কিছু মৃত্যু মনকে নিস্তব্ধ করে দেয়

Update: 2015-07-13 21:03:26, Published: 2015-07-13 20:41:39
images
মানুষের জন্য শিক্ষা নাকি শিক্ষার জন্য মানুষ ?উত্তরটা সবারই জানা। কিন্তু কেন আসলো এই প্রশ্ন?এর নেপথ্য কারণ একটি নাম। বলছি আরাফাত শাওনের কথা। যে ছেলেটির চোখে স্বপ্ন ছিল অনেক দূর যাবার। সহপাঠীদের মতো সেও মনে গেঁথেছিল বড় মানুষ হবার। কিন্তু নেতিবাচক পরিস্থিতি তা হতে দেয়নি।

এবার এসএসসি পরীক্ষায় সে বাণিজ্য বিভাগ থেকে ৪.৮৩ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। ফলাফলের দিক দিয়ে স্কুলে তার অবস্থান ২য়। কিন্তু তার এ ফলাফলে সন্তুষ্ট নয় তার অভিভাবকগণ। তাদের আকাঙ্খা ছিলো শাওন এ প্লাস পাবে। আকাঙ্খার বাস্তবায়ন না হওয়ায় ছেলেকে ইচ্ছেমতো গালমন্দ করেছেন অভিভাবক। যা মেনে নিতে পারেনি ছেলেটি। ফলস্বরূপ সে বেছে নিয়েছে আত্মহত্যার পথ। লিখে গিয়েছে বিস্তৃত এর সুইসাইডাল নোট। 

তার নোটে দেখা যায় অনেক অভিমানের কথা। মনে লুকোনো সে কথাগুলো কাউকে বলতে না পেরে লিপিবদ্ধ করেছে কাগজের ভাঁজে। তার অভিযোগ ছিল দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে। এমনকি দেশের রাজনীতি নিয়েও। পরিবারে তার কোন স্বাধীনতা ছিলনা। সে লিখেছে 'আমি জানি না আজ আমি ঠিক কি ভুল কাজ করছি তবে এখন এটা ছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিল না। আসলে ছেলে হয়ে এ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করাটাই আমার দুর্ভাগ্য। তা না হলে ছোট থেকে এ পর্যন্ত মেয়ের মতো সব সময় পরিবারের কাজ করতেই হয়েছে। আর কখনো পরিবার থেকে আমাকে খেলাধুলার সময় বা খেলতে দেওয়া হয়নি। আর আমিও মেয়ের মতো সব সময় মায়ের আঁচলের নিচেই ছিলাম। আর আমি আদো জানি না যে আমি কি? এই পরিবারের বা আমার মা-বাবার সন্তান, তা না হলে সব সময় এ রকম শাসন আর কড়া শাসনের উপর আমাকে রাখা হয়েছে। কোন বাবা-মা তার সন্তানকে পড়া লেখার খরচে খোটা দেয় না। কিন্তু আমার মা বাবা সব সময় আমাকে বলে তোর জন্য মাসে মাসে হাজার হাজার টাকা খরচ করছি। এভাবেই প্রতি নয়ত বকাঝকা করা হয়। সব সময় বাবার থেকে শুধু খারাপ ভাষার গালি আর গালি শুনতে হয়। যা আমার একটু ভালো লাগতো না। কিন্তু আমি এতো দিন সহ্য করে ছিলাম। কারণ কোন কিছু করার কথা ভাবলে মনে হতো এ দুনিয়ায় তো বাবা-মায়ের আদর ভালোবাসা পেলাম না। পেলাম না সুখ শান্তি। আসলে মানুষ বলে যে ঠিক টাকা পয়সা ও ধন সম্পদ মানুষকে সুখী করতে পারে না। আর যদি আমি নিজের হাতে আত্মহত্যা করি তা হলে মরার পরও শান্তি পাবো না। আর মরার পর আমাকে জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হতো। তাই এখন আমার আর এসব কিছু সহ্য হচ্ছে না। আমাদের ছাত্রদের কি দোষ বলুন আমরা তো আমাদের মতো চেষ্টা করে যাই। তবে আমাদের দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলোর কারণে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এমন হাল। এর আগের বছর সরকার তার নিজের স্বার্থের জন্য শিক্ষার হার বাড়িয়ে দিয়েছে। আর এবার হরতাল-অবরোধ দেয়ার ফলে বর্তমান সরকার বিরোধী দলীয় সরকারকে গালি দেওয়ার জন্য পাশের হার কমিয়ে দিয়েছে, যাতে দেশে ফেল এর হার বেড়েছে। বলুন আমরা আর কি ভাবে ভালো রেজাল্ট করতে পারি!!!আমাদের মা-বাবা চায় আমরা ভালো রেজাল্ট করি। কিন্তু দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে ও তো দেখতে হবে। আমার বাবা ও আমার আত্মীয়-স্বজন আমার এ রেজাল্ট (৪.৮৩) এর উপর খুশি না। সবাই আমাকে বকাবকি করছে। কিন্তু আমার স্কুলের মধ্যে ২য় স্থান পাওয়ার পরও কিন্তু তারা অন্যদের রেজাল্ট এর কথা দেখে না, ভাবে না। তাদের কথা আমাকে A+ পেতেই হবে। A+ কি গাছে ধরে যে আমি পেড়ে আনবো। আরো অনেক কথা যা মনের ভিতর জমা করে রেখেছি। কিন্তু বললে শেষ হবে না। থাক। যদিও আমি মারা যাই … তা হলে সবাই আমাকে ক্ষমা করে দিবেন। আর যদিও বেঁচে যাই….!!!”

এখন কথা হচ্ছে এই নোট পড়ার পর আর লিখার শক্তি থাকেনা। তবুও লিখতে হবে। আমাদের ঘুণে ধরা সমাজকে জানাতে হবে এ প্লাসই সব কিছু নয়। এদেশে প্রতিবছর এ প্লাসের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু আদৌ কতটুকু শিক্ষিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা ?এমন অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা এ প্লাস না পেয়েও পরবর্তীতে ভালো করেছে। সফল হয়েছে তাদের কর্মক্ষেত্রে। আবার অনেক এ প্লাস প্রাপ্ত শিক্ষার্থীও ঝরে গিয়েছে।

সফলতা মূলত নির্ভর করে মেধা, প্রজ্ঞা, চেষ্টার উপর। শুধু এ প্লাস প্রাপ্তির উপর সফলতা নির্ভর করেনা। কিন্তু অনেক অভিভাবক মনে করেন তাদের সন্তানটি এ প্লাস পায়নি মানে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আসলে কি তাই? অনেক অভিভাবক সন্তান কি চায় অর্থাৎ সন্তানের ইচ্ছেকে একদমই আমলে নেননা। কেউ হতে চায় অর্থনীতিবিদ কিন্তু পরিবার থেকে তাকে বলা হয় তোমাকে ডাক্তার হতে হবে। কেউ হতে চায় চিত্রশিল্পী কিন্তু তাকে নির্ধারণ করে দেয়া হয় অন্য কোন বিষয়। এতে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত বড় হবার ইচ্ছেটা অকালেই মরে যায়। পাশের বাসার অমুক এ প্লাস পেয়েছে তুমি পাওনি কেন এই প্রশ্নটি যখন একজন ছেলে বা মেয়েকে করা হয় তখন সে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ মনে করে।

এ অসহায়ত্বের দায় কার? এদেশের শিক্ষার্থীরা সেদিনই বড় মানুষ হয়ে গড়ে ওঠতে পারবে যেদিন একটি আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠবে। রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ হবে। আর আমাদের অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের পছন্দটাকে প্রাধান্য দেবেন।আমরা সবাই সেই দিনটির প্রত্যাশার ।

 

(লেখাটি পাঠকের পাঠানো) 

লেখক:   মামুন রণবীর 
ইমেইল: Shiningmamun123@gmail.com


Update: 2015-07-13 21:03:26, Published: 2015-07-13 20:41:39

আপনার মন্তব্য লিখুন

পাঠকের মন্তব্য ( )


More News
  


আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ



সরাসরি যোগাযোগ

৮৯, বীর উত্তম সি. আর. দত্ত রোড, ঢাকা ১২০৫, বাংলাদেশ।
ফ্যাক্স: +৮৮০২ ৯৬৭০০৫৭, ইমেইল: info@somoynews.tv
উপরে en.Somoynews.tv