প্যারিস হামলা: আইএস ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

Update: 2015-11-19 20:17:52, Published: 2015-11-19 20:17:52
muktomot
নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দর থেকে ঢাকায় ফেরার জন্য এয়ারলাইন্স এর বোর্ডিং পাস নিতে লাইনে দাঁড়িয়েছি। বিমানবন্দরের ভেতরে টিভির পর্দায় তখন প্যারিস হামলার ব্রেকিং নিউজ। তখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা একশ' বাইশ জন। চোখে পড়ার মত নিরাপত্তা বলয় পার হয়ে দীর্ঘ চৌদ্দ ঘণ্টা আকাশ ভ্রমণের জন্য বসে পড়লাম। ট্রানজিট আবুধাবি। আরবি আর ইংরেজি ভাষায় বিভিন্ন প্রকার নিরাপত্তা নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে কেবিন ক্রু। কিন্তু কোন নির্দেশনাই যেন মাথায় ঢুকতে পারছে না। কারণ মাথার ভেতর তখন একশ' বাইশ সংখ্যা আর প্যারিস শহরের করুণ দৃশ্য ঘুরপাক খাচ্ছে।

এই ঘূর্ণিপাকের মাঝেই বিমান উড্ডয়ন সফলভাবে হলেও বিশ্বব্যাপী চলমান সহিংসতার বিরুদ্ধে কিছু ব্যর্থ চেষ্টা আর অসহায় মানুষের কথাই মনের ভেতর এক অস্বস্তিকর অনুভূতির জন্ম দিতে লাগলো। কোথাও কেউ নিরাপদ নেই। না বগুড়ায়, না গুলশানে। না সাভারে, না ক্যান্টনমেন্ট-এ। না ইরাকে, না প্যারিসে। আর নিজেকে আরও অনিরাপদ মনে হতে লাগলো মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্স এর কথা মনে করে। যদি এই বিমানটিও নিখোঁজ হয়ে যায়, বা কোন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে হয়ে যায় বিধ্বস্ত। অথবা নাইন ইলেভেনের মত যদি এই বিমানটি হাইজ্যাক হয়ে কোন স্থাপনায় আঘাত হানে?

এভাবেই তেত্রিশ হাজার ফুট উপর দিয়ে চরম অ-নিরাপত্তায় এগুতে থাকি গন্তব্যের দিকে। আমার গন্তব্য জানা থাকলেও, আমাদের ভবিষ্যৎ কোন গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তা খুবই অস্পষ্ট। কারণ বিশ্বজুড়ে এখন এমন এক ঘূর্ণিবায়ু আঘাত হানা শুরু করেছে যার গতিপথ মোটেই স্পষ্ট নয়। যদি এই বায়ুর উৎপত্তিস্থল হয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্র, তাহলে এর নাম ছিল আল-কায়েদা। যদি আল-কায়েদা এখন নিকট অতীত হয়ে থাকে, তবে কি এই ঝড়ের নাম আইএস? অনেক বিশ্লেষক সরল গাণিতিক নিয়মে তৃতীয় বিশ্বের অনেক সাধারণ মানুষের মত তাই মনে করে থাকেন। করাটাই স্বাভাবিক, কারণ অনেক মার্কিন নাগরিকও মনে করে যে আইএস নামক জুজুর জন্মদাতা সিআইএ; আর সিআইএ তার এই জাতককে অস্বীকার করে আসছে শুরু থেকে। অস্বীকার করলেও সিআইএ-এর ওপর থেকে সন্দেহের তীর সরানো দুষ্কর।

নিছক এক অজুহাতে যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে প্রায় এক যুগব্যাপী ধ্বংসাত্মক অভিযান চালাতে পারে, সেই যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে আইএস-এর মত জঙ্গি সংগঠনের উত্থান নীরব দর্শকের মত চেয়ে দেখল? ইরাকের সাদ্দাম হোসেন যদি আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে থাকে আর তার বিরুদ্ধে যদি স্থল, নৌ, আকাশপথে হামলা চালাতে পারে, তাহলে আইএস-এর মত জঙ্গি দমনে তারা কীভাবে ইরাকে শুধু ড্রোন হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে? যখন নিয়মিতভাবে বিভিন্ন দেশের শতশত মানুষের শিরশ্ছেদের ভিডিওচিত্র ইন্টারনেটে সয়লাব, তখন কীভাবে এই আইএস সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার অপেক্ষায় থাকে যুক্তরাষ্ট্র আর তার মিত্র দেশগুলো?



সমীকরণটি অনেকটাই জটিল আর এই জট খোলার জন্য আরবদেশের রাজ পরিবারগুলো যখন হিমশিম খাচ্ছে তখন আরবের রাজপুত্র সেই জটিল হিসাব চুকাতে দ্বারস্থ হয়েছে মদের বোতলের। ব্যক্তিগত বিমানে বোঝাই করেছে বিপুল পরিমাণ মাদক যা ধরা পড়েছে ভিনদেশে। তাই আরবদেশের পক্ষে এই জটিল অংকের সমাধান মেলানো সম্ভব না। কিন্তু তার গায়েও তখন আইএস-এর নখের আঁচড়, যার প্রতিশোধে সিরিয়ায় চালানো হচ্ছে বোমা হামলা। যেন সিরিয়ার এই নিরীহ মানুষদের শরীরে ভর করে আছে অশরীরী আইএস নামক ভূত আর সেই ভূত তাড়াতে হলে ওঝাকে তার মন্ত্রতন্ত্র এক করে চিকিৎসা চালিয়ে যেতেই হবে, যেখানে মানবতা গৌণ একটি বিষয়। কিন্তু ওঝার মনে আসলে কী, তা বোঝা বড় দায়। সে একদিকে বোতলবন্দী করতে চায় আইএসকে, আবার অন্যদিকে আসাদ-বিরোধী বিদ্রোহীদের হাতে তুলে দিতে চায় সিরিয়ার ক্ষমতা।

পশ্চিমা ওঝার এই মন্ত্র কার্যকরী নয় ভেবে এবার আকাশপথে মন্ত্র ছাড়লেন নতুন ওঝা পুতিন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, মন্ত্র ছাড়ে আইএস-এর দেহে, পুড়ে যায় ওবামার দেহ। অসহ্য এই যন্ত্রণার কথা বলার জন্য তর সইলো না তার জাতিসংঘের অধিবেশন পর্যন্ত। কারণ, সেখানে পুতিন ঝাড়লেন আরেক মন্ত্র, বলে দিলেন- তিনি নাকি ফাঁস করে দেবেন নাইন ইলেভেনের সব গোমর।

সবদিক বিবেচনায় একটা বিষয় স্পষ্ট যে, আইএস দমন এখানে মুখ্য বিষয় নয়, মূল বিষয় বিশ্ব রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ। বিশ্ব এখন স্পষ্ট দুইভাগে বিভক্ত। এক রাশিয়া আর দুই আমেরিকা আর তার মিত্ররা। আশির দশকের পর রাশিয়া এখন তার বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফিরে পাওয়ার চেষ্টায় মরিয়া আর যুক্তরাষ্ট্র তা হতে দিতে নারাজ। কিন্তু এই দ্বন্দ্বের বলি হচ্ছে সিরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের নিরীহ জনগণ। আর সেই তালিকায় এবার যুক্ত হল প্যারিসে শতাধিক প্রাণ।

প্যারিসের এই প্রাণহানি কারও কারও কাছে যেন অতীতের সব প্রাণহানির চেয়ে করুণ আর ভয়াবহ। তার কিছুটা আঁচ করতে পারলাম আবুধাবি বিমানবন্দরে এসে ফেইসবুকে লগইন করার পর। বন্ধুবান্ধবসহ অনেকেরই ফেইসবুক প্রোফাইলে ফ্রান্সের পতাকার ছায়া আর সহমর্মিতাজনক পোস্ট। কিন্তু সেখানেও বিতর্ক। যারা এই প্রোফাইলের ছবি পরিবর্তনের পক্ষে, তাদের যুক্তি হল শুধুই মানবতার জন্য তাদের এই প্রয়াস। আর বিরোধীদের অভিযোগ, এই সহমর্মিতার ধরন বর্ণবিভেদ আচরণের সাথে তুলনীয় জাতিগত বিভেদের সমপর্যায়ের। কারণ, ফিলিস্তিনে যখন হাজারও নিরীহ শিশু যখন প্রাণ হারাল তখন ফেইসবুকসহ অন্যান্য মাধ্যমে তাদের প্রতি এইভাবে তো সহমর্মিতা দেখানো হয়নি!

এই যুক্তি আর পাল্টা যুক্তিতে আমরা নীরবে এগিয়ে চলছি আরেকটি ভুল পথে। ফিলিস্তিনিদের জন্য ফেইসবুকে পতাকার রঙে প্রোফাইলের ছবি পরিবর্তন হয়নি বলে কেউ কেউ প্যারিস হামলায় নিন্দা জানাতে কৃপণ। তাতে যে আইএস-এর নিন্দনীয় হামলাকে প্রচ্ছন্নভাবে প্রশ্রয়ের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সেই বিষয়ের প্রতি এই পক্ষ উদাসীন। আবার ফিলিস্তিন আর সিরিয়াসহ অন্যান্য দেশের মানবিক বিপর্যয়ে নীরব থেকেছেন যারা, তারাও প্রকারান্তরে নীরবতার মাধ্যমে মানবতার বিরুদ্ধেই তাদের অবস্থান ব্যক্ত করছেন, তা বুঝে অথবা না বুঝে।

কিন্তু এই বুঝে আর না বুঝে কৃতকর্ম মূলত ভার্চুয়াল, যা সমস্যা সমাধানে কোন কাজেই আসবে না। কারণ আইএস যখন আজ এখানে, কাল ওখানে একের পর এক সন্ত্রাসের বুদবুদ ছড়াচ্ছে তখন তাদের নিয়ন্ত্রণে শুধুমাত্র সিরিয়ায় অভিযান যথেষ্ট নয়। আবার নাইন ইলেভেনের পরে প্রেসিডেন্ট বুশ যেভাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্তকালের যুদ্ধ ঘোষণা করে দুনিয়াজুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছিলন, সে কথা ভেবে আমরা শঙ্কিত। কারণ আমরা হচ্ছি ঘরপোড়া গরু আর আমাদের কার ঘরে কোন ধরনের দাহ্য-পদার্থ রয়েছে তা আমাদের অজানা। আর এটা খুঁজে বের করার দায়িত্ব কেউই যুক্তরাষ্ট্রের হাতে দিতে নারাজ। কারণ তারা একযুগ পার হওয়ার পর বুঝতে পারে তাদের গোয়েন্দা প্রতিবেদন ভুল, আর ততক্ষণে ইরাকজুড়ে লাশের মিছিল, ডিপ্লেটেড ইউরেনিয়ামের তেজস্ক্রিয়তা আর বাতাসে মানুষের পচা গন্ধ।

আইএস-এর হামলার ধরণ বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, প্রত্যেকটি হামলাই সুপরিকল্পিত আর নিখুঁত। বিপরীতে আইএস-এর বিরুদ্ধে যত পদক্ষেপ তার বেশিরভাগই কার্যকর বা বুদ্ধিদীপ্ত নয়। আইএস যখন সিরিয়ায় হামলার প্রতিশোধ নিচ্ছে প্যারিসে, আর হুমকি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র আর যুক্তরাজ্যে হামলা চালানোর তখন আইএস দমনে শক্তি প্রয়োগ নয়, প্রয়োজন বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ। আর তাই অনতিবিলম্বে প্রয়োজন আইএস-এর মহা-পরিকল্পনার ছক উন্মোচন করা আর এই নীল-নকশাকারী জ্ঞানপাপীদের খুঁজে বের করা। আর ব্যাপারটা যদি সিআইএ'র ইঁদুর-বিড়াল খেলা হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে শেষ দৃশ্যের, যেমনটি দেখেছি আমরা একযুগ পরে পাকিস্তানে তালেবানি নাটকের। তবে এবার এই শেষ-দৃশ্য পর্যন্ত অপেক্ষা করার কোন অবকাশ আমাদের হাতে নেই।

তাই আমাদের কালক্ষেপণ না করে আইএস মোকাবেলায় বৃদ্ধি করতে হবে ধর্মীয় সচেতনতা। বোঝাতে হবে আইএস যা করছে তা মোটেই ইসলাম নয়, শান্তির পথ নয়। ধর্মান্ধতা পরিহার আর সাম্প্রদায়িক আচরণ থেকে সকল ধর্মের অনুসারীদের বেরিয়ে আসতে হবে। বুঝতে হবে, ফিলিস্তিনিদের যেমন বাঁচার অধিকার আছে তেমনি বাঁচার অধিকার আছে প্যারিসসহ পৃথিবীর যেকোন প্রান্তের একজন নগণ্য মানুষেরও।

-- মো. মোক্তার হোসেন




Update: 2015-11-19 20:17:52, Published: 2015-11-19 20:17:52

আপনার মন্তব্য লিখুন

পাঠকের মন্তব্য ( )


More News
  


আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ



সরাসরি যোগাযোগ

৮৯, বীর উত্তম সি. আর. দত্ত রোড, ঢাকা ১২০৫, বাংলাদেশ।
ফ্যাক্স: +৮৮০২ ৯৬৭০০৫৭, ইমেইল: info@somoynews.tv
উপরে en.Somoynews.tv