গণমাধ্যমের জন্মদিন: অপেশাদারি উৎসব

Update: 2015-04-12 17:18:29, Published: 2015-04-12 17:12:43
tushar-abdullah
‘পরিজনদের জন্মতারিখ ভুলে যাচ্ছি। গোল্ডফিস স্মৃতিশক্তি নিয়ে নিজের সুখ-দু:খের দিনক্ষণই মনে রাখতে পারিনা। সেখানে এখন এক নতুন উপদ্রব তৈরি হয়েছে গণমাধ্যমের জন্মদিন পালন। ক্যালেন্ডারের পাতায় যদি চিহ্ন দিয়ে রাখা যেতো, কবে কোন টেলিভিশন চ্যানেলের, পত্রিকার জন্মদিন তাহলে উপদ্রবের বিড়ম্বনা থেকে রেহাই পেতাম’। কথাগুলো চট্টগ্রামের একজন শ্রদ্ধেয় নাগরিকের।

সংস্কৃতি অঙ্গনের পরিচিত এই মুখ, একজন পাঠক, দর্শক হিসেবে তার বিরক্তির কথা আমাকে জানালেন। পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলের জন্মদিনকে তিনি উপদ্রব হিসেবে কেন দেখছেন, জানতে চাইলে এই বিদগ্ধ পাঠক ও দর্শক জানালেন-জন্মদিনটি ঐ গণমাধ্যমের নিজস্ব। তারা নিজেদের মতো করে সেটি উদযাপন, উপভোগ করতে পারেন। সেই অধিকার তাদের আছে।

পাঠক, দর্শকদেরকে এই জন্মদিনের সঙ্গে সংযুক্তও করতে পারেন তারা। তার একটা রেওয়াজ পত্রিকার যুগ থেকে ছিল। সেটি হলো বিশেষ সংখ্যা বের করা। সেই সংখ্যায় মূল্যবান, চিন্তিত এবং সুখপাঠ্য লেখা থাকতো। পাঠকরা এধরনের একটি সংখ্যার অপেক্ষা করতো বছর জুড়ে।বিশেষ সংখ্যা বের করার রেওয়াজটি এখনো বেশির ভাগ পত্রিকা ধরে রেখেছে। প্রতিযোগিতার বাজারে কোন কোন পত্রিকা তৈরি করেছে একাধিক বর্ষপূর্তি সংখ্যা বের করার ফ্যাশন। এই ফ্যাশনে আবার গত দুই যুগে একে একে যোগ হয়েছে, সুধী সমাবেশ। তারকা সমাবেশ। এবং ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কেক কাটা, র‍্যালী বের করা। প্রচার সংখ্যায় একদা এগিয়ে থাকা এবং এখন বিলুপ্তির প্রান্ত রেখায় দাঁড়ানো একটি পত্রিকা প্রথম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে সুধী সমাবেশের আয়োজন শুরু করে। তারকা হোটেলে ঘটা করে পালিত হতো পত্রিকাটির জন্মদিন। শহর ও দেশের নানা খাতের তারকারা যোগ দিতেন সেই যজ্ঞ অনুষ্ঠানে। তখনো ঐ অনুষ্ঠানের ফলাও করে ফটোসেশন প্রকাশ শুরু হয়নি।

ফলাও প্রচার, প্রপাকান্ডার চল শুরু হয় বেসরকারি টেলিভিশনের যুগে। একুশে টেলিভিশন প্রথম বেসরকারি টেলিভিশন হিসেবে প্রথম এলেও, তারা তাদের জন্মদিনটি তখন ঘরোয়া ভাবেই পালন করতেন।চ্যানেল আই টেলিভিশন প্রথম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে দর্শক, শুভানুধ্যায়ীদের সংযুক্ত করার উৎসবটি শুরু করে। দর্শক, সরকার, বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, শহরের বিশিষ্টজন এবং স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দলে দলে গিয়ে চ্যানেল আই কার্যালয়ে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে থাকেন।দিনমান সেই শুভেচ্ছা প্রদান-গ্রহণ পর্বটি সরাসরি দেখানো শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতা প্রতি বছরই চলতে থাকে।

পরবর্তী সময়ে যে টেলিভিশন গুলো সম্প্রচারে আসে, তাদের একটি, দুইটি ছাড়া সবাই জন্মদিন পালনে চ্যানেল আইকে অনুকরণ করতে শুরু করে। এখন কোন টেলিভিশনের জন্মদিন মানেই ঐ দিন তার পর্দায় কিছু পরিচিত মুখকে কেক খেতে, খাওয়াতে কিংবা ফুল হাতে দেখা যাবে। শুধু ঢাকার অফিস বা স্টুডিওতেই নয়। বিভাগ এবং জেলা পর্যায়েও এই উৎসব চলে। সেখানকার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও বিশিষ্টজনরা এসে কেক খাচ্ছে, ফুলের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।  র‍্যালী বের হচ্ছে। ঐ উৎসবটিও কোথাও কোথাও থেকে সরাসরি দেখানো হয়।বিভাগ, জেলাতেও একই মুখ দেখা যায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এক চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলে। টেলিভিশনের কায়দা এখন পত্রিকাও নিয়ে নিয়েছে। তারাও এখন কেকমুখ করানোর, ফুল দেয়া-নেয়ার ছবি ব্যাপক ভাবে প্রকাশ করছে। কোন তারকা কোন পোশাক পড়ে, কিভাবে চুল আঁচড়িয়ে ঐ জন্মদিনের অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন সেটিও প্রকাশিত হচ্ছে। টেলিভিশনে সরাসরি কেকমুখ ও ফুল গ্রহণ পর্ব দেখানো পাশাপাশি আছে বাণীঅর্চনা পর্ব। একই ব্যক্তি সকল ধরণ ও মানের টেলিভিশনকেই সেরা বলছেন। অভিনন্দিত করছেন তাদের পেশাদারী ভূমিকার জন্য।

চট্টগ্রামের ঐ বিদগ্ধ পাঠক ও দর্শকজনের কথা হচ্ছে জন্মদিনের ডামাডোলের দিনগুলোতে টেলিভিশন ও পত্রিকা উভয়েই খবর, ঘটনা থেকে অনেকটা দূরে রাখে ভোক্তাদের। অনেক গুরুত্বপূর্ণ খবর আড়াল হয়ে যায়। সমস্যাটিতে পাঠকদেরই মুখোমুখি হতে হয় বেশি। কারণ প্রায় সকল পাঠকই একটির বেশি পত্রিকা রাখেন না। তারা জন্মদিনের উন্মাতাল দিনে খবরের চাহিদা পুরোটা ঐ পত্রিকা দিয়ে মেটাতে পারেননা। কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ খবর থেকে বঞ্চিত হন পাঠকেরা। টেলিভিশনের দর্শকেরা রিমোটের কল্যাণে চ্যানেল বদল করতে পারেন।কিন্তু তারপরও ঐ চ্যানেলটির কাছে তার যে প্রত্যাশা থাকে, সেখান থেকে বঞ্চিত হন তারা। তবে তিনি মনে করেন-এই প্রক্রিয়ায় স্বয়ং টেলিভিশন চ্যানেলটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দর্শকরা ঐ চ্যানেলের দায়িত্ববোধ, পেশাদার আচরণ নিয়ে তখন সংশয় প্রকাশ করেন এবং চ্যানেলটি ত্যাগ করে চলে যান। কখনো কখনো ফিরে এলেও আর ঐ চ্যানেলের উপর আস্থা রাখতে পারেননা।

সাম্প্রতিক সময়ের একটি উদাহরণ টেনে তিনি বললেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ৫ এপ্রিল যখন তার গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে যান, তখন একটি সংবাদভিত্তিক চ্যানেলে তাদের জন্মদিনের অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সেদিন ছিল চ্যানেলটির জন্মদিন। যখনকার তথ্য তখনই দর্শকদের জানাতে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেও, তাদের কাছে সেদিন গুরুত্ব পেয়েছে নিজেদের জন্মদিন। এই দোষে কেবল ঐ চ্যানেলটিকেই তিনি দোষী করতে চান না। বেশির ভাগ টেলিভিশনসহ গণমাধ্যমগুলো এখন এই রেওয়াজে ঝুঁকে পড়েছে। যা গণমাধ্যমের চরিত্রবিরোধী। আমরা আন্তর্জাতিক টেলিভিশন চ্যানেল গুলোর অনুকরণ করতে অনেক মেধার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু তাদের এই গুনটি অনুকরণ করছিনা। এমনকি ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও এক্ষেত্রে সংযম দেখিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়েই গণমাধ্যমের জন্মদিন, তাদের ঘরোয়া উৎসব। কেকমুখ বা ফুল বিনিময়ের কোন ছবি পাঠক, দর্শক দেখতে পান না। তাই আমার চট্টগ্রামের সেই শ্রদ্ধেয় পাঠক, দর্শকের জিজ্ঞাসা- আমরা অপ্রয়োজনে, দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিতে কেনো এই বেহিসেবী হবো?

 

Update: 2015-04-12 17:18:29, Published: 2015-04-12 17:12:43

আপনার মন্তব্য লিখুন

পাঠকের মন্তব্য ( )


More News
  


আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ



Contact Address

89, Bir Uttam CR Dutta Road, Dhaka 1205, Bangladesh.
Fax: +8802 9670057, Email: info@somoynews.tv
উপরে en.Somoynews.tv