বই নাকি ই-বই?

Update: 2015-02-12 21:13:37, Published: 2015-02-12 20:53:20
বই নাকি ই-বই?
বুঝতেই তো পারছেন, ইদানীং সবাই বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীষণরকম চিন্তিত। বইয়ের যুগ কি শেষ হয়ে গেছে? আমরা কি অদূর ভবিষ্যতেই নতুন নতুন বইয়ের গন্ধ শোঁকা থেকে বঞ্চিত হব? এ রকম একটা আশঙ্কার কথা কিন্তু আজকাল আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।

আসলে কি মুদ্রিত বইয়ের যুগ শেষ? ইঙ্গিতটা কিন্তু বর্তমানের ই-বুকের দিকে।‌ নিন্দুকেরা বলেন, আরে ক’জন আর ই-বুক নিয়ে মাথা ঘামায়? কিছু উঠতি বয়সের যুবক-যুবতী এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর মানসিকতার কিছু মানুষ ছাড়া মুদ্রিত বই বা গ্রন্থ -ই মানুষের সর্বকালের নিত্যদিনের সঙ্গী।‌ পাঠ্যপুস্তককে ইলেকট্রনিক বা ই-বুকে রূপান্তরের প্রয়াস কিছুটা ব্যতিক্রমী। এ উদ্যোগের সাফল্যও লক্ষণীয়।

ধরুন, তর্কের খাতিরে মেনেই নিলাম ই-বুক সম্পর্কে ভালোরকম ওয়াকিবহাল। কিন্তু একটা নতুন প্রকাশিত গোটা বইয়ের ঘ্রাণ বা মজা বা আবেগ কি খুঁজে পাবেন ই-গ্রন্থে? আরে বাবা, একটা মোটাসোটা গোটা বই উল্টেপাল্টে দেখার যে আনন্দ ও সুখ, সেটা কোনও দিনই ইলেকট্রনিক বুক দিতে পারবে না। আর বই পড়ার আবেগটাই বা বাদ দেবেন কেন? বনলতা সেনের ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’ কবিতার এই লাইনটির আবেগ ও উচ্ছ্বাস কোন ই-বুক থেকে পাওয়া যাবে৷‌ যতই তর্ক হোক, কফির পেয়ালায় তুফান উঠুক, নতুন বই দেখার, পড়ার ও বালিশের নিচে আর বুকের ওপর রেখে আমেজ করা– এ স্বাদ কোনও দিনই ই-বুক দিতে পারবে না।



কম্পিউটারে মাউস ক্লিক করে বইয়ের পাতা উল্টে যাওয়া। একমনে পড়ে যাওয়ার লোক খুব কম পাওয়া যাবে।‌ একটা বই আপনি যেমন খুশি যে কোনও অ্যাঙ্গেলে বসে, শুয়ে, হেঁটে পড়ে যেতে পারবেন। কিন্তু কম্পিউটারে, ল্যাপটপে, ট্যাবলেটে বা ইউ টিউবে বা ফেসবুক অ্যাকাউন্টে চ্যাটিংয়ে কি সেটা সম্ভব? একমাত্র সম্ভব, যারা যুক্তি মানেন না তাঁদের ক্ষেত্রে৷‌ আরও আমাদের হাতের কাছে এই মুহূর্তে এমন কোনও তথ্য হাজির নেই, যার থেকে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারব, বইয়ের ভবিষ্যৎ অন্ধকার৷‌ বরং সাহস করে বলতে পারি, ই-বুক এসে মুদ্রিত বইয়ের পরিপূরক ভূমিকা নিয়েছে৷‌ আমাদের তাৎক্ষণিক তথ্য জোগানের ক্ষেত্রেই ই-বুকের জুড়ি মেলা ভার। একটা ইন্টারনেট অ্যাকাউন্ট বইয়ের তথ্য জোগানের সহযোগীর ভূমিকা পালন করবে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার প্রিন্ট এডিশন বন্ধ হয়ে গেছে মানে এই নয় যে, সারা পৃথিবীর সব বই একদিন ছাপা বন্ধ হয়ে যাবে৷‌ এনসাইক্লোপিডিয়ার বিশাল বত্রিশ ভল্যুম, নিয়মিত আপডেট করা, বাড়িতে রাখা এবং সর্বোপরি প্রচুর দাম দিয়ে কেনার ক্ষেত্রেও সমস্যা আছে৷‌ এ রকম রেফারেন্স বইয়ের ক্ষেত্রে ই-এডিশন ভীষণ প্রাসঙ্গিক। সব দিক বিবেচনা করে ব্রিটানিকার মুদ্রিত সংরক্ষণের প্রিন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সে অন্য প্রসঙ্গ।‌ তার সঙ্গে প্রতিনিয়ত প্রকাশিত অজস্র বিষয়ের বইয়ের কোনও তুলনাই চলে না।

আরও গভীরে গিয়ে বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। অল্প পরিসরে আলোচনার একটা সাধারণ ধারণা দেওয়া হল মাত্র। এর থেকে মোটামুটি একটা যুক্তিগ্রাহ্য সিদ্ধান্ত হল, খুব সহসাই, অর্থাৎ আগামী একশো-দু’শো বছরে বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই৷‌ বই তার সবরকম আভিজাত্য নিয়ে আরও দীর্ঘদিন রাজত্ব করবে। টিভির ন্যাশনাল জিওগ্রাফি যা অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট চ্যানেলের জন্য কি মানুষের চিড়িয়াখানা যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে? ওই সব চ্যানেলে মনে হতেই পারে, বাঘ, সিংহ, জন্তু-জানোয়ার ঘাড়ের কাছে এসে এই বুঝি থাবা বসাল।

আমাজন ডট কম, ফ্লিপকার্ট ডট কম বা শচীন ফ্লিপকার্ট ডট কম বা এই ধরনের বইয়ের যে সাইটগুলো আছে, এগুলো মূলত ই-বুকের ওয়েবসাইট। এদের প্রধান কাজ পছন্দের বই ই-পেমেন্টের মাধ্যমে গ্রাহকদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া৷‌ এরা ই-বুকের হদিশও আপনাকে টাইম-টু-টাইম আপডেট করবে।‌ বই প্রকাশিত হওয়ার আগের তথ্যও আপনাকে অগ্রিম জানিয়ে দেবে৷‌ প্রি-পাবলিসিটির ব্যাপারে এদের জুড়ি নেই৷‌ মুদ্রিত বইয়ের ক্ষেত্রে এই বিষয়টিতে প্রকাশকরা অনেক পিছিয়ে আছেন। আর সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং তথ্য হল, ই-বুকের এডিশন এখন প্রথম বাজারে আসে, তারপর মুদ্রিত বই। আর সেটি হয়ে থাকে ই-বুকের যন্ত্র নির্ভর খণ্ডত্ব ও ক্ষণস্হায়িত্বকে মুদ্রিত রূপে পূর্ণতা ও স্থায়িত্ব দেওয়ার তাগিদ থেকেই৷‌

তবে আশঙ্কা যে পুরোপুরি কাটছে তাও না! বিভিন্ন পর্যায়ে অনলাইন লাইব্রেরীর অভাব। এর থেকে উত্তরণও অত্যাবশ্যকীয়।

অনেকেই অবশ্য সন্দিহান ই-বুক চর্চা কাগজে মুদ্রিত বই শিল্পকে ধ্বংস করে দিচ্ছে কি না। তবে আপাতদৃষ্টিতে ই-বুক কাগজে মুদ্রিত বইয়ের প্রচার সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে। প্রকাশনাগুলো নিজেরা চলে আসতে পারে এই ই-বুক চর্চায়। কাগজের মুদ্রণকে কোনোরূপ বিপদে না ফেলেই কিন্তু এমন প্রচার করে যাচ্ছে ই-বুক আর ই-বুক রিডার। হালের ক্রেজ হিসাবে বহুল প্রচারিত বইয়ের সিরিজ হ্যারিপটার ফিল্ম, ই-বুক এবং নানারকম রিডিং ভার্শন হবার পরও সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের খাতায় নামটি কিন্তু ঠিকই ধরে রেখেছে।

ভাবতে ভাল লাগে, আপনার টেবিলে একটি দুশো-আড়াইশো পাতার বই আছে৷‌ এই বইটির আকার, প্রকার, ছাপা, বাঁধাই থেকে শুরু করে ভেতরের সম্পূর্ণ রূপটি আপনি দেখতে পারছেন প্রাণভরে, ছুঁতে পারছেন, অনুভব করতে পারছেন, কিন্তু ই-বুকের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হল ওই দু’শো-আড়াইশো পাতার বইটি আপনি কোনও অবস্থাতেই একসঙ্গে দেখতে পারবেন না। তাকে দেখতে হবে পৃষ্ঠা ধরে ধরে৷‌ অর্থাৎ এক পৃষ্ঠা পড়ার পর বা দেখার পর আরেক পৃষ্ঠা।

বইয়ের এখানেই জিত। কাগজের বই থাকুক আমাদের হাত ধরে আর ই-বুক চর্চা এগিয়ে নিয়ে যাক কাগজের বইয়ের প্রচার ও প্রসারকে।

Update: 2015-02-12 21:13:37, Published: 2015-02-12 20:53:20

আপনার মন্তব্য লিখুন

পাঠকের মন্তব্য ( )


More News
  


আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ



Contact Address

89, Bir Uttam CR Dutta Road, Dhaka 1205, Bangladesh.
Fax: +8802 9670057, Email: info@somoynews.tv
উপরে en.Somoynews.tv