SOMOYNEWS.TV

আমি নিরাপদে ফিরেছি- আপনি?

Update: 2015-03-10 21:05:23, Published: 2015-03-10 14:40:34
epz
৬ মার্চ শুক্রবার, ভোর পাঁচটা। ঘুম থেকে সচরাচর এতো সকালে ওঠা হয় না। তবুও সকালের ঘুম ত্যাগ করে উঠতেই হলো। কারণ অফিসের কাজে রওয়ানা দিতে হবে। আর আমাদের গন্তব্য ঈশ্বরদী ইপিজেড।

আমরা চার জন সহকর্মী। ঘর থেকে বের হওয়ার কথা সকাল ৬টায়। তবে গাড়ি আসতে দেরি হওয়ায় শুরুতেই বিপাকে পড়তে হলো। ড্রাইভারকে ফোন করে যা শুনলাম তা নিতান্তই চমকে ওঠার মতো ব্যাপার। টঙ্গী স্টেশন রোডে গাড়ি নাকি ৪৫ মিনিট ধরে জ্যামে আটকে আছে। এতো সকালে জ্যামের খবর শুনে শুরুতে মনে হলো ড্রাইভার মিথ্যে বলছে। তবে রওয়ানা দেয়ার পর বুঝলাম না, কথাটা মিথ্যে নয়।

যাই হোক, আমরা রওয়ানা হলাম ঈশ্বরদীর পথে। ২০ দলীয় জোটের অনির্দিষ্ট টানা আবরোধ শুরু হওয়ার পর ঢাকার বাইরে দূর-যাত্রায় এটাই আমাদের প্রথম সফর। সঙ্গত কারণেই মনের ভেতর আতঙ্ক। খুব সকালে ঘুম ছেড়ে উঠে আসায় আমাদের চোখে ঘুমের ছাপ। অন্য সময়ে হলে ভোরের ঘুমটা হয়তো যাত্রা পথেই সেরে নেয়া যেতো, কিন্তু চলমান পরিস্থিতির উদ্বেগ আমাদের আরামের ঘুমকে হারাম করেছে। ফলে আমাদের কেউই ঘুমোচ্ছে না। পেট্রোল বোমা আতঙ্ক অন্যদের মতো আমাদেরকেও নিস্তার দেয়নি। যদিও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অবরোধের ক্ষয়-ক্ষত তিনি পুষিয়ে দেবেন। কিন্তু জীবন হারানোর মতো অপূরণীয় ক্ষতি কোনোভাবেই কি পূরণ সম্ভব?। নির্ঘাৎ বোকা লোকদের প্রতিটি সদস্য বিষয়টি বোঝেন। আর হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে দগ্ধ মানুষের তীব্র যন্ত্রণার মতো জাগতিক আজাবের কি-ই বা ক্ষতি পূরণ থাকতে পারে!

উদ্বেগের যাত্রায় আমরা সত্যি নিরুপায়। ফলে বের হতে হয়েছে। তাই বলে দুঃসংবাদের  শিরোনাম আমাদের কাম্য নয়। আর তা একেবারেই আমরা চাইছি না। অন্যদের ক্ষেত্রে যদি এমনটা ঘটে? আমরা তাও কামনা করি না।

এতোসব ভাবনার ভেতর আমাদের গাড়ি আশুলিয়া হয়ে সাভার ইপিজেড, অতঃপর চন্দ্রা। পূর্বেই বলেছি, চলমান অবরোধে এটিই আমাদের ঢাকা ছেড়ে প্রথম কোনো দূর-যাত্রা। সরকারের সব মহল থেকে বলা হচ্ছে জনমানুষের জোর নিরাপত্তা নিশ্চিতের কথা। বিরোধীরাও সহিংসতার দায় স্বীকারে নারাজ। আবার গণমাধ্যমেও প্রচার হচ্ছে ঘটনার পেছনের ঘটনা। পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবির পাশাপাশি ১১ হাজারের বেশি আনসার সদস্য মোতায়েন করেছে সরকার। সব মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা বলয়ে সাধারণ মানুষ কিছুটা আশ্বস্ত। আমরাও আশ্বস্ত হতে চাই। অন্তত এই মুহূর্তের জন্য। কৌতুহল নিয়ে মহাসড়কের দিকে নজর ফেরালাম।  হঠাৎ চন্দ্রা থেকে মনোযোগটা একটু শক্ত হলো। আমরা দেখলাম- সেই অর্থে কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহীনীর টিকিটাও খুঁজে পেলাম না। অন্তত টাঙ্গাইল পর্যন্ত। এলেঙ্গা বাজারে পৌঁছে দেখলাম- দু'জন ট্রাফিক পুলিশ যানবাহনের শৃঙ্খলার কাজে ব্যস্ত আর বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত  পথে দুই জন আনসার সদস্য দাঁড়িয়ে। এছাড়া আর কোনো পুলিশ, র‍্যাব বা বিজিবি সদস্যের উপস্থিতি সেই সময়ে আমাদের চোখে অন্তত পড়েনি।এ সময় মনে পড়ে সেই প্রবাদ বাক্যটি, 'লক্ষ মানুষ মরে যায় কাতারে কাতার, শুমার করিয়া দেখে চল্লিশ হাজার”। যাই হোক, অন্তত দুইজন আনসার সদস্যের দেখা পেয়েই আমরা সন্তুষ্ট!



পথে নিরাপত্তায় নিয়োজিত সরকারি বাহিনীর নানান চিত্র দেখতে দেখতে আমরা ফেলে এসেছি অনেকটা পথ। ততক্ষণে ঘড়ির কাটা ঠেকেছে প্রায় সাড়ে দশটায়। ইতোমধ্যে আমরা চলন বিল পেরিয়ে পৌঁছে গেছি ঈশ্বরদীর কাছাকাছি। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ আর লালন সেতুর আগে শাখা পথে একটু এগুলে ব্রিটিশদের তৈরি টানেল। এই টানেল পেরিয়ে ডান পাশে পরিত্যক্ত ঈশ্বরদী কাগজ কল এবং বাম পাশে ফুরফুরা দরবার শরীফ। এই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো পার হলেই চোখে পড়ল ঈশ্বরদী ইপিজেড। আমরা কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই ভেতরে প্রবেশ করলাম। আমার মতো অন্য সহকর্মীও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। এভাবেই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যদিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের অনিরাপদ যাত্রার নিরাপদ গন্তব্যে।

যথা সময়ে আমাদের অফিসের কর্মকাণ্ড সমাপ্ত করলাম। এবার রাজধানীতে ফেরার পালা। আবারও চিন্তার চিহ্ন আমাদের কপালের ভাজে ভাজে। ড্রাইভারকে বললাম, যে করেই হোক, বনপাড়া আর চলনবিল পার হতে হবে সন্ধ্যার আগে। ড্রাইভার আশ্বস্ত করল। মহাসড়কে ওঠার পর ফেরার পথে চোখে পড়লো উল্লেখ করার মতো মাল বোঝাই শত শত ট্রাক। যান বাহনের শতকরা ৯৮ শতাংশই ট্রাক আর এর মাঝে শাঁই শাঁই করে ‌আমাদের পার হয়ে যাচ্ছে প্রাইভেট কার আর মাইক্রোবাস। আমরা যে গাড়িতে করে যাচ্ছি, সেটি একটি পাজেরো। যখন শাহ ফতেহ আলী পরিবহণের একটি বাস আমাদের অতিক্রম করলো তখনই আমার গাড়ির স্পিড মিটারের দিকে চোখ পড়লো। আমাদের গাড়িটির গতি তখন ৮০ কিলোমিটার আর তার সাথে তুলনা করলে বাসটির গতি কমপক্ষে ৯০-১০০ কিলোমিটার হবে আর এই গতিতে এতবড় একটি বাস অসংখ্য মালবাহী ট্রাকের ভীড়ে চালানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বিষয়টি নিয়ে কথা বলায় আমাদের ড্রাইভার মন্তব্য প্রাজ্ঞপূর্ণ মন্তব্য করলেন-'এরা পুড়ে মরার চেয়ে দুর্ঘটনায় মরাকে প্রশান্তির মনে করে।'

সন্ধ্যা নামতেই আমরা বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়ে টাঙ্গাইল অতিক্রম করলাম। আমার পাশের সহকর্মী বলেলন, জানেন, স্বাধীনতার নয় মাসে এই বৃহত্তর টাঙ্গাইলে পাকিস্তানি সেনা প্রবেশ করতে পারেনি। পরাধীন থাকা কালীন এই অঞ্চলের মানুষগুলো ছিলো নিরাপদ, আর আমরা স্বাধীন দেশে এই একই অঞ্চলে আতঙ্ক নিয়ে পার হচ্ছি। এর চেয়ে লজ্জার কী হতে পারে?

সত্যি বলতে কী, লজ্জা হয়নি একটুও, কারণ আমাদের নেত্রীর নাম খালেদা-হাসিনা। একজন ক্ষমতায় থাকতে আর আরেকজন ক্ষমতায় যেতে জিম্মি করেছে আমাদের স্বভাবিক জীবন, অর্থনীতি, কোমলমতি শিশুদের শিক্ষা, রাজনীতিতে অজ্ঞ সাধারণ মানুষের চিকিৎসার অধিকার। লজ্জা হয়নি একটুও, কারণ আমাদের রাজনীতিকদের কাছে এসব মৌলিক অধিকারের চেয়ে তথাকথিত গণতান্ত্রিক হরতাল আর অবরোধের অধিকারই বড়। লজ্জা হয়নি একটুও, কারণ আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দের কারও ভেতরে লজ্জার লেশমাত্র নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা, যখন মনে মৃত্যুর আতঙ্ক, তখন লজ্জা পালিয়ে যায় সহস্র ক্রোশ দূর, আমিই তার প্রমাণ।

টাঙ্গাইল পার হয়ে ততক্ষণে আমরা মির্জাপুর। আর সেখানে পড়লাম এক দীর্ঘ যানজটে। পথ যেন শেষই হতে চায় না। হঠাৎ হেমন্তের বিখ্যাত গানটির কথা মনে পড়লো - 'এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বল তো?'

বড়ই সর্বনাশ হতো হেমন্ত দা। প্লিজ! মাইন্ড করো না দাদা। আজ তুমিও যদি আমাদের যাত্রা-সঙ্গী হতে, তবে নিশ্চয়ই গানের কথা ভুলে প্রাণের প্রলাপে মনোযোগী হতে। এবার তাদের উদ্দেশ্যে বয়ান: আমরা কোনো মতের শেষ চাই না। তবে পথের শেষ চাই। স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই। আমরা চাই- একটু নিরাপদে ঘরে ফিরতে। তবুও প্রশ্ন জাগে- আমি নিরাপদে ফিরেছি, আপনি ফিরতে পেরেছেন তো?

-মো. মোক্তার হোসেন, কবি ও ব্লগার

Update: 2015-03-10 21:05:23, Published: 2015-03-10 14:40:34

More News
loading...

সর্বশেষ সংবাদ



Contact Address

Lavel-9, Nasir Trade Centre,
89, Bir Uttam CR Dutta Road, Dhaka 1205.
Fax: +8802 9670057, Email: info@somoynews.tv
উপরে