SOMOYNEWS.TV

হিসাব মিলিয়ে চলতে হবে অর্থমন্ত্রীকে

Update: 2015-02-09 23:10:35, Published: 2015-02-09 21:49:12
হিসাব মিলিয়ে চলতে হবে অর্থমন্ত্রীকে
হাসান মামুন

জানুয়ারি মাসে যে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেছে, পরিকল্পনামন্ত্রী সেটা জানানোর পর অর্থমন্ত্রী জানালেন- রাজধানীর বাইরে অর্থনৈতিক কার্যক্রম মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একাধিক দায়িত্বশীল সংবাদপত্রে দেখছি, ‘মারাত্মক’ শব্দটা তিনি ব্যবহার করেছেন। এজন্য বিএনপি নেত্রীকে তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে দায়ী করতেও ভোলেননি। বলেছেন, ‘তিনি দেশের সমৃদ্ধি চান না’। অর্থমন্ত্রী প্রায়ই বলে থাকেন, দেশ সমৃদ্ধির পথে রয়েছে। এর পক্ষে বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অর্জনের চিত্রও তুলে ধরেন। বিএনপির নেতৃত্বে টানা আর সহিংস অবরোধ চলাকালেও এটি তিনি করলেন। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, বেশি রাজস্ব আহরণ, বড় বাজেট বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি বা এক্ষেত্রে সক্ষমতা অর্জনের মতো বিষয়ে তিনি কিছু হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন- সরকার ‘রাইট ট্র্যাকে’ রয়েছে। আর বিরোধী দল দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে চাইছে।

সরকারের বেশ ক’জন মন্ত্রী এর মধ্যে বলেছেন বা বলতে চেয়েছেন, দেশে অবরোধ-হরতাল তেমন হচ্ছে না। মানুষ জীবন-জীবিকার দরকারে বেরিয়ে আসছে। এর মধ্যে ‘বিচ্ছিন্নভাবে’ কিছু নাশকতার ঘটনা ঘটছে বলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফ থেকেও এর কর্তাব্যক্তিদের মুখে শোনা যাচ্ছিল। তারা কেউ কেউ ক্ষমতাসীন দলের নেতার মতো করে বক্তব্য দিচ্ছেন বলে সমালোচনা হচ্ছিল। এর মধ্যে অর্থমন্ত্রী যেটা বললেন, তাতেই মনে হয় প্রকাশ পেল পূর্ণ বা পূর্ণের কাছাকাছি সত্য। রাজধানী ও এর আশপাশের অঞ্চল সচল থাকলেও দেশের একটি বড় অংশেই অবরোধে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ‘মারাত্মকভাবে’ বিঘ্নিত হচ্ছে। দেশের যেসব অঞ্চলে অবরোধ তেমন কার্যকর হচ্ছে না, সেখানেও লোকজনের মাঝে কাজ করছে ‘ফিয়ার ফ্যাক্টর’ বা ভীতির উপাদান। রয়েছে অনিশ্চয়তার বোধ। আর সচল অঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত না হলেও সেখানকার পণ্য তো নির্বিঘ্নে পরিবহন করা যাচ্ছে না। গাজীপুর থেকে যাওয়া পোল্ট্রি ফিডবাহী ট্রাকে পেট্রল বোমা হামলা হচ্ছে বরিশালের গৌরনদীতে আর তাতে পুড়ে মারা যাচ্ছে তিনজন। স্থলবন্দর নির্বিঘ্নে চললেও তাতে পণ্যজট লেগে যাচ্ছে, কারণ মালামাল তো নির্বিঘ্নে পরিবহন করা যাচ্ছে না। পুলিশ প্রহরায় নিয়ে যাওয়া ট্রাক বহরেও হামলা হচ্ছে।

এর মধ্যেও জানুয়ারিতে রফতানি আয় নাকি কিছুটা বেড়েছে। তার অর্থ এই নয় যে, রফতানি কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে রফতানি হয়তো আরও বাড়তো। কোনো ধরনের ছাড় না দিয়ে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে অবরোধ চলতে থাকায় এরই মধ্যে চিংড়ি, চামড়া ও চা রফতানি বিঘ্নিত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় শিল্প উপখাত গার্মেন্টসে নতুন করে ক্রয়াদেশ প্রাপ্তি ব্যাহত হতে পা অবরোধ আরও কিছুদিন চললে এবং পরিস্থিতি একই রকম অস্থিরতাপূর্ণ থাকলে। আর সমুদ্রপথের বদলে আকাশপথে পণ্য পাঠানো বেড়ে গেলে গার্মেন্ট ব্যবসায়ীরা কাঙ্ক্ষিত মুনাফা করতে পারবেন না এবং সেক্ষেত্রে তারা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবেন ক্ষতিপূরণ বা ছাড়ের জন্য। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবহন, পর্যটন খাত এবং জনগোষ্ঠী হিসেবে কৃষকরা। পিক সিজনে পর্যটন ব্যবসা একেবারেই বসে পড়েছে আর এটা তাদের ক্ষেত্রে ঘটল পরপর দু’বছর। এদিকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমন ধান উৎপাদনকারী আর সবজি চাষিরা। অর্থমন্ত্রীকে কেউ এ প্রশ্নটা করেছিলেন কী যে, কৃষকের এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার কী করবে বা করতে পারে?

অর্থমন্ত্রীকে প্রশ্ন করলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি অবশ্য পাল্টা প্রশ্ন করেন সাংবাদিককে। যেমন, কবে নাগাদ এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ হবে এমন প্রশ্ন তোলা হলে তিনি প্রশ্নকর্তাকেই জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি বলতে পারবেন’? মাঝে তিনি আমাদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। এখন বলছেন আরও দুই সপ্তাহের কথা। এটা কি তার ধারণা না আশাবাদ, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। এরই মধ্যে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে পুলিশ-র‌্যাব আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। পেট্রোল বোমা হামলার পাশাপাশি প্রতিদিন ঘটছে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার ঘটনা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হতে এ দুটি থেকেই সংশ্লিষ্টদের সরে এসে সমঝোতার পথে এগোনোর ওপর জোর দেয়া হলেও সে লাইনে কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। বিএনপির সঙ্গে সরকার যে কোনো সংলাপে বসবে না, সেটা তারা জানিয়ে দিয়েছেন পরিষ্কারভাবে। সরকার স্পষ্টতই আন্দোলন দমনের পথে রয়েছে এবং সেটা মনে হয় আরও জোরদার হবে। অর্থমন্ত্রীও আমাদের জানিয়েছেন, এজন্য সরকারকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেছনে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত সময় ঝুঁকি নিয়ে কাজও করতে হচ্ছে তাদের।

এমন একটা পরিস্থিতিতে অর্থবছরের দু’টো মাসও যদি চলে যায়, তাহলে সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রথমত কর-রাজস্ব আহরণ ব্যাহত হবে। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে স্পষ্টতই এগোনো যাবে না। তাতে ব্যাংকঋণ ও বিদেশী সহায়তার ওপর সরকারের নির্ভরশীলতা আরও বেড়ে যেতে পারে। ব্যাংকে অবশ্য বিপুল অলস অর্থ রয়েছে। কিন্তু সরকার সেটা বেশি করে নিলে লাভ নেই। বেসরকারি খাত নিলে ঋণটা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারতো। বেসরকারি খাতই আমাদের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে মাথাপিছু আয় বাড়াচ্ছে- সরকার যা নিয়ে গর্ব করে থাকে। বিদেশে কর্মজীবী পাঠানোর ক্ষেত্রেও (শত অভিযোগের মধ্যে) বেসরকারি খাতই দিচ্ছে নেতৃত্ব। আর তা থেকে আরও বেশি করে আসছে প্রবাসী আয়। টানা অবরোধে মানুষের রুজি-রোজগার ব্যাহত হলে বিদেশ থেকে অর্থ প্রেরণ আরও বেড়ে গেলেও যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ওটা আরও বেশি করে ব্যয় হবে ব্যক্তিগত পরিভোগে। অস্থির ও অনিশ্চিত পরিবেশে দেশে স্থবির হয়ে থাকা বিনিয়োগ তো বাড়বেই না; বিদেশে অর্থ পাচার বরং আরও বেড়ে যাবে। এসব বিষয়ে অর্থমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি কী বলতেন, জানি না। তবে সহিংস অবরোধ-হরতালে প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধি যে অর্জিত হবে না, সেটা অর্থবছরের মধ্যভাগে এসেই তিনি বলে দিলেন। এদিক থেকে অর্থমন্ত্রীকে স্পষ্টবাদী বলতে হবে। প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিষয়ে তিনি এখন ‘হাইলি ডাউটফুল’।

খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকার সময় প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার মানে হল মানুষের আয় কমে যাওয়া। এর অভিঘাতে দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। আওয়ামী লীগ সরকার এ জায়গাটায় ভালো করছিল বলে অর্থমন্ত্রী যা বলতে চেয়েছেন, সেটা কিন্তু ঠিক। রাজনৈতিক অস্থিরতা চলতে থাকলে সরকারি ব্যয়ে ছোট-বড় প্রকল্প বাস্তবায়নও ব্যাহত হবে। আবাসন খাতেও চলছে স্থবিরতা এবং অবরোধে এটা আরও বেড়েছে। এক্ষেত্রে কাঁচামাল সরবরাহের ব্যবসা মার খেলে বহু লোকের কাজের সুযোগও নষ্ট হবে। এ অবস্থায় এমনটি হতে পারে যে, সরকার তার উন্নয়ন ব্যয় অতিমাত্রায় কাটছাঁট করে রাজস্ব বাজেট বাস্তবায়নে বেশি করে এগিয়ে গেল। পুলিশসহ প্রশাসনযন্ত্র পরিচালনার দৈনন্দিন ব্যয় তো নির্বাহ করতেই হবে। বর্তমান সরকার নাকি দলের বদলে প্রশাসনের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে সরকারের রাজনৈতিক চরিত্রে বদল এলে অর্থমন্ত্রীর কিছু করার নেই। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তিনি ও তার সহকর্মীদের কেবল দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। হিসাব মিলিয়েই চলতে হবে তাদের।



লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট

Update: 2015-02-09 23:10:35, Published: 2015-02-09 21:49:12

More News
loading...

সর্বশেষ সংবাদ



Contact Address

Lavel-9, Nasir Trade Centre,
89, Bir Uttam CR Dutta Road, Dhaka 1205.
Fax: +8802 9670057, Email: info@somoynews.tv
উপরে