SOMOYNEWS.TV

এইচ এস সি রেজাল্ট ২০১৭

অস্তমিত দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং স্বাধীনতার সূর্যোদয়

Update: 2015-03-28 23:48:17, Published: 2015-03-26 12:09:51
independance-day
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে জন্ম হয় পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের। তৎকালীন পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ এবং পশ্চিম পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমান পাকিস্তান ছিল এ রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমা চরিত্র। এই পৃথক দু'টি ভূখণ্ডের ভৌগোলিক ব্যবধানও ছিল অস্বাভাবিক। পূর্ব পাকিস্তানের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের দূরত্বগত পার্থক্য প্রায় ১২০০ মাইলের। ভাষাগত ভিন্নতাও ছিল চোখে পড়বার মতো। শিল্প-সাহিত্য, ভাষা-সংস্কৃতি, প্রথা-রীতিনীতিসহ ইত্যাদি বিষয়ে দুই জনগোষ্ঠীর মাঝে ছিল ব্যাপক ব্যবধান।

পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ৫৬% লোকের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। আর বাকি ৪৬% লোক কথা বলতো পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুতে। একমাত্র ধর্মই ছিল দু'দেশের মধ্যে সেতুবন্ধন। এই বৃহত্তর পার্থক্যের ফাঁটল নিয়ে দেশটি এগুতে পারেনি বেশি দূর। সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করলে দেখা যায়- বৃহৎ এই জাতীয় তারতম্য মানসিকভাবেই দু'টি জাতিকে আজীবন পৃথক রাখার চক্র সাজানো হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট থেকে শুরু হয় দ্বিজাতি তত্ত্বের গর্ভে জন্ম নেয়া অসম জাতির ভাঙনের সুর। পরবর্তীকালে যা মুক্তিযুদ্ধের মতো অনিবার্য এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্যদিয়ে পূর্ণতা পায়।

৫২'র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে তৎকালীন সংঘটিত প্রতিটি ঘটনায় দৃষ্টি দিলে এ কথা স্পষ্টতই বলা যায় যে, ৪৭' পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলনই ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম পদক্ষেপ। এ আন্দোলনের মধ্যদিয়ে জাতি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ হয়।

আর এই লেখাটির মুখ্য উদ্দেশ্য, এ বিষয়টি সম্পর্কে ঐতিহাসিক একটি ধারণা দেয়া। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। পাকিস্তানের গণপরিষদের অধিবেশন শুরু হয়েছে। অধিবেশনের এক পর্যায়ে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষার দাবি ওঠে। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান উপরোক্ত দাবির প্রেক্ষিতে চরম বিরোধিতা করে। পূর্ব বাংলায় এ খবর ছড়িয়ে পড়ে সর্বমহলে। মুহূর্তে জন্ম নেয় তীব্র ক্ষোভ। ১১ মার্চ দেশব্যাপী ধর্মঘট, বিক্ষোভ, মিছিল ও শোভাযাত্রার ডাক দেয়া হয়। প্রতিবাদী এই আন্দোলনের মধ্যদিয়ে ভাষা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত ঘটে। পেরিয়ে যায় আরো দশটি দিন। এরপর পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর দ্বিজাতি তত্ত্বের জনক জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকায় আসেন।

১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ঘোষণা দেন- 'উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।' উপস্থিত ছাত্ররা ঘোষণাটির তীব্র প্রতিবাদ জানায়। এ সময় তারা 'না' 'না' বলে শ্লোগান দিতে থাকে। একই সাথে তারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবি তোলে। পরবর্তীকালে ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পল্টন ময়দানের বিশাল এক সমাবেশে খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন 'উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।' আবার শুরু হয় বিক্ষোভ।

৪ ফেব্রুয়ারি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট পালিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি 'সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ'- ধর্মঘট ও সভা সমাবেশের ডাক দেয়। অবস্থার অবনতি দেখে পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীন সরকার আগের দিন মধ্যরাত থেকে ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেন। পরদিন তা উপেক্ষা করে ২১ ফেব্রুয়ারি 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' শ্লোগান দিয়ে 'সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' রাজপথে নেমে আসে। শাসকগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ মদদে পুলিশ এ মিছিলে গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলিতে শাহাদতবরণ করে বাংলার দামাল ছেলে- সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিউল।

আন্দোলনের তীব্রতা ছড়িয়ে পড়ে তারুণ্যের রক্ত কণিকায়। প্রচণ্ড গণবিস্ফোরণের মুখে ১৯৫৩ সালে মূলনীতি কমিটির রিপোর্টে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দানের সুপারিশ করা হয়।

১৯৫৪ সাল। মার্চে অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচন। পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদের সাধারণ এই নির্বাচনে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট বিপুল জনসমর্থনে জয়লাভ করে। এই নির্বাচনের প্রধান মেনিফেস্টো ছিল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবি। এরই প্রেক্ষিতে পরবর্তীকালে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে উর্দুর সাথে বাংলাও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

মূলত ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির জন্য স্বাধিকার আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইল ফলক। এ অর্জনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি আত্মশক্তিতে পূর্ণোদ্যমে উজ্জীবিত হয়।