বসন্ত রঙিন ভালোবাসা এবং মানবতা

Update: 2016-02-15 23:19:28, Published: 2016-02-15 23:19:28
boshonto
আকাশে বহিছে প্রেম,
নয়নে লাগিল নেশা
কারা যে ডাকিল পিছে!
বসন্ত এসে গেছে।


ঋতুরাজ বসন্তের আগমনের সাথে সাথে প্রকৃতি তার প্রতিটি পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয় এমন এক মোহময় সুবাস, যার আবেশে প্রতিটি মানুষের মনে বেজে ওঠে ভালোবাসার বারতা। এই বসন্ত এমনই এক ঋতু, যার ছায়ায় ছায়ায় মিশে থাকে রঙ। যার বেদনার প্রকাশ হয় সুরে সুরে। যার দিন রাতের দোলায় মিশে থাকে অসংখ্য ভালোবাসার কাহিনী। আর এমনই বসন্তে মানব-মানবীর মনের গভীরে ঘুমিয়ে থাকা হাজার বছরের কাব্যের ব্যঞ্জনা প্রতিধ্বনিত হয়ে কড়া নেড়ে যায় মনের মানুষের হৃদয়ের গোপন কুঠরিতে।

আকাশের সবগুলো রঙ একসাথে হয়ে নেমে আসে ধরণীর বুকে। দখিনা বাতাসের তানে পাতার বাঁশির সুরের মূর্ছনায় দুলে উঠে প্রতিটি প্রেমিকের মন। আনমনে তাই তারা গেয়ে ওঠে- "ভালোবাসি ভালোবাসি, এই সুরে কাছে দূরে জলে স্থলে বাজায় বাঁশি।"

আর ভালোবেসে জলে কিংবা স্থলে বাজানো এই বাঁশির সুরে পাগল হয়ে যাওয়া প্রেমিক প্রেমিকাকে তাই পাড়ি দিতে হয় দুর্গম পথ। দুর্গম এই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে তারা স্বীকার হয় নানা বাধা বিপত্তির। সেই বাধা পার হতে গিয়ে কেউ হয় সফল আবার কেউবা বিফল। কারও ভালোবাসার সুবাস ছড়িয়ে যায় বসন্তের ফুলে ফুলে। আবার কারো ভালোবাসা ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে হয় শিশিরে বিনাশ অথবা কারণ হয় কত শত ভুলের। এই ভুলের ব্যাপ্তি বিন্দু থেকে সিন্ধু পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। কখনও ত্যাগ করতে হয় সমাজ সংসার আবার কখনও বা পৃথিবী। কিন্তু যে পৃথিবী সৃষ্টির মূলে রয়েছে ভালোবাসা, সেই ভালোবাসারই জন্য পৃথিবী ত্যাগ করতে হবে কেন?

যে ভালোবাসার ফলে সৃষ্টি হয় নবজাতকের, সে ভালোবাসার ফসল কেন ছুড়ে ফেলে দিতে হয় ছয় তলা উঁচু দালানের উপর থেকে আস্তাকুড়ে, এক ক্যালেন্ডারের পাতায় কেন ঝরে পড়ে উনত্রিশটি ফুটফুটে শিশু? যে ভালোবাসার মায়ায় পিতা-মাতা পরম যত্নে বড় করে তোলে আদরের সন্তানকে, সে সন্তান আবার অন্য নারীর ভালোবাসার মোহে কেনইবা অবাধ্য হয় সেই পিতামাতার? কেনইবা মায়ের ভালোবাসাকে তুচ্ছ করে বৃদ্ধ মা'কে স্টেশনে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় অন্য গন্তব্যে?

যে ভালোবাসার আবেশে তরুণ-তরুণী গড়ে তোলে এক স্বপ্নের পৃথিবী, সেই ভালোবাসার পরিহাসে স্বপ্নের পৃথিবীকে আবার অকালে বিদায় জানায় তারাই। যে ভালোবাসা পৃথিবীকে পরিণত করে স্বর্গে, আবার সেই ভালোবাসাই পৃথিবীকে করে তোলে নরকের চেয়েও জঘন্য।

তাইতো কবির মনে প্রশ্ন জাগে, "সখী ভালোবাসা কারে কয়, সে কী কেবলই যাতনাময়? সে কী কেবলই চোখের জল, সে কী কেবলই দুখের শ্বাস?" যদি তাই-ই হতো, তবে কী কোন প্রেমিক তার প্রেমিকার জন্য সমস্ত পৃথিবী তন্ন তন্ন করে খুঁজে আনবে একশ' আটটি নীল পদ্ম? হাজার বছর ধরে পথে পথে হেঁটে যেতো কোন প্রেমিক বনলতা সেনের ভালোবাসায়? কিন্তু প্রশ্ন জাগে, ভালোবাসার মূল্য দিতে পৃথিবীর সমস্ত কিছু উজাড় করে দিয়ে কী সুখ পায় তারা? না কী এই যাতনার মাঝেই লুকিয়ে আছে সমস্ত সুখের? আর তাই কি নির্ঘুম রাতে চোখের জলকেই ভালোবেসে কেউ কেউ সুখ পায়? আর কেউ হয়তো ধরেই নেয়, ভালোবাসার অর্থ হলো দুঃখ পাওয়া বা হঠাৎ করে খুব সহজে বদলে যাওয়া।

দুঃখ পাওয়া বা বদলে যাওয়া-সে যাই হোক না কেন, এই পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখতে হতে হলে যে ভালোবাসার বিকল্প নেই তা এতোদিনে আমরা জেনে গেছি। কিন্তু জেনে গেলেও আমরা কখনও কখনও না জানার ভান করে এমন কিছু করে বসি যার জন্য ফিলিস্তিন সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যে অকালে প্রাণ হারায় অসংখ্য শিশু। সমুদ্রের বালুকাবেলায় চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে থাকে আয়লান। ভূমধ্য সাগরের উত্তাল ঢেউ ফেনা তুলে যায় সমস্ত বিশ্ববাসীর মনে, যে ফেনায় ফেনায় এমনিভাবেই বেড়েই চলছে অসংখ্য আয়লানের পরিবার। আবার এও জানি যে সমুদ্রের এই উত্তাল ঢেউয়ের ফেনা শান্ত শীতলতায় নিয়ে যেতে হলেও প্রয়োজন মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা।

যে ভালোবাসা মানুষকে ফিরিয়ে আনবে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে, নিষ্ক্রিয় করে দেবে পারমানবিক বোমা, যে ভালোবাসায় ম্লান করে দেবে সাম্প্রদায়িক হিংস্রতা, চিরতরে ভুলিয়ে দেবে বর্ণবাদী আচরণ। যে ভালোবাসায় দীর্ঘ সাতাশ বছর পরে মায়ের কোলে ফিরে যাবে নাটোরের আমহাটি গ্রামের মনোয়ারা, সাঁইত্রিশ বছর পরও স্বজনদের খোঁজে চট্টগ্রামে ফিরে আসবেন নেদারল্যান্ডস থেকে সুলতানা ফন দ্য লেস্ত। পত্রিকার পাতায় দেখতে হবে না নোয়াখালীর দুই বছরের শিশু হরিচান চন্দ্র নাথ হত্যার সংবাদ বা রংপুরের নীরবের বস্তাবন্দী লাশের খবর অথবা কেরানীগঞ্জের শিশু আব্দুল্লাহ’র হত্যার সংবাদ।

প্রতি ফাগুনের শুরুতে আমরা দেখতে চাই পত্রিকার পাতাজুড়ে শুধু রঙ-বেরঙের ফুলের ছবি, পাখির ছবি, গাছের ছবি। আর একই সাথে সবুজ পাতার আগমনে মানুষের মনে বেজে উঠুক ভালোবাসার সুর- যে সুর ভুলিয়ে দেবে মনের সমস্ত হতাশা, মুছে দেবে সকল অস্থিরতা, বিজয়ী করবে মানবতা, সার্থক করে তুলবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকা প্রতিটি মানুষের জীবন।

 

মো. মোক্তার হোসেন

-কবি ও ফ্রিল্যান্স কলামিস্ট




Update: 2016-02-15 23:19:28, Published: 2016-02-15 23:19:28

আপনার মন্তব্য লিখুন

পাঠকের মন্তব্য ( 1 )

  • রবিন্দ্র বরুয়া: at 2016-02-17 13:23:41
    আহা কি যাতনাময় এই বসন্ত

More News
  


আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ



সরাসরি যোগাযোগ

৮৯, বীর উত্তম সি. আর. দত্ত রোড, ঢাকা ১২০৫, বাংলাদেশ।
ফ্যাক্স: +৮৮০২ ৯৬৭০০৫৭, ইমেইল: info@somoynews.tv
উপরে en.Somoynews.tv