আপডেট
১৩-০৪-২০১৫, ১৮:৪৩

মূল্য বেশি কার- মানুষের নাকি ইলিশের?

somoy
ইতিহাসের নির্মম ট্রাজেডি থেকে ‘মীর জাফর’-এর মতো সুন্দর একটি নামের অর্থ এখন- ‘বিশ্বাস ঘাতক’। শুধু তাই নয়, আভিধানিক অর্থ অতিক্রম করে শব্দটি এখন সর্বাধিক জনপ্রিয় এবং সুশীল গালিতে পরিণত হয়েছে।
এটি কেবল ভাষা বিবর্তনের প্রামাণ্য দলিল-চিত্র। তবে কারণ ভিন্ন হলেও ভাষা-বৈচিত্র্যের প্রায়োগিক প্রেক্ষিতে পহেলা বৈশাখের আভিধানিক অর্থ ‘পান্তা-ইলিশে’ পরিণত হতে খুব বেশি বাকি নেই। সেদিন হয়তো দূরে নয় যখন পহেলা বৈশাখ শুনলেই মানুষের মস্তিষ্কে ‘পান্তা-ইলিশ’ খেলা করবে।

দারিদ্রের সুবাদে পান্তা না হয় সহজ লভ্য- কিন্তু ইলিশ? বাজারে এখন বৈশাখী আগুনের উপযুক্ত অঙ্গারের নাম ইলিশ। অপেক্ষাকৃত ভুড়ি-ভদ্রলোক ছাড়া তুড়িতে ইলিশ ক্রয়ের কাল শেষ। কেজি ওজনের প্রতি হালি ইলিশের দাম ২০ হাজারে ঠেকেছে। বৃদ্ধ ক্রেতারা উপযুক্ত দূরত্বে দাঁড়িয়ে পেয়াজ-পটোলেই দৃষ্টি দিচ্ছেন। কেউ বা শৈশব স্মৃতি মন্থন করে অনুভব করছেন রূপালি ইলিশের অন্তিম স্বাদ। পত্রপত্রিকায় শিরোনাম হচ্ছে-‘ইলিশ এখন সোনার হরিণ’।



এই যখন বাংলাবাজারে ইলিশ-চরিত্র আনন্দবাজারে তখন ভয়ঙ্কর চিত্র! দিদিরও নাকি ইলিশ পছন্দ! লও ঠেলা, বুবুদেরও শর্ত আছে। শর্তের নাসিকা খৎরায় বাবুদেরও গুড়ে বালি। আবহমান কাল থেকেই বাঙালি অতিথি প্রিয়। ইতিহাসের সেই সূত্রপথেই হয়তো সারথিদের লিপ্সা-যাত্রা। তাদের প্রত্যাশা অমূলক নয়। আমরাও স্বীকার করি- বাঙালি অথিতি পরায়ণ- তবে বঙ্গবন্ধুর বাঙালি, বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাঙালি নয়।

সর্বশেষ যা হয়েছে তা যথার্থই বলা চলে- ‘পানি পেলে ইলিশ পাবে।’ যৌক্তিক উচ্চারণ! ইলিশ তো ফেলানী নয় যে সীমান্তেই সমাধান? ইলিশের জন্য চাই পানি। পানি না হলে ইলিশ কোথায়? আগে জলযোগ পরে ইলিশি আবদার। বাঙালির কলিজা বটে! আপ্যায়নে কার্পণ্য করে না, হোক সে ইলিশে কিংবা দধিতে। তবে ‘যদি’তে ঝোলাঝুলি বাঙালির একদম পছন্দ নয়। না প্রেমে না পরকীয়ায়।


বাজারে এখন হাজার হাজার ইলিশ। এই ইলিশি আগ্রাসনে শান্তিনগরেও অশান্তির অন্ত নেই। বউ বাচ্চার বিলাসী খায়েশে পোশাকের সাথে দরকার ইলিশি আয়েশ। যদিও অনেকে দামের কাছে পরাস্ত । বড় অফিসের সাহেব থেকে ছাপোষা কর্মচারীবৃন্দ।

বছরের প্রথম দিন বলে কথা। এদিনটি যেমন যায় বছরের বাকি দিনগুলোও নাকি সেভাবেই কাটে। কাটাকাটির এই অযন্ত্রস্থ যন্ত্রণায় অসুস্থ নাগরিক বিড়ম্বনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বাহারি পোশাকে রঙ লেগেছে বাঙালিয়ানার। সবই মিলছে অল্প-বিস্তর। পান্তা মিলবে হয়তো পানির কল্যাণে কিন্তু ইলিশ?

সম্প্রতি ফেসবুকে আমার এক কাব্যবন্ধু মজার একটি স্টাটাস দিয়েছেন। পড়লে চিন্তাশীল যেকোন পাঠকের ভাল লাগবে। আমারো লেগেছে। সম্ভবত তিনি বলতে চেয়েছেন- কুংফু গুরু বুরুজ লি গত হয়েছেন বহুবছর পূর্বে। তার ইহজগত ত্যাগের মধ্যদিয়ে নাকি ‘লি’ বর্ণটিরও উদয়াস্ত তিরোধান ঘটেছে। ফলে ‘ইলিশ’ শব্দটি ‘লি’ হারিয়ে এখন ‘ইশ’! তবুও বৈশাখী জোয়ারে ইলিশের জিকিরে মত্ত নগরবাসী। আকাশ ছোঁয়া মূল্য দিয়ে অমূল্য রতন খরিদ করছেন অনেকেই। বিত্তবৈভবে তারা অতিমানবিক না হলেও অমানবিক তাদের ইচ্ছে পূরণের ফিরিস্তি। আর অন্যদের কাছে ইলিশ সত্যিই ‘লি’ হারিয়ে এখন ‘ইশ’!

তবুও আমরা পরাস্ত নই। পহেলা বৈশাখ আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। আমাদের আবেগ ভূমির প্রতিটি শস্যকণা আমাদের নিজস্ব সম্পদ। আমার ফেসবুকে অন্য এক বন্ধু আক্ষেপ করে লিখেছেন- ট্রাক ভর্তি ঘৃণা বর্ষিত হোক! ইলিশ এখন কোনো মাছের নাম নয়। ইলিশ এখন নিতান্তই সেলিব্রিটি। মানুষ না হয়ে ইলিশ হয়ে জন্মালে অনেকগুলো মূল্য পেতাম। হায় রে ইলিশি সভ্যতা!



কিছুকথা রসাত্মক হলেও তার গর্ভদেশ থাকে নিগূঢ় তাৎপর্যে পূর্ণ। সম্ভত সেকারণেই মাঝে মাঝে খুব ছোট বিষয়ে মনের ভেতর রক্তক্ষরণ ঘটে। এই যেমন দুর্ঘটনায় মানুষ মরলে ১০ হাজার টাকার ক্ষতিপূরণ! কিংবা লঞ্চডুবিতে মৃত্যু হলে ২০ হাজার টাকা! অথচ একহালি ইলিশের দাম ২০ হাজার টাকার ঊর্ধ্বে। এ সমস্ত বিষয়ের প্রশ্নবোধক চিহ্নগুলো হঠাৎ হঠাৎ মস্তিষ্কে খোঁচাখুচি করে। আর ক্রমাগত নিজের কাছে জিজ্ঞাসিত হই- মূল্য আসলে কার বেশি- মানুষের নাকি ইলিশের?



লেখক: কবি ও সাংবাদিক




DMCA.com Protection Status

এই বিভাগের সকল সংবাদ

Contact Address

Nasir Trade Centre, Level-9,
89, Bir Uttam CR Dutta Road, Dhaka 1205, Bangladesh
Email: somoydigitalsomoynews.tv

Find us on

  Live TV DMCA.com Protection Status
উপরে