SomoyNews.TV

Somoynews.TV icon মহানগর সময়

আপডেট- ১২-০২-২০১৮ ১৩:৫৬:১৫

‘যুক্তিহীন’ সিদ্ধান্তে বন্ধ হবে না প্রশ্নপত্র ফাঁস

exa-news

ইন্টারনেট, ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যম কিংবা কোচিং সেন্টার বন্ধ করে কোনোভাবেই প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা সম্ভব নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যেহেতু ইন্টারনেটে প্রশ্নপত্র আপলোড করে রাখে না, কোচিং সেন্টারের মালিকরা যেহেতু প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেন না তাই এগুলো বন্ধ করলে কোনোভাবেই বন্ধ হবে না প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া। আর এসব বিষয় বুঝে কিংবা না বুঝে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন সব ‘উল্টাপাল্টা-যুক্তিহীন’ সিদ্ধান্ত নেয়ার মূল উদ্দেশ্য প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ নয়, বরং জাতির চোখ অন্যদিকে ঘোরানো; এমনটাই মনে করেন শিক্ষাবিদরা।

অন্যদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারিদের দুর্নীতি বন্ধ, ইন্টারনেটে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়লে দোষীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা এবং যথোপযুক্ত পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমেই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন তারা।

 

বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন নুরুল ইসলাম নাহিদ। এরপর থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এতটাই মারাত্মক যে শুধুমাত্র মাধ্যমিক কিংবা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা নয় বরং ফাঁস হয় প্রাথমিক শিক্ষার প্রশ্নপত্রও। এগুলো কোনোভাবেই বন্ধ করতে না পেরে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একের পর এক ‘অগ্রণযোগ্য’ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে কোনো সিদ্ধান্তেই ঢাকা যায়নি শিক্ষামন্ত্রী কিংবা মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা।

চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষা শুরুর আগে শিক্ষামন্ত্রী প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন। প্রশ্নপত্র ফাঁস এতটাই মহামারি আকার ধারণ করেছে যে এটাকে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া হিসেবে বর্ণনা করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পরীক্ষা শুরুর তিন দিন আগে থেকে পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ থাকবে।

মন্ত্রণালয়ের ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৬ জানুয়ারি শুক্রবার থেকে বন্ধ করে দেয়া হয় দেশের সব কোচিং সেন্টার। তবে ওই সিদ্ধান্তের পরও শিক্ষামন্ত্রীর ব্যর্থতা ঢাকা যায়নি।

এরপর আসে শিক্ষামন্ত্রীর নতুন ‘তত্ত্ব অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা’।

পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগের দিন ৩১ জানুয়ারি শিক্ষামন্ত্রী বলেন, কাল থেকে শুরু হওয়া এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সীমিত সময়ের জন্য ফেসবুক বন্ধ রাখা যায় কি না, সে বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেবে।

তবে সেই অবস্থা আর ‘বুঝে উঠতে না পারায়’ বন্ধ করা হয়নি ফেসবুক।

তবে সর্বশেষ গেল রোববার নতুন সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রণালয়। ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধের এক ‘অভিনব’ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

ওই সিদ্ধান্তে বলা হয়, আগামী সবগুলো এসএসসি পরীক্ষায় সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত আড়াই ঘণ্টা ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে রাখা হবে। আর এই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে রাত ১০ থেকে সাড়ে দশটা পর্যন্ত আধাঘণ্টা পরীক্ষামূলকভাবে দেশের সব ইন্টারনেট প্রোভাইডারের ব্যান্ডউইথ প্রতি সেকেন্ড ২৫ কিলোবিটের মধ্যে সীমিত রাখা হয়।

সোমবার সকাল আটটার দিকে ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেয়া হলেও পরবর্তীতে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়। সকালেই বিটিআরসি থেকে মেইল করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়ে দেয়া হয় সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের কথা।

তবে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে এখন পর্যন্ত যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সেগুলোকে ‘অগ্রণযোগ্য - অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছেন সাধারণ মানুষ।

শাহাদ রাজু নামের এক ব্যক্তি বলেন, সরকার যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেগুলোর কোনোটি দ্বারাই প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা সম্ভব নয়। কারণ কোচিং সেন্টার, ফেসবুক কিংবা ইন্টারনেট; এর কোনোটিতেই সরকার প্রশ্নপত্র রেখে দেয় না যে এর মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস হতে পারে। এসব উল্টাপাল্টা সিদ্ধান্ত বাদ দিয়ে সরকারের উচিত এর সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা।

সাইফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি বলেন, প্রশ্নফাঁস বন্ধ করতে না পেরে সরকার একদিকে যেমন শিক্ষার্থী তথা জাতির ভবিষ্যতের ক্ষতি করছে তেমনি নানা উদ্ভট সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাদেরও ক্ষতির মুখে ফেলছে। ইন্টারনেট বন্ধের যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছিল তাতে দেশে যারা ফ্রিল্যান্সিং করেন তারা বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হতেন।

প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধে সরকারের নেয়া পদক্ষেপগুলোর বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ প্রথমেই উদাহরণ হিসেবে টানেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘জুতা আবিষ্কার’। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এ অধ্যাপক কবিতার কাহিনীর সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধে সরকারের নেয়া পদক্ষেপগুলোর মিল দেখাচ্ছিলেন। হাসির পাশাপাশি তার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসছিল ‘বিরক্তি’র সুর।

তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে জাতি আজ যে অবস্থায় গেছে তাতে আমরা খুবই বিরক্ত। এর সমালোচনার আর কোনো ভাষা নেই। সরকার যে সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছে সেগুলো খুবই হাস্যকর। প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধে সরকার ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নিলো। ইন্টারনেটে কি প্রশ্নপত্র থাকে? প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে হয়তো প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধ করা মানে কি প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হয়ে গেল।

বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এ অধ্যাপক আরও বলেন, শুধুমাত্র ইন্টারনেট নয়, প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে আগেও যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সেগুলোও ফাঁস রোধে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না। কোচিং সেন্টার বন্ধ, ফটোকপি দোকানের ওপর নজরদারি, ফেসবুক কিংবা ইন্টারনেট বন্ধ করে এসব হবে না। 

সরকারের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে  শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী এসবকে হাস্যকর বলে উল্লেখ করেন। বলেন, সরকারকে কারা এসব সিদ্ধান্ত নেয়ার পরামর্শ দেন সে বিষয়টিই বোধগম্য নয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস কীভাবে বন্ধ করা যাবে সে বিষয়টির প্রতি নজর না দিয়ে এমন সব সাধারণ বিষয় নিয়ে কাজ করছে যাতে মনে হচ্ছে উদ্দেশ্যটা মূলত প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো নয়, বরং জনসাধারণের চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়া।

ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্তের বিষয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র তো আর ইন্টারনেটে থাকে না। প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী চক্রগুলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে দেয়। সরকারের উচিত ইন্টারনেট বন্ধ না করে যারা এভাবে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে দিচ্ছে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা।

এ বিষয়ে প্রযুক্তিবিদ সালাউদ্দিন সেলিম বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে ইন্টারনেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত এক ধরনের মূর্খতা। ইন্টারনেট বন্ধ রাখলে মিনিটে কত কোটি টাকার যে ক্ষতি হয় সে বিষয়ে কোনো জ্ঞান নেই এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের। কোনো কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা ছাড়া কোনোভাবেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া সম্ভব নয়। বিষয়টাতো এমন নয় যে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইন্টারনেটে প্রশ্নপত্র রেখে দেন আর ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা সেটা কোনোভাবে নিয়ে ছড়িয়ে দেন।

তিনি আরও বলেন, ইন্টারনেটে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় না, ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র নির্দিষ্ট একটি মহল ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। সেই চক্রটিকে আগে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। মূল হোতাদের আইনের আওতায় না এনে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়ার মতো সিদ্ধান্ত কীভাবে নেয়া হয়?

কেউ কটূক্তি করে ফেসবুকে মন্তব্য করলে তাকে মুহূর্তের মধ্যেই আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারলেও যারা প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে দিচ্ছেন তাদের কি আইনের আওতায় আনা সম্ভব নয়? এমন প্রশ্ন রেখে সেলিম বলেন, ইন্টারনেট বন্ধ না করে সরকারের উচিত যারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছেন তাদেরকে আটক করতে হবে। এজন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে নজরদারি বাড়াতে হবে। তারও আগে আইনের আওতায় আনতে হবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

প্রশ্নপত্র ফাঁস কীভাবে বন্ধ করা সম্ভব এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক কায়কোবাদ বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করতে হলে আগে কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। এরপর প্রশ্নপত্র বিতরণ পদ্ধতি এমনভাবে করতে হবে যেন পরীক্ষা শুরুর কিছু সময় আগে পর্যন্ত কেউই প্রশ্নপত্র দেখতে না পান।

একই প্রশ্নের জবাবে মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, প্রশ্নপত্রের সেটগুলো বিভিন্নভাবে বিতরণ করা যেতে পারে। একই মাধ্যম দিয়ে সকল প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হলে কোনো একটি ফাঁস হলেই সবগুলো চক্রের হাতে চলে যাবে। এছাড়া প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়ে ফাঁস রোধ করা সম্ভব।