আপডেট
১৩-০৪-২০১৫, ০৪:৫৪

‘তেলুগু’দের কি একটু সুযোগ দেয়া যায় না?

telegue-2
তেলুগু একটি দ্রাবিড় জাতি। বাংলাদেশে প্রায় দেড়শ বছর পূর্বে তেলেগুদের একটি বড় অংশ আসে। তারও পূর্বে তেলুগুদের অস্তিত্ব এই ভূখণ্ডে ছিল বলে ধারণা করা হয়।
প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে অস্ট্রিকদের সমকালে দ্রাবিড়দের বসতি ছিল। পরে দ্রাবিড়রা ছড়িয়ে পড়ার পরও একটি ক্ষুদ্র অংশ ছিল। বাংলাদেশে তেলুগুদের একটি অংশ তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করছে বলে মনে করা হয়।

কথিত আছে ব্রিটিশ আমলে উনবিংশ শতাব্দীতে চা বাগান, সিটি করপোরেশন ও রেলওয়েতে কাজের জন্য ব্রিটিশরা পর্যাপ্ত দক্ষ বাঙালি শ্রমিক না পেয়ে দক্ষিণ ভারতীয়দের নানান সুযোগ-সুবিধার কথা বলে প্ররোচিত করে এদেশে নিয়ে আসে। তৎকালীন সময়ে দক্ষিণ ভারতে অর্থনৈতিক মন্দা ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল তাই দু'বেলা দু'মুঠো ভাতের আশায় ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য তেলুগুরা এদেশে পাড়ি জমায়।

হিন্দি এবং বাংলার পর তেলুগুই ভারতের সর্বোচ্চ ব্যবহৃত ভাষা। তেলুগু ভাষায় ৬০টি বর্ণমালা আছে। এগুলোর মধ্যে ৪১টি স্বরবর্ণ, ১৬টি ব্যঞ্জনবর্ণ ও ৩টি পরিবর্তনকারী বর্ণ রয়েছে।  সারাবিশ্বে প্রায় ৯০ মিলিয়ন মানুষ তেলুগু ভাষায় কথা বলে। তেলুগু ভাষার ইতিহাস ও সাহিত্য অন্যান্য ভাষা থেকে বেশ সমৃদ্ধ।

প্রতি বছর ২৯ আগস্ট তেলুগু ভাষা দিবস পালন করা হয়। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে আঞ্চলিকতার প্রভাব হোক বা অন্য কোনো কারণেই হোক বাংলাদেশে বসবাসকারী তেলুগুরা কেউই শুদ্ধ তেলুগু বলতে পারে না।

ঢাকার সায়েদাবাদ সিটিপল্লি, টিকাটুলি কলোনি, গোপীবাগ, কল্যাণপুর, সিলেটে বিভিন্ন চা বাগান ও ঈশ্বরদী রেলওয়ে কলোনিতে তেলুগুরা বাস করে আসছে। অন্যান্য আদিবাসীর মতোই তেলুগুদেরও নিজস্ব ভূমি নেই। সিলেটে বসবাসকারী তেলুগুরা চা শ্রমিকের কাজ করে। পাবনার ঈশ্বরদীতে বাসকারী তেলুগুরা রেলওয়ের বিভিন্ন নিম্নপেশায় জড়িত আর ঢাকায় অবস্থানকারী তেলুগুরা ঢাকা সিটি করপোরেশনের সুইপারি, ঝাড়ুদারি ইত্যাদি নিম্নশ্রেণীর পেশায় যুক্ত।
কর্মব্যস্ত দিনের পরে পরেরদিন সকালে আবর্জনামুক্ত যে ঢাকা আমরা দেখি তা অনেকাংশে তেলুগুদেরই অবদান। ঢাকার তেলুগুরা এই কাজটি করে আসছে বহুবছর আগে থেকে।


১৮৬৪ সাল থেকে ঢাকা সিটি করপোরেশন স্থাপন হবার পরপরই। একটা জাতি কয়েকশ বছর ধরে দিনের পর দিন একটা শহরকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করছে, চা বাগানের উঁচু-নিচু টিলায় প্রচণ্ড রোদে কিংবা তীব্র ঝড়-বৃষ্টিতে কাজ করছে। জীবিকার তাগিদে সমাজের নিম্নতম কাজটি বেছে নিতেও যারা কুণ্ঠিত বোধ করেনি। তারা আজ কিভাবে আছে? কেমন আছে? রাষ্ট্রকি তাদের প্রতি কতটা আন্তরিক? এর উত্তর জানতে হলে অবশ্যই আপনাকে সায়েদাবাদ সিটিপল্লি, গোপীবাগ রেলওয়ে সংলগ্ন বস্তি কিংবা টিকাটুলী রাজধানী মার্কেট সংলগ্ন কলোনি বা সিলেটের চা বাগানগুলোতে যেতে হবে।

জীবন কতটা নিষ্ঠুর সেটা এই সব এলাকায় বসবাসকারী তেলুগুরা কয়েকশ বছর ধরে জানে। মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এই জাতির পাশে দলিত, বঞ্চিত বা নিপীড়িত কোনো বিশেষণই যেন মানানসই নয়। তেলুগুরা ভালো বাংলায় কথা বলতে পারে না। নিজেদের অনেক চাওয়া-পাওয়া আর অতৃপ্তিগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে বলা বা প্রতিবাদের ভাষা তেলুগুরা এখনো শিখতে পারেনি। হয়তো এটাই একমাত্র কারণ হতে পারে।  

তেলুগুদের শিক্ষার অবস্থা খুবই করুণ। হাতেগোনা কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও ঝড়েপড়া শিক্ষার্থীর হার বেশি। এর পেছনে অর্থনৈতিক কারণ ছাড়াও অন্যতম প্রধান কারণ বাংলা ভাষায় পড়াশুনা করা।

দ্রাবিড়ভাষী তেলুগুরা এখনো বাংলা শুদ্ধরূপে আয়ত্ত্ব করে নিতে পারেনি। ফলে বাংলায় পড়াশুনা করা তেলুগুদের জন্য চ্যলেঞ্জিং। আর পর্যাপ্ত শিক্ষার অভাবেই তেলুগুরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে এখনো সচেতন নয়।

যদিও জাতীয় শিক্ষানীতিতে এইরূপ জাতির জন্য মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার কথা বলা রয়েছে তবুও সরকার এই ব্যাপারে উদাসীন। তাছাড়াও সরকারি গেজেটভুক্ত না করায় তেলুগুরা সরকারি চাকুরি বা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কোটা সুবিধা পায় না।

বাংলাদেশে বসবাসকারী তেলুগুরা নিজেদের সংস্কৃতি সম্পর্কে বেশ সচেতন। বাংলাদেশে তেলুগুদের মাঝে হিন্দু, খ্রিষ্টান ও হাতেগোনা কিছু মুসলমান ধর্মাবলম্বী রয়েছে। তেলুগু মহিলাদের শাড়ি পড়ার ধরন থেকে শুরু করে শরীরে বিভিন্ন অলংকারের আধিক্য অন্যদের থেকে নিজেদের স্বতন্ত্র করেছে। প্রায় এক সপ্তাহ ব্যাপী আয়োজিত তেলুগু স্বতন্ত্র বিবাহরীতি অত্যন্ত ঐতিহ্যমণ্ডিত। তবে অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় আনুষ্ঠানিকতা সংকুচিত হয়ে থাকে।

তেলুগু সংস্কৃতির অন্যতম হাতিয়ার লাঠি খেলা বা লাঠি নাচ। নিজস্ব গানে অপরূপ ভঙ্গিমায় দলভিত্তিক এই নাচ যে কাউকে মুগ্ধ করতে সক্ষম। বিভিন্ন পূজার্চনা কিংবা হোলি উৎসবে এই নাচ দেখা যায়। হিন্দু তেলুগুরা নকাল্লামাপূজা সহ দক্ষিণ ভারতের প্রচলিত বিভিন্ন পূজা এখানেও পালন করে।  কীর্তনের সময় তেলুগু গানেই তেলুগুরা সৃষ্টিকর্তার আরাধনা করে থাকে। তেলুগু কীর্তন বা ধর্মীয় গানগুলোর মোহনীয় সুর ও সঙ্গীত আধ্যাত্মিকভাবে স্বর্গীয় অনুভূতির সৃষ্টি করে। কাছে থেকে না শুনলে শুধু লিখে এর মাহাত্ম প্রকাশ করা কখনও সম্ভব নয়। তেলুগু নববর্ষ উগাডী বিশেষত ঢাকার তেলুগুরা পশু বলিসহ ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন করে পালন করে।
তেলুগু সংস্কৃতির আরেকটি সুন্দর দৃষ্টান্ত হল আলপনা। বিভিন্ন উৎসবে তেলুগু বধূরা বাড়ির আঙিনায় মনের মাধুরী মিশিয়ে চুন দিয়ে রকমারি ডিজাইনের আলপনা আঁকে। তেলুগু ভাষায় একে ‘মুজ্ঞু’ বলা হয়। অবাক করা বিষয় হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন এই আলপনাগুলো কাউকে শিখিয়ে দিতে হয় না। বংশ পরম্পরায় তেলুগুরা এই বিশেষ গুণ পেয়ে থাকে।

অবস্থানগত কারণে তেলুগুরা দেশীয় খাবারে অভ্যস্ত হলেও তেলুগুদের নিজস্ব কিছু ঐতিহ্যবাহী খাবার রয়েছে। টক খাবারের প্রতি তেলুগুদের দুর্বলতা আছে। তেলুগুরা টকজাতীয় ফল দিয়ে প্রায় দৈনিকই একটি বিশেষ ধরণের ডাল রান্না করে। তেলুগু ভাষায় একে ‘পুলচু’ বলা হয়। আর আম দিয়েও বিশেষ একটি আচার তেলুগুরা প্রায় অনিয়মিতভাবে বাড়িতে তৈরি করে। তেলুগু বিয়ে কিংবা উৎসবে গৃহিণীরা চালের গুড়ি ও গুড় দিয়ে বাহারী পিঠা তৈরি করে থাকে। মিষ্টি স্বাদের এই পিঠাগুলোকে তেলুগু ভাষায় পংরালু, কান্তা, এরসুলু, বুরলু, অন্ডলু ইত্যাদি নামে চিহ্নিত করা হয়।

বাংলাদেশে তেলুগুদের মাঝে বর্ণপ্রথা বিদ্যমান। যদিও আধুনিকতার ছোঁয়ায় দক্ষিণ ভারতে তেলুগুদের মাঝে বর্ণপ্রথা সেভাবে আর নেই। তবুও শিক্ষাগত কারণে এই গতিশীল সময়েও বাংলাদেশের তেলুগুরা কুসংস্কারের বেড়াজালে আচ্ছন্ন। তেলুগুদের মাঝে মাতকলু, মামুলু, গল্লুলু, ছাত্রুলু, নাইডু প্রভৃতি নামে বিভিন্ন ছোট-বড় গোত্র রয়েছে। তেলুগু সমাজে পঞ্চায়েত প্রথা বিদ্যমান। সংশ্লিষ্ট কারো কাছে তেলুগুদের সম্পর্কে কোনো সঠিক তথ্য না থাকলেও আনুমানিক বাংলাদেশে পঞ্চাশহাজারেরও (৫০,০০০) বেশি তেলুগু রয়েছে।

অপরূপ সুন্দর আমাদের এই বাংলাদেশকে আরো বৈচিত্রময়তা দিয়েছে বিভিন্ন জাতির স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, প্রথা, রীতিনীতি। তেমনি তেলুগু জাতিও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে মহিমান্বিত। কালের বিবর্তনে ও সময়ের গতিময়তায় ঢাকা শহরের আবর্জনার স্তূপ, চা বাগানের বন্দুর টিলা-পাহাড় আর রেলওয়ের স্লিপারের মাঝে যে জাতির জীবন ঘুরপাক খাচ্ছে রাষ্ট্র কি তাদের কাছে কোনভাবে দায়বদ্ধ নয়? একটু স্বাভাবিক জীবন নির্বাহের নিশ্চয়তা কি তেলুগুরা পেতে পারে?

মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সত্যনারয়ণ নাদেল্লার মতো বাংলাদেশের তেলুগুদের মাঝ থেকে কেউ বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে তুলে ধরবে এমন একটি স্বপ্ন কি তেলুগুরা দেখতে পারে? মাননীয় বাংলাদেশ তেলুগুদের কি একটু সুযোগ দেয়া যায় না?

লেখক:

মিখা পিরেগু

 




DMCA.com Protection Status

এই বিভাগের সকল সংবাদ

Contact Address

Nasir Trade Centre, Level-9,
89, Bir Uttam CR Dutta Road, Dhaka 1205, Bangladesh
Email: somoydigitalsomoynews.tv

Find us on

  Live TV DMCA.com Protection Status
উপরে