্যা চেষ্টা সম্পূর্ণ অনৈতিক কাজ এবং এটা লোকজনের সঙ্গে প্রতারণা’।

এ ধরণের কাজ করলে ওই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে লোকজনের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এমন কাজ কোনো প্রতিষ্ঠানের নিকট হতেই কাম্য নয়, আর সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে তো এ ধরণের কাজ কোনোভাবেই আশা করা যায় না’।

এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র ইনফরমেশন অফিসার শাহ আলম বাদশা সময় নিউজকে বলেন, ‘মেলা মানেই প্রচারণা। যেহেতু এই মেলায় কম দামে ডিম বিক্রির কথা ছিল সুতরাং লোকজনকে মেলা সম্পর্কে জানানো আমাদের উদ্দেশ্য ছিল’।

তবে এই বিপুল পরিমাণ প্রচারণার ফলে লোকজনের প্রতারিত হওয়ার বিষয়ে নিজে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেখিয়ে দেন বাদশা।

প্রতিবেদকঃ মেহেদী হাসান।